|০২ |ফেব্রুয়ারি| ২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম শায়খ সাহেব। আমার এক বান্ধবী আছেন, উজমা আখলাক। তিনি পাকিস্তান কমিউনিটি গ্রুপ পরিচালনা করেন, একজন কমিউনিটি ওয়ার্কার, এবং উর্দু ভাষার প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে যাচ্ছেন। তিনি আপনার কাছে একটি প্রশ্ন করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
প্রশ্নটি হলো :
রমজান খুব কাছেই,
রমজানে কুরআন মাজিদ পড়ার সর্বোত্তম পদ্ধতি কী? বিশেষ করে এই কারণে যে, আমাদের অধিকাংশ মানুষই রমজানের ত্রিশ দিনে পুরো কুরআন খতম করার চেষ্টা করে, আর মাশাআল্লাহ অনেকেই একাধিকবারও খতম করে ফেলেন। কিন্তু আমি চাই, এই রমজানে অনুবাদসহ কুরআন পড়া শুরু করতে। স্বাভাবিকভাবেই অনুবাদসহ পড়লে এক মাসে পুরো কুরআন শেষ করা সম্ভব হয় না। তাহলে এই অবস্থায় সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি কী হওয়া উচিত?
অনুগ্রহ করে এর উত্তর দিলে আমরা সবাই উপকৃত হবো।
❖ উত্তর:
ওয়ালাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
রমজানুল মোবারক আসন্ন। এটি কুরআনুল কারিম অধ্যয়ন, গভীর চিন্তা ও আমলের জন্য সবচেয়ে বরকতময় ও মূল্যবান সময়। কুরআন মাজিদ কেবল একটি গ্রন্থ নয়; এটি রব্বুল আলামিনের পূর্ণ বার্তা, হিদায়াতের উজ্জ্বল পথ, এবং মানবজীবনের প্রতিটি দিকের জন্য এক জীবন্ত, সমন্বিত বিধান। এর প্রকৃত বরকত ও বাস্তব প্রভাব কেবল তারাই লাভ করে, যারা একে বুঝে পড়ে, গভীর মনোযোগ ও গুরুত্ব দিয়ে চিন্তা করে, এবং নিজের বাস্তব জীবনকে এর আলোয় গড়ে তোলে।
এটি রব্বুল আলামিনের পক্ষ থেকে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার, যা তাঁর সবচেয়ে প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ সা. এর প্রতি সর্বাধিক বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ হয়েছে :
হেরা থেকে নেমে এলো জাতির পথে,
সঙ্গে আনল এক মহামূল্য রসায়ন।
সেই সত্তার কসম, যিনি পুরো বিশ্বজগত সৃষ্টি করেছেন, এই ঐশী গ্রন্থের প্রতিটি সূরা পূর্ব ও পশ্চিমের সমস্ত জ্ঞানগর্ভ দর্শনের ওপর ভারী। এর সামনে অ্যারিস্টটল ও প্লেটোর দর্শন, কিংবা ইবনে সিনার আশ-শিফা–র মতো বিশাল গ্রন্থসমূহও তুচ্ছ হয়ে যায়। যে ব্যক্তি শুধু সূরা ফাতিহা, সূরা ইখলাস কিংবা আয়াতুল কুরসি নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে, তার কাছেই স্পষ্ট হয়ে যায়, যারা কেবল যুক্তির ভরসায় সত্যের সন্ধানে বেরিয়েছিল, তারা আসল গন্তব্য ‘লায়লা’কে ছেড়ে অন্য কাফেলার পেছনে ছুটেছে, আর সারাজীবন হোঁচট খেয়েই গেছে। মুতাকাল্লিমরা লায়লার কাফেলার চারপাশের ধুলাবালি নিয়েই বিতর্ককে সত্যে পৌঁছানোর পথ ভেবে বসেছে। আর কোনো কোনো সুফি লায়লার মহাফিলের অলংকরণকেই লায়লা মনে করার ভুলে পড়েছে। কী ভয়াবহ দৃষ্টিহীনতা, কী গভীর বিভ্রান্তি, যখন মানুষ মূল সত্য ছেড়ে বাহ্যিকতায় আটকে যায়!
এই বুদ্ধিবৃত্তিক ঝড়, এই মানসিক আবর্ত, আর শতাব্দীজুড়ে বিস্তৃত এই বিভ্রান্তি, সবকিছু থেকে মুক্তির যদি কোনো একমাত্র উপায় থাকে, তবে তা একমাত্র এই ঐশী গ্রন্থ। আর তা-ও তখনই, যখন একে বোঝা হয়, এতে গভীরভাবে চিন্তা করা হয়, এবং জীবনপথের দিশারি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
কুরআন সেই একমাত্র আলো, যা বুদ্ধিকে তার সীমা চিনিয়ে দেয়, হৃদয়কে তার সঠিক পথ দেখায়, এবং মানুষকে তার রবের সঙ্গে যুক্ত করে। তাই রমজানের বার্তা এই নয় যে কেবল কুরআন পড়ে ফেলা হবে; বরং বার্তা হলো, কুরআনকে চেনা, জানা ও উপলব্ধি করা। এই পরিচয়ই মানুষকে বিভ্রান্তির সব ঝড় থেকে রক্ষা করে হিদায়াতের তীরে পৌঁছে দেয়।
সবার আগে যে মৌলিক সত্যটি মনে গেঁথে নিতে হবে তা হলো, কুরআন দ্রুত দ্রুত শেষ করাই উদ্দেশ্য নয়। আল্লাহ তাআলা কিংবা তাঁর রাসুল সা. কেউই রমজানে কুরআন খতম করার কোনো বাধ্যবাধকতা আরোপ করেননি। কুরআন কারিম নবী সা. এর ইন্তেকালের সময় পূর্ণতা লাভ করে। তার আগে সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম কুরআনকে বিভিন্ন অংশ ও আয়াতের আকারে পড়তেন, বুঝতেন এবং তার ওপর আমল করতেন। এই আয়াতগুলোই আবু বকর রা., উমর রা., খাদিজা রা. ও আয়েশা রা. এর মতো মহামানব তৈরি করেছে, যাদের মর্যাদার প্রতি ফেরেশতারাও ঈর্ষান্বিত।
আসল লক্ষ্য হলো, প্রতিটি আয়াত বোঝা, প্রতিটি শব্দে থেমে চিন্তা করা, এবং তার প্রভাব নিজের জীবনে অনুভব করা। কুরআন তিলাওয়াতের প্রকৃত উপকার কেবল জিহ্বায় শব্দ উচ্চারণে নয়; বরং হৃদয়কে আলোকিত করা, বুদ্ধিকে অন্তর্দৃষ্টি দান করা এবং চরিত্রকে সংশোধন করার মধ্যেই তার সার্থকতা।
দুঃখজনক সত্য হলো, এই হিদায়াতের গ্রন্থের ওপর সবচেয়ে বড় অবিচার অনেক সময় তারাই করে, যারা বাহ্যিকভাবে এর সঙ্গে জড়িত বলে মনে হয়। বিশেষ করে তারা, যারা তারাবিতে অতি দ্রুত কুরআন পড়ে ফেলে, কিংবা সুরে-তালে গেয়ে একে কণ্ঠের প্রদর্শনীতে রূপ দেয়, অথবা খতমের সংখ্যা বাড়ানোই ফজিলতের মাপকাঠি মনে করে বসে। এই তিন ধরনের মানসিকতা থেকেই আপনাকে নিজেকে নিরাপদ রাখতে হবে।
আপনি যদি এখনো সূরা ফাতিহাতেই থাকেন, আর দেখেন আরেকজন পুরো কুরআন খতম করে ফেলেছে, তাহলে কখনোই হীনমন্যতায় ভুগবেন না। অনেক সময় এই থেমে যাওয়া, এই আয়াতে দাঁড়িয়ে থাকা, এই গভীর চিন্তাই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক মহা অনুগ্রহ হয়ে থাকে। কারণ কুরআন সেখানে গিয়েই প্রভাব ফেলে, যেখানে মানুষ থামে, মন দিয়ে শোনে, বোঝার চেষ্টা করে, এবং নিজেকে বদলাতে প্রস্তুত হয়।
ইমাম হাসান বসরি রহিমাহুল্লাহ এই ধরনের মানসিকতার বিরুদ্ধে অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন :
এই কুরআন এমন লোকেরাও পড়েছে, যারা এর ব্যাখ্যা ও অর্থ সম্পর্কে অজ্ঞ ছিল, আর শুরু থেকেই বিষয়টিকে সঠিকভাবে গ্রহণ করেনি। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন :
‘এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি তোমার প্রতি নাজিল করেছি, যেন তারা এর আয়াতসমূহে গভীরভাবে চিন্তা করে।’
আয়াতসমূহে চিন্তা করা মানে আসলে সেগুলোর অনুসরণ করা। আল্লাহ জানেন, কথা কেবল অক্ষর মুখস্থ করা আর সীমারেখা নষ্ট করার নয়। কেউ গর্ব করে বলে, আমি সম্পূর্ণ কুরআন পড়ে ফেলেছি, একটি অক্ষরও বাদ দিইনি। অথচ আল্লাহর কসম, বাস্তবে সে কুরআনকেই পরিত্যাগ করেছে; তার আচরণে ও কর্মে কুরআনের কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। আবার কেউ বলে, আমি এক নিঃশ্বাসেই পুরো একটি সুরা শেষ করে ফেলি। এরা প্রকৃত অর্থে কুরআনের পাঠক নয়, জ্ঞানী নয়, প্রজ্ঞাবান নয়, এমনকি মুত্তাকিও নয়। পূর্ববর্তী মানুষের মাঝে এমন কথা কখনো শোনা যেত না। আল্লাহ যেন এমন লোকের আধিক্য না ঘটান।
এই কথাগুলো আমাদের নাড়া দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। কুরআনের হক শুধু এটুকু নয় যে, সেটি পড়ে ফেলা হবে; বরং এর আসল হক হলো, একে বোঝা, এর আয়াতের সামনে থেমে চিন্তা করা, আর এর আলোতে নিজের জীবনকে গড়ে তোলা। এই পথই কুরআনকে নিছক তিলাওয়াতের স্তর থেকে তুলে এনে জীবন্ত ও কার্যকর হিদায়াতে রূপ দেয়। আর এটিই সেই উদ্দেশ্য, যার জন্য আল্লাহ তাআলা কুরআন নাজিল করেছেন।
সুতরাং রমজান মোবারকে যখন আপনি কুরআন তিলাওয়াত শুরু করবেন, তখন আপনার মন থেকে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ বের করে দিন, এই মাসে কুরআন খতম করতেই হবে। বরং আপনার সমস্ত মনোযোগ রাখুন এই দিকে যে, আপনি কুরআন বুঝছেন কি না, এর আয়াতে গভীরভাবে চিন্তা করছেন কি না, এবং এর বার্তাকে হৃদয়ে স্থান দিচ্ছেন কি না। যে সময় সাধারণত তাড়াহুড়ো করে কুরআন শেষ করতে ব্যয় করা হয়, সেই সময়টুকুই, অথবা যতটুকু আপনার পক্ষে সম্ভব- বোঝা, ভাবা ও গভীরভাবে চিন্তা করার কাজে লাগান।
এই পথে চললে শুধু সওয়াবই বাড়বে না; বরং ঈমান হবে আরও দৃঢ়, আল্লাহ তাআলার সঙ্গে সম্পর্ক হবে আরও গভীর ও স্থায়ী, আর জীবনে জন্ম নেবে অর্থবহতা, আলো ও প্রকৃত সৌন্দর্য।
এটাই সেই পদ্ধতি, যা আমরা সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম ও মহান তাবেয়িদের বাস্তব জীবন থেকে পাই। তারা কুরআনকে কেবল পড়ার একটি পাঠ্যবই মনে করতেন না; বরং শেখা, বোঝা ও আমল করার এক পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। এই সম্পর্কই তাদের হৃদয়কে আলোকিত করেছে, চরিত্রকে শুদ্ধ করেছে, এবং মানব ইতিহাসে তাদেরকে উজ্জ্বলতম আদর্শে পরিণত করেছে।
হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন :
আমাদের মধ্যে কেউ যখন দশটি আয়াত শিখত, তখন সে সেখান থেকে সামনে এগোত না, যতক্ষণ না সেগুলোর অর্থ ভালোভাবে বুঝে নিত এবং সে অনুযায়ী আমল করত।
এই একই সত্যকে আবু আবদুর রহমান আস-সুলামি রহিমাহুল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেন :
আমাদের যারা কুরআন পড়াতেন, তারা আমাদের জানিয়েছেন যে, তারা রাসুলুল্লাহ সা. এর কাছ থেকে কুরআন শিখতেন। যখন তারা দশটি আয়াত শিখে নিতেন, তখন যতক্ষণ না সেগুলোর আমল বাস্তব জীবনে প্রয়োগ করতেন, ততক্ষণ সামনে এগোতেন না। এভাবেই আমরা কুরআন ও আমল, দুটোই একসঙ্গে শিখেছি।
এটাই সেই মানহজ, যা কুরআনকে একটি জীবন্ত ও গতিশীল গ্রন্থে পরিণত করে, আর পাঠককে কেবল পাঠক নয়, বরং কর্মে রূপদানকারী একজন মানুষ বানায়। আপনি যদি আরবি ভাষায় দক্ষ না হন, তবে অবশ্যই কোনো বিশ্বস্ত ও নির্ভরযোগ্য অনুবাদ ও তাফসিরের সহায়তা নিন। এ ক্ষেত্রে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, মাওলানা আমিন আহসান ইসলাহী রহিমাহুল্লাহর “তাদাব্বুরে কুরআন” এবং মাওলানা সাইয়্যেদ আবুল আ‘লা মওদূদী রহিমাহুল্লাহর “তাফহীমুল কুরআন”। এই দুটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের কারণ হলো, এগুলোর ভাষা সহজবোধ্য, আর তাফসিরগুলো সমকালীন চিন্তা ও মানসিক প্রশ্নের যুক্তিনির্ভর জবাব দেয়; বিশেষত আধুনিক শিক্ষিত সমাজের জন্য এগুলো প্রশান্তি ও দিকনির্দেশনার উৎস।
এই বিষয়ে আমার বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে দুটি প্রবন্ধে “তাফসির: তাদাব্বুরে কুরআন” এবং “তাফহীমুল কুরআনের প্রতি কেন রেফারেন্স?”।
আসুন, এই রমজানে আমরা দৃঢ় অঙ্গীকার করি :
কুরআনকে আমরা কেবল পড়ার একটি বই হিসেবে নেব না; বরং একে আমাদের জীবনের কেন্দ্র, আমাদের পথনির্দেশনা ও হৃদয়ের আলো বানাব। কুরআনের সঙ্গে সময় কাটানো, একে বোঝা, এবং এর আলোয় নিজের জীবনকে গড়ে তোলাই আসলে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদত।
এই সত্যটিকেই এক হৃদয়বান কবি গভীরতায় এভাবে ব্যক্ত করেছেন :
যে তোমাকে চিনে নিয়েছে, সে প্রাণের কী পরোয়া করে,
সন্তান-পরিজন, ঘর-দুনিয়ারই বা কী দরকার থাকে?
যাকে তুমি আপন উন্মাদনায় ডুবিয়ে দাও, তাকে তো দুই জাহান দান করো,
তোমার প্রেমে যে হারিয়ে যায়, সে দুই জাহান নিয়ে কী করবে?
সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম ও তাবেয়িনে আজমের পদাঙ্ক অনুসরণ করে, অল্প কয়েকটি আয়াতই পড়ুন, কিন্তু তার অর্থে গভীরভাবে ডুবে যান, আর সেগুলোকে বাস্তব জীবনে কার্যকর করার আন্তরিক চেষ্টা করুন। এই পথই আপনাকে কুরআনের প্রকৃত প্রভাবের কাছে পৌঁছে দেবে, হৃদয় আলোকিত হবে, ঈমান মজবুত হবে, আর জীবন সত্যিকার অর্থে সুন্দর হয়ে উঠবে।
এ বিষয়ে আমার আরেকটি প্রবন্ধ “কুরআন কীভাবে বুঝে পড়বেন” আপনার জন্য উপকারী হতে পারে।
—————-
ক্যাটাগরি : কোরআন, রামাদান, তাজকিয়াহ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8338