AkramNadwi

শিরোনাম : খেলা, বিনোদন ও জীবন (জাফর মাসউদ হাসানীর

শিরোনাম : খেলা, বিনোদন ও জীবন
(জাফর মাসউদ হাসানীর একটি উদ্ধৃতি)
———-

এক সময় ছিল, যখন মুসলমানদের জীবনের আকাশে তলোয়ার চালনা, তীরন্দাজি এবং অশ্বারোহণ উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো দীপ্তি ছড়াত। সেই নক্ষত্রগুলোর আলোয় সাহস, দক্ষতা ও পুরুষোচিত দৃঢ়তার এক সমগ্র জগৎ গড়ে উঠেছিল। তখন যুদ্ধক্ষেত্রই ছিল খেলাধুলার ময়দান, আর প্রতিটি তরুণ তার বাহুর শক্তি ও হৃদয়ের সাহসকে সেখানেই যাচাই করত। কিন্তু সময়ের আবর্তনে যখন নতুন নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হলো, তখন খেলাধুলার জগতেও নতুন নতুন রং ফুটে উঠল।

দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা স্বভাবগতভাবেই প্রাচীন ও আধুনিকতার এক সুন্দর সমন্বয়। এখানে অতীতের গম্ভীর মর্যাদা এবং বর্তমানের সজীব প্রাণোচ্ছলতা পাশাপাশি দীপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে এখানে যেমন জ্ঞানচর্চার আসরে চিন্তা ও ভাবনার প্রদীপ জ্বলে থাকে, তেমনি মাঠে মাঠে ক্রিকেট, ফুটবল, ভলিবল ও ব্যাডমিন্টনের প্রাণবন্ত কোলাহলও দেখা যায়। যেন জ্ঞান ও কর্মের এই জনপদ এক এমন উদ্যান, যেখানে প্রজ্ঞার সুউচ্চ বৃক্ষও আছে, আবার আনন্দের রঙিন ফুলও ফুটে আছে। কবির ভাষায়—
“মজনুর যুগ পেরিয়ে গেছে, এখন আমাদের পালা।”

নদওয়ার পরিবেশে জ্ঞানের গাম্ভীর্যের সঙ্গে জীবনের সতেজতাও ঢেউ তোলে। এখানে ছাত্রদের পদচারণা কেবল বইয়ের স্তূপের নিচে চাপা পড়ে থাকে না; যখন তারা মাঠের বিস্তারে পা রাখে, তখন মনে হয় যেন খাঁচা থেকে মুক্ত পাখিরা নীল আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছে। তাদের মুখে উদ্দীপনার লালিমা আর চোখে দৃঢ় সংকল্পের দীপ্তি এমনভাবে ঝলমল করে, যেন সকালের সূর্যের প্রথম রশ্মি শিশিরবিন্দুর উপর ঝিকমিক করছে।

দৌড় প্রতিযোগিতায় যখন তরুণদের সারি মাঠ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দৃশ্যটি এমন মনে হয় যেন তীব্র বাতাসের বুকে তরঙ্গ ছুটে চলেছে, অথবা দ্রুতগামী কোনো কাফেলা নীরব মরুভূমির বিস্তৃত প্রান্তর চিরে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের প্রতিটি পদক্ষেপ মাটিকে স্পর্শ করলেও মনে হয়, যেন গতির বেগ তাকে মাটির বন্ধন থেকে মুক্ত করে দিয়েছে।

ফুটবলের মাঠে বল কখনো আকাশের আঁচল থেকে ছিটকে পড়া তারার মতো ঝলসে ওঠে, আবার কখনো সবুজ ঘাসের উপর এমন ছুটে চলে যেন কোনো চঞ্চল হরিণ বনপথে উচ্ছ্বাসে দৌড়ে যাচ্ছে। খেলোয়াড়দের বল আদান-প্রদান একে অপরের সঙ্গে এমনভাবে যুক্ত হয়, যেন গল্পের মুক্তোগুলো একই সুতোয় গাঁথা হচ্ছে। কখনো বল কারও পা থেকে ফসকে গেলে দর্শকদের হাসি এমনভাবে গর্জে ওঠে, যেন মেঘের বজ্রধ্বনি নিস্তব্ধ আকাশকে কাঁপিয়ে দিয়েছে। আর কোনো চমৎকার গোল হলে হাততালির বৃষ্টি নেমে আসে, যেন বর্ষার ফোঁটা তৃষ্ণার্ত মাটিতে করুণার মতো ঝরে পড়ছে।

হকি ও ক্রিকেটের মাঠের দৃশ্যও কম মনোহর নয়। যেন কোনো দক্ষ শিল্পীর ক্যানভাস, যেখানে খেলোয়াড়দের গতিবিধি রঙিন রেখার মতো চলমান থাকে। ব্যাটের সঙ্গে বলের সংঘর্ষ এমন অনুভূতি জাগায়, যেন নিস্তব্ধ আকাশে হঠাৎ বিদ্যুতের সূক্ষ্ম ঝলক ছুটে গেল। প্রতিটি শট এক একটি গল্প, প্রতিটি পাস এক একটি কাহিনি, আর প্রতিটি নড়াচড়া দক্ষতা ও সাহসের নতুন অধ্যায় উন্মোচন করে।

তবে এই মাঠগুলোর আসল প্রাণ শুধু খেলোয়াড়দের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। দর্শকদেরও নিজস্ব এক জগৎ আছে, যা এই দৃশ্যকে জীবনের উষ্ণতা দেয়। কেউ কেউ রসিকতার সূক্ষ্ম তীর ছুড়ে দেয়, কেউ সরল হৃদয়ের হাসিতে এমনভাবে ফেটে পড়ে যেন বসন্তে বাগানের চারদিকে ফুল ছড়িয়ে পড়েছে। কখনো কোনো ছাত্র হঠাৎ একটি শের পড়ে শোনায়, আর মনে হয় খেলাধুলার ময়দান মুহূর্তের জন্য কবিতার আসরে পরিণত হয়েছে। কখনো কোনো রসিকতা বাতাসে ভেসে ওঠে, আর তার পরেই হাসির ঢেউ এমনভাবে ছুটে যায় যেন নদীর তরঙ্গ তীরে আছড়ে পড়ে ফিরে আসছে।

প্রতিযোগিতার মুহূর্তগুলো তো যেন আবেগের ঝড় বয়ে আনে। ক্রিকেট ম্যাচে যদি বল কোনো ফিল্ডারের হাত থেকে ফসকে যায়, দর্শকদের হাসি তখন এমনভাবে প্রতিধ্বনিত হয় যেন পাহাড়ের বুকে মেঘের গর্জন প্রতিফলিত হচ্ছে। আবার ফুটবলের কোনো চমৎকার গোলের পর হাততালির ঝড় ওঠে, আর পরাজিতরাও নিজেদের পরাজয়কে রসিকতার রঙিন আবরণে ঢেকে হাসিমুখে মেনে নেয়। এভাবেই পরাজয়ও এক মধুর কাহিনিতে রূপ নেয়, আর বিজয় হয়ে ওঠে এক জীবন্ত স্মৃতি।

বাস্তবে খেলা শুধু শরীরের শক্তি যাচাইয়ের মাধ্যম নয়; এটি নৈতিক ও সামাজিক শিক্ষার এক নীরব পাঠশালাও। এখানে বন্ধুত্বের বন্ধন গড়ে ওঠে, হৃদয়ে ভালোবাসার প্রদীপ জ্বলে ওঠে, আর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার গাম্ভীর্যের পাশে জন্ম নেয় এক প্রাণোচ্ছল মানবিকতা, যা ব্যক্তিত্বকে দেয় সুন্দর ভারসাম্য। খেলাধুলা ছাত্রদের অন্তরে স্বাধীনতা, সৃজনশীলতা ও আনন্দের বীজ বপন করে, যা পরবর্তীতে জীবনের বিস্তৃত প্রান্তরে একদিন মহীরুহে পরিণত হয়।

এইভাবেই নদওয়ার মাঠে খেলাধুলার এই দৃশ্যগুলো নিছক ক্ষণিকের বিনোদন নয়; বরং এক জীবন্ত সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা। এখানে প্রতিটি খেলা এক একটি শিক্ষা, প্রতিটি হাসি এক একটি গল্প, আর প্রতিটি মুহূর্ত এমন এক স্মৃতিচিত্র, যা মন ও মস্তিষ্কের দিগন্তে দীর্ঘকাল ঝলমল করে থাকে—যেমন গভীর রাত্রির অন্ধকার আকাশে দূর দিগন্তে জ্বলজ্বল

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *