AkramNadwi

শিরোনাম : চাবুকের যুগে যুক্তি

শিরোনাম : চাবুকের যুগে যুক্তি<br>

২৩ জানুয়ারি ২০২৬

মীর সাহেব এক এমন মজলিসে উপস্থিত ছিলেন, যেখানে কবিতা ও সাহিত্যের সূক্ষ্ম রুচি নিয়ে আলোচনা চলছিল। শব্দের ওঠানামা, অর্থের গভীরতা ও পৃষ্ঠতল, ভাষাশৈলীর কোমলতা ও সৌন্দর্য, সবই ছিল আলোচনার কেন্দ্রে। এমন সময়, যেমনটি প্রায়ই হয়ে থাকে, কথা গড়িয়ে গিয়ে পড়ল আলেমসমাজের প্রসঙ্গে।

মীর সাহেব অত্যন্ত গম্ভীরতার সঙ্গে বললেন, আলেমদের তিনি ভালোবাসেন। বরং যে কেউ যে কোনো স্তরে আল্লাহর দীনের জন্য কাজ করে, তাঁর কাছে সে ব্যক্তি সম্মানের যোগ্য। কিন্তু একই সঙ্গে তিনি একটি গভীর বেদনাবোধের কথাও উল্লেখ না করে পারলেন না।

তিনি বললেন, তাঁদের সবচেয়ে বেশি অস্বস্তি হয় সেইসব মানুষের আচরণে, যারা আল্লাহর পবিত্র দীনকে এক পাশে সরিয়ে রেখে নিজেদের মাযহাব ও বড়দের প্রশংসাকেই ধর্মপরায়ণতার মাপকাঠি বানিয়ে নিয়েছে। সমস্যা এই নয় যে তারা নিজেদের মাযহাব অনুসরণ করে, এটি তো প্রত্যেক মানুষের অধিকার। আসল সমস্যা হলো, যদি কেউ সামান্য পরিমাণেও তাদের মাযহাব বা বড়দের সঙ্গে ভিন্নমত পোষণ করে, তাহলে তার সঙ্গে এমন আচরণ করা হয় যেন সে কোনো নৈতিক ভুল নয়, বরং শাস্তিযোগ্য অপরাধ করে ফেলেছে। সেখানে মতভেদ আর বুদ্ধিবৃত্তিক বিষয় থাকে না, তা অপরাধে পরিণত হয়।

তর্ক-বিতর্ক ও প্রতিবাদী লেখালেখি তাদের কাছে নিছক জ্ঞানচর্চা নয়; বরং সেগুলো সুপরিকল্পিত অস্ত্র, যার মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখা হয়। যেমন শিশুদের মারধর করে বশ মানানো হয়, তেমনি চিন্তাশীল ও মতবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষদের ভয়ংকর, ভারী ও প্রভাবশালী প্রতিবাদী গ্রন্থের মাধ্যমে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করা হয়। পার্থক্য শুধু এতটুকু, ওখানে হাত ওঠে, এখানে ওঠে কলম। কিন্তু পরিণতি উভয় ক্ষেত্রেই এক, নির্বাক আনুগত্য। এই সবকিছুই সেই মানসিকতার ফল, যেখানে যুক্তির জায়গা দখল করে নেয় চাবুক।

আমি বললাম, মীর সাহেব, এই কথাগুলো তো আপনি সরাসরি মুফতি সাহেবের সামনে বলতে পারবেন না।

তিনি বললেন, ভাই, মুফতি সাহেব এখন তাঁর দরসগাহে আছেন। তাই আমাকে একটু নিশ্চিন্তে কথা বলতে দিন।

সাধারণ মানুষের মধ্যে এ কথা বেশ প্রচলিত যে মুফতি সাহেবের কাশফ হয়। আর যারা এই আধ্যাত্মিক ক্ষমতায় বিশ্বাস করেন না, তারা বলেন, মুফতি সাহেব চারদিকে গুপ্তচর বসিয়ে রেখেছেন। যাই হোক, সত্য যাই হোক না কেন, রাগে লাল হয়ে মুফতি সাহেব ঠিক সেই সময়েই এসে হাজির হলেন।

মীর সাহেবের অবস্থা এমন হয়ে গেল যে মনে হচ্ছিল শ্বাস আটকে গেছে। যেন কোনো চূড়ান্ত মুহূর্ত এসে গেছে। কিন্তু মুফতির রোষ নেমে আসার আগেই মীর সাহেব অদ্ভুত শান্ত স্বরে বললেন,

মুফতি সাহেব, জানা ছিল আপনি পড়াশোনা করেন না, কিন্তু এটা জানা ছিল না যে আপনি ছাত্রদের পড়ানও না। তাহলে তাদের মাদরাসায় আটকে রাখার কারণ কী?

মুফতি সাহেব জবাব দিলেন, আপনাকে কে বলেছে যে আমরা মাদরাসায় ছাত্রদের পড়াই কিংবা তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান শিক্ষা দিই?

আমি বললাম, মাদরাসা কি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়?

তিনি বললেন, না, মাদরাসা কোনো শিক্ষালয় নয়, এটি একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। আমরা ছাত্রদের এখানে রাখি যাতে তারা টুপি, কুর্তা ও পায়জামা পরতে শেখে এবং বড়দের পথের অনুগত হয়। আমাদের পূর্বসূরিদের বাণী হলো, যে ব্যক্তি বড়দের রীতি আয়ত্ত করে নেয়, সে অশিক্ষিত হলেও সেই সব শিক্ষিত আল্লামাদের চেয়ে অনেক উত্তম, যারা না টুপি পরে, না পাগড়ি বাঁধে।

মীর সাহেব সরলভাবে জিজ্ঞেস করলেন, মুফতি সাহেব, যখন তারা কিছুই পড়ে না, তখন তারা আপনার কথা মানে কেন?

মুফতি সাহেব গর্বের সঙ্গে বললেন, কে বলেছে আমরা তাদের নকলি বা আকলি দলিল দিয়ে বোঝাই? আমরা শুধু আলখেল্লা ও পাগড়ির মালিক নই, আমরা চাবুক ও লাঠিরও মালিক। যে ছাত্র বড়দের পথ নিয়ে প্রশ্ন তোলে, আমরা তাকে এমন শিক্ষা দিই যে তার আত্মা পর্যন্ত কেঁপে ওঠে।

আমি বললাম, তাহলে তো সে পালিয়েই যাবে।

তিনি বললেন, সেটাই তো আমরা চাই। সে যদি থেকে যায়, তবে অন্য ছাত্রদের মন নষ্ট করবে। সে মার খেয়ে পালিয়ে যায়, আর বাকিরা শিক্ষা নেয়। এভাবেই সবাই আমাদের ভয়ে থাকে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, শিক্ষিত লোকেরা যখন আপনার মাযহাব বা বড়দের বিরুদ্ধে কথা বলে, তখন সেখানে মারধর করা হয় না কেন?

তিনি বললেন, প্রতিটি পরিস্থিতির কৌশল আলাদা। তাদের বিরুদ্ধে আমরা কঠোর প্রতিবাদী লেখা লিখি, বিতর্কে আহ্বান জানাই, বদনাম ও অপমান করতে কোনো ত্রুটি রাখি না। আপনি নিশ্চয়ই শুনেছেন, লাথির ভূত কথায় মানে না। এখানেও আমাদের উদ্দেশ্য তাদের ফিরিয়ে আনা নয়, বরং ভবিষ্যতে যেন কেউ আমাদের মাযহাবের বিরোধিতা বা বড়দের পথ থেকে বেরিয়ে আসার সাহস না করে।

আমি বললাম, অর্থাৎ ছাত্রদের ওপর যে কৌশল প্রয়োগ করেন, লেখকদের ওপরও তাই?

তিনি বললেন, একদম ঠিক বুঝেছেন।

এবার মীর সাহেব হালকা হাসি দিয়ে বললেন, আমি যখন বলেছিলাম যে মুফতি ও মোল্লারা সহিংসতার মাধ্যমে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখে, তখন আপনার এত আপত্তি হয়েছিল কেন? এখন তো আপনি নিজেই গর্বের সঙ্গে তার স্বীকারোক্তি দিচ্ছেন।

মুফতি সাহেব বললেন,
মীর সাহেব, আপনি বড়ই সরলমনা। প্রথমত, যে কথাটি আমরা বহু পরিশ্রমে গোপন রাখি, আপনি তা সবার সামনে বলে ফেলেছেন। দ্বিতীয়ত, সত্য কথাটাই যদি বলতেন, অন্তত ভদ্র ও শালীন ভাষায় বলা উচিত ছিল। আপনার বলা উচিত ছিল, আমরা মুনাযারা ও প্রতিবাদী লেখার মাধ্যমে ‘সঠিক মাযহাব’-এর প্রতিরক্ষা করি।

মীর সাহেব জিজ্ঞেস করলেন,
আপনি যদি এভাবেই মানুষকে বিদ্রোহী বলে দাগাতে থাকেন, তাহলে কি একদিন তারা নিজেদের মাদরাসা বা দারুল ইফতা খুলে বসবে না?

মুফতি সাহেব বললেন,
আমরা এতটা নির্বোধ নই। যে আমাদের মাযহাবের বিরুদ্ধে ফতোয়া দেয়, বা কিছু লিখে কিংবা বলে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে তাকে হাদিস অস্বীকারকারী, পথভ্রষ্ট, সাহাবায়ে কেরামের অবমাননাকারী কিংবা জমহুরের বিরোধী বলে ঘোষণা করে দিই। এরপর সে আজীবন নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণায় ভুগতে থাকে।

আমি বললাম,
মুফতি সাহেব, আপনি তো জানেন, মাযহাব আর ‘বড়দের’ কেন্দ্র করেই উম্মাহ বিভক্ত হয়েছে। আপনি সরাসরি কুরআন, সুন্নাহ ও সাহাবাদের অনুসরণের আহ্বান জানান না কেন?

তিনি বললেন,
ভাই, আমরা যদি এটা শুরু করি, তাহলে আমাদের গোটা গোষ্ঠীটাই বিলীন হয়ে যাবে।

আমি বললাম,
তাহলে মুসলমানরা কুরআন-সুন্নাহ ছেড়ে আপনার ফাঁদে পড়ে কীভাবে?

তিনি বললেন,
এরও কৌশল আছে। কেউ যখন কুরআন-সুন্নাহর কথা তোলে, আমরা সঙ্গে সঙ্গে জিজ্ঞেস করি, কুরআন-সুন্নাহ তুমি বেশি বোঝ, না আমাদের আকাবিররা? আমাদের আকাবিররা জ্ঞান ও তাকওয়ায় তোমাদের চেয়ে লক্ষগুণ শ্রেষ্ঠ ছিলেন। এটা শুনে সাধারণত লোকজনের মুখ বন্ধ হয়ে যায়।

মীর সাহেব বললেন,
জবাবটি নিঃসন্দেহে দাঁতভাঙা। কিন্তু সাহাবাদের সত্যের মানদণ্ড মেনে নিয়ে আবার আকাবিরদের মানদণ্ড বানানো, এটা কীভাবে সঠিক হয়?

মুফতি সাহেব বললেন,
আমরা বলি, সাহাবাদের মধ্যেও মতভেদ ছিল। মানুষ যদি সরাসরি তাদের অনুসরণ করে, তাহলে তারা প্রবৃত্তির দাস হয়ে যাবে। আমাদের আকাবিররা জানতেন কোনটি প্রাধান্যযোগ্য, আর কোনটি নয়। নইলে তো কেবল বিভ্রান্তিই ছড়াবে।

আমি বললাম,
যদি আপনার আকাবিররা এতই বরকতময় হতেন, তাহলে তারা চতুর্দশ শতকে ভারতে জন্মালেন কেন? প্রথম শতকে মক্কা-মদিনায় কেন জন্মালেন না?

তিনি বিরক্ত হয়ে বললেন,
আমি তোমাদের নিয়ে ক্লান্ত হয়ে গেছি। আমি তো অনেক আগেই বলছি, আমাদের লাভ মুসলমানদের আলাদা আলাদা দলে ভাগ করে রাখার মধ্যেই। তারা যদি এক হয়ে যায়, তাহলে আমাদের আর কে জিজ্ঞেস করবে?

আমরা একসঙ্গে বললাম,
মুফতি সাহেব, মুসলমানদের প্রতি আপনার এত বিদ্বেষ কেন? কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, “নিশ্চয়ই মুমিনরা পরস্পর ভাই।”
আর সহিহ হাদিসে এসেছে:
“মুসলমান সে-ই, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলমান নিরাপদ থাকে।”

তিনি বললেন,
না, এই আয়াত তার সাধারণ অর্থে প্রযোজ্য নয়, আর এই হাদিসও নয়। কারণ যে মুসলমান চুরি করে, তার হাত কাটা হয়; যে অপবাদ দেয়, তাকে চাবুক মারা হয়; আর যে ব্যভিচার করে, তাকে পাথর নিক্ষেপ করা হয়। এর থেকে প্রমাণিত হয়, ঈমানি ও ইসলামী ভ্রাতৃত্ব কেবল কিছু নির্দিষ্ট লোকের জন্যই। উপরন্তু, সব দলিল গভীরভাবে পর্যালোচনা করে আমরা নিশ্চিতভাবে জেনে গেছি, এই আয়াত ও এই হাদিস মূলত আমাদেরই দলের অনুসারীদের জন্য।

মুফতি সাহেব বিজয়ীর ভঙ্গিতে আমাদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
এখনও সময় আছে। তোমরা দু’জন আমার মুরিদ হয়ে যাও, আর টুপি পরা শুরু করো। নইলে এভাবেই অপদস্থ হয়ে থাকবে।

আমরা বললাম, আমরা অপদস্থ কেন?

তিনি বললেন,
আমার সঙ্গে বাজারে চলো। পথে যত মুসলমানের সঙ্গে দেখা হবে, সবাই আমার সঙ্গে মুসাফাহা করবে। তোমাদের কেউ জিজ্ঞেসও করবে না। বিয়ে পড়াতে হলে, জিন ছাড়াতে হলে, জাদু তাড়াতে হলে, মুসলমানরা আমার কাছেই আসে, তোমাদের কাছে নয়।

এরপর তিনি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,
আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে। এখন মাদরাসা বন্ধ করার সময়। আমি পড়াশোনা করি কি না, ছাত্রদের কিছু পড়াই কি না, সেটা বড় কথা নয়। নিয়ম করে ছাত্রদের নিজ নিজ শ্রেণিতে আমি-ই আনি, আর আমার অনুমতি ছাড়া তাদের ছুটি হয় না।

এই মজলিসের পর থেকেই মীর সাহেব ভীষণ অসুস্থ। কেউ কেউ বলেন, মুনাযারা আর প্রতিবাদী লেখা না শিখে তিনি যে বড় ভুল করেছেন, সেই আফসোসেই নাকি তিনি রোগে পড়েছেন। আবার কারও ধারণা, মুফতি সাহেব যে অপমানজনক ভঙ্গিতে তাঁকে পরাজিত করলেন, সেই আঘাতই তাঁকে ভেঙে দিয়েছে।

সত্য হলো, এই মজলিসের প্রভাব আমার ওপরও কম পড়েনি। সেই মানসিক অবস্থার কারণেই এখনো মীর সাহেবের খোঁজ নিতে যেতে পারিনি।
আর সম্ভবত এটাই এই কাহিনির সবচেয়ে নীরব, অথচ সবচেয়ে অর্থবহ পরিণতি,
যেখানে যুক্তির জায়গায় চাবুকই সত্যের মানদণ্ড হয়ে দাঁড়ায়, সেখানে অসুখ শুধু শরীরে বাসা বাঁধে না, বিবেকও অসুস্থ হয়ে পড়ে।

———-

ক্যাটাগরি : ইসলামি চিন্তাধারা, সমালোচনা, উপদেশ

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8261

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *