بسم الله الرحمن الرحيم
আমি উত্তর প্রদেশের জৌনপুর জেলার একটি তুলনামূলকভাবে নীরব, অখ্যাত গ্রাম জামদাহানের মানুষ। আমাদের গ্রামের নীরবতা এতটাই স্বতন্ত্র ও পরিচিত যে, কোনো অপরিচিত যদি হঠাৎ এখানে এসে পড়ে, তার মনে সঙ্গে সঙ্গেই এ অনুভূতি জন্মায়, সে হয় খুব দ্রুত ফিরে যাবে, নয়তো অচিরেই এখানকারই একজন হয়ে উঠবে।
জামদাহানের পূর্ব দিকে রয়েছে জিগাহাঁ নামের একটি গ্রাম, যা জৌনপুর জেলার শেষ প্রান্তে অবস্থান করছে। তার পরেই, কোনো দৃশ্যমান বিরতি ছাড়া, কোনো সাইনবোর্ড বা ফলক ছাড়া, কোনো আবেগঘন ঘোষণার আগেই শুরু হয়ে যায় চিতারা, আজমগড় জেলার প্রথম বড় গ্রাম। মাঝখানে নেই কোনো দেয়াল, নেই নদী, নেই পাহাড়; আছে শুধু একটি অদৃশ্য রেখা, যাকে সরকার বলে সীমারেখা, আর সাধারণ মানুষ বলে জীবনের এক অনিবার্য বাধ্যবাধকতা।
মানচিত্রে তাকালে জিগাহাঁ ও চিতারা এমন মনে হয়, যেন একই বাক্যের দুটি শব্দ, যা ভুল করে দুটি ভিন্ন পাতায় ছাপা হয়েছে। জমি এক, মাটি এক, বাতাস এক, তবু কাগজপত্রে তাদের পরিচয় আলাদা। তাই জিগাহাঁর কারও যদি কোথাও কোনো কাগজ হারিয়ে যায়, সে জৌনপুরকে দোষ দেয়; আর চিতারার কারও ফাইল আটকে গেলে, তার অভিযোগ আজমগড়ের দপ্তরের বিরুদ্ধে। দু’পক্ষই একে অপরের দুঃখ বুঝতে পারে, কিন্তু ভাগ করে নিতে পারে না, কারণ দুঃখও এখানে জেলা দেখে বণ্টিত হয়।
জিগাহাঁর মানুষ কোনো কাজে বেরোলে তার পা আপনাতেই জৌনপুরের দিকে ঘুরে যায়। সমস্যা ছোট হোক বা বড়। আদালত, প্রশাসনিক দপ্তর, থানা, সব কিছুর দিকনির্দেশ যেন আগেই নির্ধারিত। অন্যদিকে, চিতারার মানুষের কাছে আজমগড় ঠিক সেই গুরুত্ব বহন করে, যেমন দিকনির্ণায়ক যন্ত্র একজন পথিকের কাছে করে। কেউ যদি ভুল করে জৌনপুরের নাম উচ্চারণ করে ফেলে, সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাখ্যা দিতে হয়, যেন কেউ ভুল সালাম দিয়ে বসেছে। এভাবে একই সড়কে দাঁড়ানো দু’জন মানুষ একে অপরের খোঁজখবর নিতে পারে, কিন্তু সমস্যার সমাধানের জন্য দু’জনকেই উল্টো দিকে হাঁটতে হয়।
এই দৃশ্য আমাকে সব সময় ডিসেম্বর আর জানুয়ারির কথা মনে করিয়ে দেয়। দু’টি মাস পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত, অথচ একটি বন্দী থাকে পুরোনো বছরে, আর অন্যটি নতুন বছরের ঘোষণা হয়ে দাঁড়ায়। ডিসেম্বর যতই হইচই করুক, সে অতীতের গণ্ডি পেরোতে পারে না। আর জানুয়ারি যতই নীরব হোক, তাকেই ভবিষ্যতের প্রতিনিধি মানতে হয়। তাদের মাঝখানে ব্যবধান মাত্র একটি রাতের, অথচ মানুষ সেই এক রাতেই পুরোনো অঙ্গীকার ভেঙে নতুন অঙ্গীকার বেঁধে ফেলে। বিস্ময়ের বিষয় হলো, দু’টির ক্ষেত্রেই আন্তরিকতার ঘাটতি থাকে না।
জিগাহাঁ ও চিতারাও ঠিক এমনই। একই দিনে সূর্য দু’গ্রামেই সমানভাবে ওঠে এবং সমানভাবেই অস্ত যায়। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই তাদের সমস্যাগুলো আলাদা আলাদা জেলায় ঢুকে পড়ে। এখানেই এসে ভূগোল নিঃশব্দে দর্শনে রূপ নেয়, আর মানুষ বুঝতে পারে, দূরত্ব শুধু মাইল দিয়ে মাপা হয় না, দিক দিয়েও মাপা হয়।
আজকের মানুষ এই দর্শন না জেনেই বেঁচে আছে, অথবা জেনেও উপেক্ষা করছে। সে একই ক্যাফেতে বন্ধুর সামনে বসে থাকে, অথচ কথা বলে এমন কারও সঙ্গে, যার সঙ্গে দেখা করার না ইচ্ছে আছে, না সময়। সামনের মানুষটি কাশলেই আমরা উপেক্ষা করি, কিন্তু ফোনে সামান্য কম্পন হলেই পুরো অস্তিত্ব চমকে ওঠে। ক্লাসরুমে আমরা শিক্ষকের দিকে তাকিয়ে থাকি, অথচ মন আটকে থাকে এই প্রশ্নে, ইন্টারনেট এত ধীর কেন, আর দুনিয়া এত দ্রুত কেন।
বাড়ির চিত্রও আলাদা নয়। সবাই একই ঘরে বসে থাকে, অথচ প্রত্যেকের জগৎ সঙ্কুচিত হয়ে ঢুকে পড়ে একটি পর্দার ভেতর। কথা কম, নোটিফিকেশন বেশি। কখনো কখনো যদি নীরবতা একটু বেশি ঘনীভূত হয়, কেউ জিজ্ঞেস করে বসে, “চার্জারটা কোথায় রাখা?” আর এই একটি বাক্যই পারিবারিক আলাপের চূড়ায় পৌঁছে যায়।
ইবাদতখানাতেও প্রায় একই অবস্থা। দেহ কিবলার দিকে, কিন্তু মন অন্য কোনো দিকে নিবন্ধিত। দোয়া ঠোঁটে থাকে, আর চিন্তা ব্যস্ত থাকে কোথাও অন্যখানে। হয়তো এখন আমরা ইবাদতও করি ঠিক সেভাবেই, যেভাবে বার্তা লিখি- সংক্ষিপ্ত, তাড়াহুড়ো করে, এবং কোনো উত্তরের প্রত্যাশা ছাড়াই।
আমরা সবাই একই সঙ্গে জিগাহাঁও, আবার চিতারাও। দেহ এখানে, কিন্তু মন কোথাও অন্যত্র নথিভুক্ত। আমরা এতটাই সংযুক্ত হয়ে পড়েছি যে, একে অপরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছি। দূরত্ব ঘোচাতে গিয়ে আমরা দিক হারিয়ে ফেলেছি। এখন আর জানিই না, আমরা কোন জেলার বাসিন্দা, ভূগোলের না মনের।
আমরা ডিসেম্বরের মতো পুরোনো অভ্যাস আঁকড়ে ধরে রাখি, আর জানুয়ারির মতো নতুন হয়ে ওঠার সংকল্প করি, দুটোই করি পূর্ণ আন্তরিকতায়, এই ভেবে না যে শেষ পরিণতি কী হবে। আমরা একে অপরের এত কাছে যে কাঁধ ছুঁয়ে যেতে পারি, তবু একে অপরের হৃদয়ে পৌঁছাতে হলে বোধ হয় এখন আমাদের মানচিত্রেরই প্রয়োজন।
জিগাহাঁ ও চিতারার মাঝখানে সেই অদৃশ্য সীমারেখাটির দিকে যখন তাকাই, তখন মনে হয়, আমরা সবাই আমাদের জীবনে ঠিক এমনই কোনো এক রেখার উপর দাঁড়িয়ে আছি। এক পা এদিকে হলে তা অতীত, আরেক পা ওদিকে হলে ভবিষ্যৎ। এক পা এদিকে হলে প্রতিবেশী, এক পা ওদিকে হলে অপরিচিত। আমরা পাশাপাশি আছি, কিন্তু সহযাত্রী নই। আর সম্ভবত এটাই আধুনিক মানুষের সবচেয়ে বড় এবং সবচেয়ে তীক্ষ্ণ পরিহাস, সে এতটাই কাছে এসে গেছে যে নিজেকেই হারিয়ে ফেলেছে, নিজের থেকেই বহু দূরে সরে গেছে।
———-
| ক্যাটাগরি : নাসিহাহ, তাজকিয়াহ, আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা।
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍️ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7995