AkramNadwi

শিরোনাম : গাজার যুদ্ধ প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন। ——

শিরোনাম : গাজার যুদ্ধ প্রসঙ্গে কিছু প্রশ্ন।
————–

= আমাকে আমেরিকার এক আলেম ও ইমামের পক্ষ থেকে তিন দফায় কিছু প্রশ্ন পাঠানো হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল, গাজা ও ফিলিস্তিনে ইসরাইলি আগ্রাসন মোকাবিলায় আমার দৃষ্টিভঙ্গি জানা। নিচে প্রশ্নগুলো উল্লেখ করা হলো, তার পর রয়েছে আমার উত্তর।

প্রশ্ন ১:

মধ্যপ্রাচ্যে, বিশেষত ফিলিস্তিন ও গাজায় চলমান সংকটের প্রেক্ষিতে সাধারণ মুসলমানরা, আর বিশেষভাবে পশ্চিমে বসবাসকারী মুসলমানরা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে? মুসলিম জনসাধারণ কীভাবে ফিলিস্তিনিদের সহায়তা করতে পারে? এ সময় মুসলিম কমিউনিটি নেতারা, কর্মীরা ও ইমামগণ কীভাবে তাদের সম্প্রদায়কে সঠিকভাবে দিকনির্দেশনা দেবেন—দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি লক্ষ্য বিবেচনায় রেখে, যাতে আল্লাহর সাহায্য ও সমর্থন লাভ করা যায় এবং মানুষদের হৃদয় ও চিন্তাধারায় যুদ্ধের শিকারদের প্রতি সহানুভূতি জাগ্রত হয়।

উত্তর:

পশ্চিমের নেতৃস্থানীয় ও প্রভাবশালী মুসলমানদের উচিত সবার আগে নিজেদের সম্প্রদায়ের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া। অত্যন্ত জরুরি হলো, তারা যেন শান্তিপ্রিয় মানুষ হিসেবে পরিচিত হন, প্রতিবেশীদের সম্মান করতে আগ্রহী হন এবং যেসব দেশে তারা বসবাস করছেন, সে দেশগুলোর উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন।

যেসব কথা ও কাজ মুসলমানদের প্রতি মানুষের সম্মান ও ভালোবাসা বাড়ায়, সেগুলোকে উৎসাহিত করতে হবে, আর যেসব কারণে মুসলমানদের অপছন্দ ও অবিশ্বাস করা হয়, সেগুলো থেকে বিরত থাকতে হবে।

এরপর, তাদের মনোযোগ দিতে হবে বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তে নিপীড়িত মানুষের প্রতি। তাদের আর্থিকভাবে সহায়তা করা, তাদের দুরবস্থার বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং মানুষের দৃষ্টি তাদের পরিস্থিতির দিকে আকর্ষণ করা উচিত। এসব কাজ করতে হবে একই মানসিকতার ব্যক্তি ও সংগঠনের সাথে সমন্বয় করে।

যদি মুসলমানরা সব সময় নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়ায়—তাদের ধর্ম বা পরিচয় যাই হোক না কেন—তাহলে মুসলমানরা ন্যায়পরায়ণ জাতি হিসেবে পরিচিত হবে। তখন যখন তারা নিপীড়িত মুসলমানদের পক্ষে দাঁড়াবে, তখন অন্যান্য সম্প্রদায়ের মানুষও তাদের সমর্থন করবে।

বর্তমান সংকটের প্রেক্ষিতে মুসলিম নেতাদের উচিত স্থানীয় সমাজের অবস্থা ভালোভাবে বিশ্লেষণ করা এবং একটি কার্যকর কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা। তারা যেন তাদের দেশের আইন ও প্রথার ভেতর থেকে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠায় সরকারের ওপর যথাযথ জনমত চাপ প্রয়োগ করেন। পাশাপাশি, আইন মেনে ফিলিস্তিনিদের আর্থিক সহায়তাও করতে হবে।

প্রশ্ন ২:

যখন মুসলিম বিশ্বে এ ধরনের সংকট দেখা দেয়, তখন আমরা দেখি কিছু আলেম ও আন্তরিক মুসলমান সেগুলোকে কিয়ামতের আলামত হিসেবে বোঝেন—যেমন হত্যাকাণ্ডের বিস্তার (যা সত্যিই ঘটছে)—সেই ভূমিতে, যেখানে নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পূর্বাভাস দিয়েছিলেন যে কিয়ামতের আলামত প্রকাশ পাবে। আপনি কি ব্যাখ্যা করতে পারেন আমরা কিয়ামতের আলামত কীভাবে বুঝব? কেন নবী বহু আলামত সম্পর্কে পূর্বাভাস দিয়েছিলেন অস্পষ্ট ভাষায়, নির্দিষ্ট সময় ও প্রকৃতি না জানিয়ে? এসব শিক্ষা থেকে আমরা কী উপকার পাই? পৃথিবীতে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটলে এসব আলামতের সাথে তা যুক্ত করা কি ভালো? আমি দেখি, কখনো কিছু মানুষ এসব আলামত নিয়ে নিশ্চিত হয়ে যায়, আবার অন্যরা বিভ্রান্ত থাকে।

উত্তর:

এখানে আমাদের তিনটি বিষয় বুঝতে হবে।

প্রথমত, রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যেসব ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন, তার উদ্দেশ্য হলো—যখন মুসলমানরা বড় কোনো সংকটে পড়বে, তখন তারা যেন হতাশ না হয়; বরং তারা যেন দৃঢ় বিশ্বাস রাখে যে একদিন এ সব সংকট কেটে যাবে, আর মুসলিম উম্মাহর মর্যাদা ও সম্মান আবার পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।

দ্বিতীয়ত, আল্লাহ স্পষ্ট করে জানিয়েছেন যে কিয়ামতের সময় তাঁর অদৃশ্য জ্ঞানের অংশ, যা তিনি তাঁর রাসূলদের কাছেও প্রকাশ করেননি। সুতরাং নবীর এসব সতর্কবাণীর উদ্দেশ্য মানুষকে ভবিষ্যদ্বাণী করার সুযোগ দেওয়া নয়—যে বিষয় আল্লাহ তাঁর রাসূলদের কাছেও গোপন রেখেছেন। তবুও, যুগে যুগে বহু আলেম ও সাধক মাহদির আগমনের পূর্বাভাস দিয়েছেন, কিন্তু তাদের কোনো পূর্বাভাসই সত্য হয়নি।

প্রায় পঁচিশ বছর আগে আমি সিরিয়ায় গিয়েছিলাম। সেখানে এক শায়খ আমাদের সামনে বললেন, মাহদি আসন্ন মহররম মাসেই প্রকাশ পাবে। তিনি এ দাবির ভিত্তি হিসেবে কিছু হাদিসের নিজস্ব ব্যাখ্যা পেশ করেছিলেন। আমি তখন এ সফরের একটি ভ্রমণকাহিনি লিখছিলাম, তাই তাঁর পূর্বাভাসও সেখানে লিখে রেখেছিলাম। বই প্রকাশের আগে আমি সেটি শায়খের কাছে পাঠাই। তিনি আমাকে অনুরোধ করেন, মাহদির আগমনের পূর্বাভাস সংক্রান্ত অংশটি যেন আমি বই থেকে মুছে দিই। আমি তাঁর অনুরোধ মেনে নিই। এরপর থেকে বহু মহররম চলে গেছে, কিন্তু মাহদির কোনো লক্ষণ এখনো দেখা যায়নি।

তৃতীয়ত, এ সম্পর্কিত বাণীগুলো সাধারণ ভাষায় নয়; বরং সেগুলোর ভাষা স্বপ্নের ভাষার মতো। এগুলো যথাযথভাবে ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন, আর এটি মোটেও সহজ কাজ নয়। অনেক বক্তা সেগুলো নিজেদের চিন্তা ও ইচ্ছামতো ব্যাখ্যা করে থাকেন, আর এর ফলে তাদের একমাত্র সাফল্য হলো মানুষের মনকে উদ্বিগ্ন ও বিভ্রান্ত করা। আমাদের সব সময় এসব ব্যাখ্যার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।

সবশেষে, মানুষকে সচেতন থাকতে হবে যে কিয়ামতের আলামত সম্পর্কে অনেক হাদিস প্রচারিত হচ্ছে, যেগুলো সহিহ নয়। মুসলমানদের খুব সতর্কভাবে সেগুলো প্রকাশ ও প্রচার করা উচিত।

প্রশ্ন ৩:

কুরআন ও হাদিসে বনী ইসরাঈল ও নবী (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর যুগে বসবাসকারী ইহুদি সম্প্রদায় সম্পর্কে অনেক কিছু বলা হয়েছে। উভয় উৎসেই তাদের নানা নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য তুলে ধরা হয়েছে। এসব কুরআনিক আয়াত দেখে কিছু ইহুদি অভিযোগ করে যে কুরআন নাকি ইহুদিবিদ্বেষী (অ্যান্টি-সেমিটিক)। এসব আয়াত ও হাদিসের উদ্দেশ্য কী? ঘৃণা বা বিরূপ মনোভাব সৃষ্টি করা? তাদের অভিজ্ঞতা ও ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া? তাদের কৌশল ও ষড়যন্ত্র সম্পর্কে সচেতন থাকা? তাদের কর্মকাণ্ড অনুসরণ না করা? আপনি কি ব্যাখ্যা করবেন?

উত্তর:

বনী ইসরাঈলের বিদ্রোহী চরিত্রের গল্পগুলো কেবল কুরআন ও হাদিসেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং ইহুদিদের নিজেদের পবিত্র গ্রন্থ এবং তাদের রচিত ঐতিহাসিক বিবরণীতেও প্রায়ই এবং দীর্ঘভাবে তাদের ব্যর্থতা উল্লেখ করা হয়েছে—যেমন আল্লাহর অবাধ্যতা, নবীদের নির্যাতন, এমনকি নবী হত্যার ঘটনাও। তুলনা করলে দেখা যায়, ইসলামী উৎসগুলোতে এসব গল্প অনেক কম এসেছে, বিশদভাবে নয়, আর সেগুলোর ভাষায় ইহুদিদের নিজেদের গ্রন্থের মতো কঠোর নিন্দা নেই। তাই যদি কখনো ‘অ্যান্টি-সেমিটিক’ শব্দের ব্যবহার প্রাসঙ্গিক হয়, তবে সেটি ইহুদিদের নিজেদের মূল উৎসপুস্তকের জন্য বেশি প্রযোজ্য, ইসলামী উৎসের জন্য নয়।

কুরআন ও হাদিস বনী ইসরাঈলের গল্পগুলো কেবল বর্ণনার জন্য উল্লেখ করেনি। বরং এর উদ্দেশ্য—যেমন কুরআন ও হাদিসের সবকিছুর উদ্দেশ্য—মুসলমানদের জন্য হিদায়াত দেওয়া, নাজিলের যুগেও এবং পরবর্তী সব সময়ের জন্যও। এসব আয়াত ও হাদিসে বর্ণিত গল্পগুলো মুসলমানদের শিক্ষা দেয়। বিশেষ করে এটা শেখায় যে আল্লাহ কোনো জাতির সাথে রক্তের সম্পর্ক রাখেন না, তিনি মানুষের মতো পক্ষপাতিত্বও করেন না। বনী ইসরাঈলকে আল্লাহ অবশ্যই মর্যাদা দিয়েছিলেন, কিন্তু যখন তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছে, আল্লাহর অবাধ্যতা করেছে এবং আল্লাহর পাঠানো নবীদের সাথে বিদ্রোহ করেছে—তখন তারা তাদের রবের অনুগ্রহ থেকে বঞ্চিত হয়েছে। একইভাবে, যদি মুসলমানরা আল্লাহর অবাধ্য হয়, তবে তারাও বনী ইসরাঈলের মতো কষ্ট ও শাস্তির শিকার হবে।

——————–
ক্যাটাগরি : উপদেশ, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7018

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *