প্রশ্ন:
আফগানিস্তান থেকে সম্মানিত আলেম শাইখ মৌলভী মুহাম্মদুল্লাহ আল-কাওসারী (আল্লাহ তাঁকে হেফাজত করুন) আমাকে লিখেছেন,
আসসালামু আলাইকুম।
সম্মানিত শায়েখ, আপনার কাছে আমার একটি প্রশ্ন ছিল, উত্তর জানালে উপকৃত হতাম। হানাফি মাজহাব অনুযায়ী তওবার হুকুম কী, তা কি ফরজ, নাকি মুস্তাহাব?
উত্তর:
ইসলামে তওবা কোনো পার্শ্ববর্তী বা মতভেদসাপেক্ষ ফিকহি বিষয় নয় যে এর হুকুম মাজহাবভেদে খোঁজা হবে। বরং তওবা এই দীনের এক মহান মৌলিক ভিত্তি, যার ওপর কুরআন ও সুন্নাহর সুস্পষ্ট নির্দেশ প্রতিষ্ঠিত, এবং যার ওপর সমগ্র উম্মাহর আলেমগণ একমত হয়েছেন, হানাফি মাজহাবের ফকিহরাও এর অন্তর্ভুক্ত, আল্লাহ তাঁদের সবাইকে রহম করুন।
তওবা প্রত্যেক মুসলমানের ওপর শরঈভাবে ফরজ। এ ফরজিয়ত ফিকহি অনুমান বা ইজতিহাদের ভিত্তিতে নয়, বরং অকাট্য দলিল দ্বারা প্রমাণিত। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদেরকে সাধারণ ও সার্বজনীনভাবে তওবার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন,
“হে মুমিনগণ, তোমরা সবাই আল্লাহর নিকট তওবা করো, যাতে তোমরা সফল হতে পারো।”
= সূরা নূর, আয়াত ৩১।
শরিয়তের ভাষায় আদেশ ফরজ হওয়াই বোঝায়। তাই এই আয়াত স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে তওবা একটি আবশ্যিক কর্তব্য, যাতে কোনো অবহেলা বৈধ নয়।
নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহও এই মহান সত্যকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। তিনি বলেছেন,
“যে ব্যক্তি তওবা করে, আল্লাহ তার তওবা কবুল করেন।”
এ হাদিসটি মুসলিম শরিফে আবু হুরাইরা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। এতে তওবার মহত্ত্ব যেমন স্পষ্ট, তেমনি প্রত্যাবর্তনকারী প্রত্যেক বান্দার জন্য আল্লাহর দরজা যে সর্বদা খোলা, সে আশ্বাসও রয়েছে।
আলেমগণ পরিষ্কারভাবে বলেছেন, প্রতিটি গুনাহ থেকে তওবা করা ফরজ, তা আল্লাহর হকসংক্রান্ত হোক, যেমন কোনো ফরজ ছেড়ে দেওয়া বা হারাম কাজে লিপ্ত হওয়া, অথবা বান্দার হকসংক্রান্ত হোক, যেমন জুলুম করা বা অন্যায়ভাবে সম্পদ আত্মসাৎ করা।
যদি গুনাহটি বান্দা ও আল্লাহর মধ্যকার হয়, তবে তওবার জন্য তিনটি বিষয় অপরিহার্য, গুনাহ ছেড়ে দেওয়া, তার ওপর গভীর অনুশোচনা করা, এবং ভবিষ্যতে আর কখনো তা না করার দৃঢ় সংকল্প করা।
আর যদি গুনাহ মানুষের অধিকারের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়, তবে তওবা তখনই সহিহ হবে, যখন অধিকার যথাযথভাবে ফেরত দেওয়া হবে বা অধিকারভোগীর কাছ থেকে ক্ষমা গ্রহণ করা হবে।
কবুলযোগ্য তওবা হলো “তওবায়ে নাসূহ” যে তওবা তার শরঈ শর্তগুলো পূর্ণ করে। সংক্ষেপে তার শর্তগুলো হলো:
আল্লাহর জন্য খাঁটি ইখলাস,
তাৎক্ষণিকভাবে গুনাহ ত্যাগ,
অন্তর থেকে অনুশোচনা,
ভবিষ্যতে আর না ফেরার দৃঢ় সিদ্ধান্ত,
এবং তওবা এমন সময়ে করা, যখন গ্রহণের দরজা বন্ধ হয়ে যায়নি, অর্থাৎ মৃত্যুকালীন কণ্ঠনালীতে প্রাণ পৌঁছানোর আগে।
কুরআন ও সুন্নাহর অসংখ্য দলিল আল্লাহ তাআলার রহমতের বিস্তার ও বান্দাদের তওবা কবুল করার ঘোষণা দেয়, তাদের গুনাহ যত বড়ই হোক না কেন। এমনকি যদি তা শির্ক পর্যন্ত পৌঁছে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
“বলুন, হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের ওপর জুলুম করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব গুনাহ ক্ষমা করে দেন।”
= সূরা যুমার, আয়াত ৫৩।
আরও বলেন,
“নিশ্চয়ই আমি তাকে ক্ষমা করি, যে তওবা করে, ঈমান আনে, সৎকর্ম করে, অতঃপর সোজা পথে অবিচল থাকে।”
= সূরা ত্বা-হা, আয়াত ৮২।
বরং আল্লাহর অনুগ্রহ এখানেই থেমে থাকে না। তিনি তওবাকে এমন এক মর্যাদা দিয়েছেন যে তার মাধ্যমে পাপসমূহকেও নেকিতে রূপান্তর করে দেন। আল্লাহ বলেন,
“তবে যে তওবা করে, ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের মন্দ কাজগুলোকে ভালো কাজে পরিণত করে দেন।”
= সূরা ফুরকান, আয়াত ৭০।
তওবার প্রভাব মুসলিম জীবনে অত্যন্ত গভীর। তওবা আল্লাহর ভালোবাসা অর্জনের পথ, আত্মার পরিশুদ্ধি ও পবিত্রতার মাধ্যম, হৃদয়ের প্রশান্তি ও স্বস্তির উৎস। তওবা রিজিকের প্রশস্ততা ও বিপদ দূর হওয়ার কারণও বটে। নবী হূদ আলাইহিস সালামের ভাষায় আল্লাহ কোরআনে বলেন,
“হে আমার কওম, তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও, অতঃপর তাঁর দিকে ফিরে আসো। তিনি তোমাদের ওপর প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করবেন।”
তওবাকারীর জন্য এটাও জরুরি যে সে অবিচল থাকার উপায়গুলো গ্রহণ করবে। সে এমন সঙ্গ ত্যাগ করবে, যারা তাকে গুনাহের দিকে টেনে নেয়, এবং নেককারদের সান্নিধ্য গ্রহণ করবে। ইলম ও যিকিরের মজলিসে নিজেকে সম্পৃক্ত রাখবে। কেননা এসবই আল্লাহর আনুগত্যে দৃঢ়তা দান করে এবং হৃদয়কে সঠিক পথে স্থির রাখে।
——————–
| ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, আখলাক, নাসিহাহ,
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7983