|২২|০২|২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
মুহতারাম ডক্টর সাহেব,
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
একটি প্রশ্ন ছিলো, তা হলো, উমরা আদায়ের সময় যদি কেউ গলফ কার্টে বসে তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করেন, যদিও তার কোনো শারীরিক অক্ষমতা নেই, তবে তা কি জায়েয হবে?
বিশেষ করে রমযান মাসে প্রচণ্ড ভিড় থাকে। ছোট শিশু সঙ্গে থাকলে কখনও কখনও পায়ে হেঁটে তাওয়াফ ও সাঈ করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে কেবল সুবিধার জন্য বাহন ব্যবহার করার বিধান কী?
কিছু ফতোয়ায় উল্লেখ আছে যে, পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করা ওয়াজিব; কেবল শরয়ি ওজর থাকলে ব্যতিক্রম হতে পারে। আর যদি কেউ বিনা ওজরে বাহনে তাওয়াফ করে, তবে তার ওপর ‘দম’ ওয়াজিব হয়। এ বিষয়ে শরয়ি অবস্থান কী? অনুগ্রহ করে দিকনির্দেশনা প্রদান করবেন।
# সালিম, রাবিগ শরীফ
❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আপনার প্রশ্ন উমরার সময় তাওয়াফ ও সাঈ গলফ কার্ট বা অন্য কোনো বাহনে আদায় করার বৈধতা সম্পর্কে, বিশেষত যখন শারীরিক অক্ষমতা নেই, কিন্তু তীব্র ভিড় বা শিশুদের সঙ্গে থাকার কারণে কষ্টের আশঙ্কা থাকে। এ মাসআলার শরয়ি অবস্থান বুঝতে হলে সুন্নাহর দলিল, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং ইমামদের মতামতের আলোকে একটি নীতিগত পর্যালোচনা প্রয়োজন।
মূলত তাওয়াফ ও সাঈর আদর্শ পদ্ধতি হলো পায়ে হেঁটে সম্পাদন করা। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর উমরা ও বিদায় হজে অধিকাংশ সময় পায়ে হেঁটেই তাওয়াফ করেছেন। এজন্য আলেমগণ ‘মাশি’ বা পদচারণাকে উত্তম বলেছেন, কারণ তা নববী সুন্নাহর অধিকতর অনুসরণ এবং এতে খুশু ও বিনয়ের আবহ আরও স্পষ্ট হয়।
তবে সহিহ হাদিস দ্বারা এ কথাও প্রমাণিত যে, নবী করিম সা. বাহনে আরোহন করেও তাওয়াফ করেছেন। সহিহ বুখারী (১৫৩০) ও সহিহ মুসলিম (১২৭২)-এ বর্ণিত আছে, বিদায় হজে তিনি উটনীর ওপর সওয়ার হয়ে তাওয়াফ করেন। হযরত জাবির রা. বর্ণনা করেন, তিনি তাঁর বাহনে আরোহন করে বায়তুল্লাহর তাওয়াফ করেন এবং ‘মিহজন’ (বিশেষ লাঠি) দ্বারা হাজরে আসওয়াদ ইস্তিলাম (স্পর্শ) করেন, যাতে মানুষ তাঁকে দেখতে পারে, তিনি মানুষকে দেখতে পারেন এবং তাদের প্রশ্নের জবাব দিতে পারেন; কারণ চারপাশে ছিল অগণিত মানুষের ভিড় (সহিহ মুসলিম: ১২৭৩)।
হযরত ইবনে আব্বাস রা.-এর একটি বর্ণনায় আরও স্পষ্ট এসেছে, যখন মানুষের ভিড় অত্যধিক বেড়ে গেল এবং নারীরাও ঘর থেকে বেরিয়ে এলো, তখন তিনি সা. বাহন ব্যবহার করেন। একই সঙ্গে তিনি বলেন, পায়ে হেঁটে তাওয়াফ ও সাঈ করাই উত্তম (সহিহ মুসলিম: ১২৬৪)। এখান থেকে দুটি বিষয় পরিষ্কার হয়,
প্রথমত, বাহনে তাওয়াফ ও সাঈ করা জায়েয।
দ্বিতীয়ত, পায়ে হেঁটে করা অধিক ফজিলতপূর্ণ।
উম্মুল মুমিনীন হযরত উম্মে সালামা রা.-এর ঘটনাও ‘সহিহাইন’ এ উল্লেখিত আছে। অসুস্থতার কথা জানালে রাসূলুল্লাহ সা. তাঁকে নির্দেশ দেন, তিনি যেন মানুষের পেছনে থেকে বাহনে আরোহন করে তাওয়াফ করেন। তিনি তাই করেন, আর সে সময় নবী সা. নামাজ আদায় করছিলেন। এ ঘটনা সুস্পষ্ট প্রমাণ যে, বাহনে তাওয়াফ শরিয়তসম্মত ও বৈধ।
কিছু আলেম নবী সা. এর বাহনে তাওয়াফ করাকে বিশেষ ওজর বা সাময়িক প্রয়োজনের সঙ্গে সম্পর্কিত করেছেন, যেমন ভিড় বা উম্মাহকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্য। কিন্তু নীতিগতভাবে নববী কর্ম নিজেই শরিয়তের দলিল, যতক্ষণ না তার বিশেষত্বের পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। যদি বাহনে তাওয়াফ করা নিষিদ্ধ বা অপূর্ণ হতো, তবে রাসূলুল্লাহ সা. তা স্পষ্ট করতেন কিংবা নিজের জন্য বিশেষ বিধান হিসেবে উল্লেখ করতেন।
ইমাম শাফেয়ী রহ. এই দলিলের ভিত্তিতে বলেন, তাওয়াফ ও সাঈ, উভয়ই পায়ে হেঁটে কিংবা বাহনে দুইভাবেই জায়েয; তবে পায়ে হেঁটে করা উত্তম। তিনি তাঁর গ্রন্থ আল-উম্ম-এ হযরত জাবির রা.-এর বর্ণনা উদ্ধৃত করে স্পষ্ট করেছেন যে, নবী সা. অসুস্থতার কারণে বাহন গ্রহণ করেননি; এবং বিদায় হজে তাঁর এমন কোনো অসুস্থতার প্রমাণও নেই যা পদচারণায় বাধা সৃষ্টি করেছিল।
ফিকহি বিশ্লেষণে শাফেয়ী ও জাহিরী মাজহাবের মত হলো, তাওয়াফের মূল উদ্দেশ্য বায়তুল্লাহকে প্রদক্ষিণ করা এবং সাঈর মূল উদ্দেশ্য সাফা ও মারওয়ার মাঝে গমনাগমন। এই উদ্দেশ্য যেভাবেই পূর্ণ হোক, মানুষ পায়ে হেঁটে হোক বা বাহনে, মূল ফরজ আদায় হয়ে যায়। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে কোনো ‘দম’ ওয়াজিব হয় না; কারণ কুরআন-সুন্নাহর কোথাও পদচারণাকে শর্ত বা রুকন সাব্যস্ত করা হয়নি। পদচারণা সুন্নাহ ও উত্তম পন্থা, কিন্তু তা আবশ্যিক নয়।
অতএব, তীব্র ভিড়, শিশুদের সঙ্গ কিংবা কষ্টের আশঙ্কা থাকলে বাহন ব্যবহার করা শরিয়তসম্মত। তবে সুযোগ ও সামর্থ্য থাকলে পায়ে হেঁটে তাওয়াফ ও সাঈ আদায় করাই অধিক মর্যাদাপূর্ণ, কারণ তাতে সুন্নাহর পূর্ণতর অনুসরণ এবং ইবাদতের স্বাদ আরও গভীরভাবে অনুভূত হয়।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন, কোনো নির্ভরযোগ্য ও সুস্পষ্ট দলিল দ্বারা এ কথা প্রমাণিত হয় না যে পায়ে হেঁটে তাওয়াফ করা এমনভাবে ওয়াজিব, যার পরিত্যাগে ‘দম’ অপরিহার্য হয়ে যাবে। যেসব ফকিহ বিনা ওজরে বাহনে তাওয়াফ করাকে দমের কারণ বলেছেন, তাঁদের যুক্তি মূলত ‘আফযাল’ বা উত্তম কাজকে ‘ওয়াজিব’ এর পর্যায়ে উন্নীত করার উপর নির্ভরশীল; অথচ সহিহ নুসূসে এমন কোনো স্পষ্ট বক্তব্য নেই।
রাসূলুল্লাহ সা. এর বাহনে তাওয়াফ করা, তা ভিড়ের কারণে হোক বা উম্মতকে শিক্ষা দেওয়ার উদ্দেশ্যে, নিজেই এর বৈধতার প্রমাণ। নীতিগতভাবে নববী কর্ম যখন সাধারণ ও উন্মুক্ত রূপে সংঘটিত হয় এবং তার বিশেষত্ব প্রমাণিত না হয়, তখন তা উম্মতের জন্য শরিয়তসম্মত ও গ্রহণযোগ্য বিধান হয়ে থাকে।
অতএব সারকথা এই, তাওয়াফ ও সাঈ পায়ে হেঁটে আদায় করা উত্তম এবং সুন্নাতে গালিবার অধিকতর অনুগত। কিন্তু যদি কেউ শারীরিক অক্ষমতা না থাকা সত্ত্বেও কোনো বাস্তব প্রয়োজন, যেমন তীব্র ভিড়, শিশুদের সঙ্গে থাকা বা অতিরিক্ত কষ্টের আশঙ্কা বিবেচনায় গলফ কার্ট, হুইলচেয়ার কিংবা অন্য কোনো বাহনে তাওয়াফ ও সাঈ সম্পন্ন করেন, তবে শরিয়তের দৃষ্টিতে তাতে কোনো বাধা নেই। তার ওপর দম ওয়াজিব হবে না, এবং তার তাওয়াফ ও সাঈও শুদ্ধ ও গ্রহণযোগ্য হবে।
তবে এটুকু স্মরণীয়, সুযোগ ও সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ কেবল অবহেলা বা সহজপন্থা অবলম্বনের মানসে উত্তম সুন্নাহ ত্যাগ করে, তবে সে একটি ফজিলত থেকে বঞ্চিত হবে বটে; কিন্তু গুনাহগার হবে না।
———-
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, হজ্জ, ইসলামি চিন্তাধারা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8481