AkramNadwi

শিরোনাম : কুরআনুল কারিমে শপথ প্রসঙ্গ

শিরোনাম : কুরআনুল কারিমে শপথ প্রসঙ্গ

|২৪|০১|২০২৬|

❖প্রশ্ন

প্রফেসর মুহাম্মদ আরশাদ সাহেব আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু। তিনি একজন গম্ভীর গবেষক, সংযত স্বভাবের মানুষ এবং রুচিশীল লেখক। তাঁর এক সহকর্মী প্রফেসর কুরআন কারিমে বর্ণিত শপথসমূহ সম্পর্কে একটি প্রশ্ন উত্থাপন করেছেন, যার সারসংক্ষেপ এই যে,
কুরআন কারিমে বিভিন্ন স্থানে যে শপথগুলোর উল্লেখ এসেছে, সেগুলো কি প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তাআলারই বলা, নাকি অনুবাদক ও মুফাসসিরদের বর্ণনাশৈলীর ফল, যা অনুবাদের সময় অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে?
আর যদি এই শপথগুলো সত্যিই আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকেই হয়ে থাকে, তবে প্রশ্ন ওঠে, আল্লাহ তায়ালার শপথ করার প্রয়োজনই বা কী? এই শপথগুলোর উদ্দেশ্য ও উপকারিতা কী?
আরও একটি প্রশ্ন হলো, মুসলমানরা তো শপথ ছাড়াই আল্লাহ তাআলার বাণীকে সত্য বলে মানে ও গ্রহণ করে, আর যারা সত্য অস্বীকারকারী, তারা তো আল্লাহকেই মানে না এবং কুরআনকেও আল্লাহর বাণী হিসেবে স্বীকার করে না। তাহলে তারা এই শপথগুলো কোন ভিত্তিতে গ্রহণ করবে?
এই প্রেক্ষাপটে কুরআন কারিমে শপথের ভাষাশৈলী ও এর অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা সম্পর্কে বিস্তারিত দিকনির্দেশনা কাম্য।

❖ উত্তর

কুরআনুল কারিমে যে শপথগুলো এসেছে, সেগুলো কেবল অনুবাদক বা মুফাসসিরদের ভাষাশৈলীর ফল নয়; বরং সেগুলো স্বয়ং আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে উচ্চারিত ঐশী বাণী। এই শপথগুলো ওহির অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা মানুষের বোধ ও চেতনা, যুক্তি ও উপলব্ধি এবং ঈমানের দৃঢ়তা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে নাযিল হয়েছে। আরবি ভাষায় শপথ একটি প্রচলিত বাগ্মিতামূলক রীতি, যা জোরালো বক্তব্য, যুক্তির পরিপূর্ণতা ও প্রমাণ প্রতিষ্ঠার জন্য ব্যবহৃত হয়। কুরআন তার প্রকৃত অবতরণে সেই ভাষা ও রীতির মধ্য দিয়েই মানুষের বোধকে সম্বোধন করেছে।

কুরআনের এই শপথগুলো সাধারণত ঈমানের মৌল স্তম্ভগুলোর সঙ্গে সম্পর্কিত। কোথাও আল্লাহ তাআলা তাঁর একত্ব ও অদ্বিতীয়তার ওপর শপথ করেছেন, কোথাও কুরআনের সত্যতার ওপর, কোথাও প্রতিদান ও শাস্তি, প্রতিশ্রুতি ও সতর্কবার্তার ওপর, আবার কোথাও মানুষের ফিতরত, তার কর্ম এবং হৃদয় ও মানসিক অবস্থার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। এভাবে এই শপথগুলো মানুষের চেতনায় ঈমানের সুস্পষ্ট ছবি তুলে ধরে, যুক্তিকে পূর্ণতা দেয় এবং প্রমাণকে সুদৃঢ় করে।

আলেমগণ কুরআনে বর্ণিত শপথ সম্পর্কে সাধারণত তিনটি আপত্তির কথা উল্লেখ করেছেন।
প্রথম আপত্তি এই যে, শপথ করা আল্লাহ তাআলার মহিমার পরিপন্থী বলে মনে হয়; কারণ শপথ সাধারণত মানুষ তার কথা মানাতে ব্যবহার করে, অথচ কুরআনেই বলা হয়েছে, শপথে অতিরিক্ত অভ্যস্ত হীনমনা ব্যক্তির অনুসরণ করতে নিষেধ করা হয়েছে।
দ্বিতীয় আপত্তি হলো, যে বিষয়গুলোর ওপর শপথ করা হয়েছে, যেমন তাওহিদ, রিসালাত ও আখিরাত, সেগুলো তো ঈমানের মৌল বিষয়। তাহলে এর বাস্তব প্রয়োজন কী? কারণ অস্বীকারকারী তো প্রমাণ চাইবেই, আর মুমিন তো আগেই ঈমান রাখে।
তৃতীয় আপত্তি এই যে, শপথ সাধারণত কোনো মহান ও পবিত্র সত্তার নামে করা হয়। তাহলে আল্লাহ তাআলা কেন তাঁর সৃষ্ট বস্তুর শপথ করেছেন, যেমন ডুমুর, জলপাই, সময় কিংবা দিন, এগুলো কীভাবে ঐশী মর্যাদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে?

এই আপত্তিগুলোর জবাব হলো, কুরআন আরবি ভাষায় নাযিল হয়েছে, আর আরবি ভাষায় শপথ জোরালো বক্তব্য ও যুক্তি প্রতিষ্ঠার একটি স্বীকৃত ও প্রচলিত পদ্ধতি। কিছু আলেমের মতে, আল্লাহ তাআলা কুরআনে শপথ উল্লেখ করেছেন যাতে প্রমাণ চূড়ান্ত হয়ে যায়। কারণ মানবসমাজে সত্য প্রমাণের দুটি পথ আছে, একটি সাক্ষ্যের মাধ্যমে, আর অন্যটি শপথের মাধ্যমে। কুরআন উভয় পদ্ধতিই গ্রহণ করেছে, যাতে অস্বীকারকারীর জন্য কোনো অজুহাত অবশিষ্ট না থাকে। এক স্থানে বলা হয়েছে, আল্লাহ সাক্ষ্য দিয়েছেন যে তিনি ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, এবং তাঁর সঙ্গে ফেরেশতারা ও জ্ঞানীরা সাক্ষ্য দিয়েছেন। আবার অন্য স্থানে বলা হয়েছে, বলুন, আমার রবের কসম, নিঃসন্দেহে এটি সত্য।

তৃতীয় আপত্তির জবাব এই যে, কুরআনে সৃষ্টির নামে যে শপথগুলো এসেছে, সেগুলো সম্মান প্রদর্শনের জন্য নয়; বরং যুক্তি ও প্রমাণের জন্য। এই শপথগুলো মানুষের চেতনা, অভিজ্ঞতা ও প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণকে সাক্ষ্য হিসেবে হাজির করে। আল্লামা হামিদুদ্দিন ফারাহী রহিমাহুল্লাহ বলেন, এসব শপথের মাধ্যমে সৃষ্টিকে আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা তাঁর ক্ষমতা, প্রজ্ঞা ও পরিচালনার আলোকে সত্যকে প্রমাণ করে। এতে স্পষ্ট হয় যে কুরআনের শপথ মানুষের যুক্তি ও স্বভাবকে সম্বোধন করে ঈমানের পক্ষে সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা করে, কেবল আনুষ্ঠানিক মর্যাদার জন্য নয়।

এই বিষয়ে আল্লামা ফারাহী রহিমাহুল্লাহ তাঁর গভীর গবেষণা উপস্থাপন করেছেন তাঁর গ্রন্থ ‘ইমআন ফি আকসামিল কুরআন’-এ। গবেষণা ও জ্ঞানের দিক থেকে এই রচনা অনন্য। এতে প্রাচীন গবেষকদের গাম্ভীর্য এবং আধুনিক বৈজ্ঞানিক চেতনার সাহস একসঙ্গে প্রতিফলিত হয়েছে। সংক্ষিপ্ত বাক্যে গভীর নীতি ও শক্তিশালী যুক্তি উপস্থাপিত হয়েছে, আর লেখায় রয়েছে সেই মর্যাদা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ভার, যা প্রকৃত গবেষণার পরিচায়ক। 

এই গ্রন্থের ভূমিকায় আল্লামা সৈয়দ সুলাইমান নদভী রাহিমাহুল্লাহ ফারাহী রাহিমাহুল্লাহর জ্ঞানগত মহত্ত্ব ও তাফসিরি অবদানের অকপট স্বীকৃতি দিয়েছেন। মাওলানা আবুল হাসান আলী নাদভী রাহিমাহুল্লাহও একে কুরআন অনুধাবনের ক্ষেত্রে এক অসাধারণ বৈজ্ঞানিক কীর্তি বলে আখ্যায়িত করেছেন। সমকালীন বহু মুফাসসিরও ফারাহীর মতামতকে গভীর শ্রদ্ধা ও গুরুত্বের সঙ্গে গ্রহণ করেছেন।

এই রিসালাটি একজন তালিবে ইলমের সামনে কুরআনের শপথসংক্রান্ত সব আলোচনা নীতিগত, যৌক্তিক ও প্রমাণভিত্তিক প্রেক্ষাপটে সুস্পষ্টভাবে উপস্থাপন করে। এর মাধ্যমে কুরআনের যুক্তিনির্ভর কাঠামো, তার সাক্ষ্যসমূহ, মহাজাগতিক ইশারা এবং বর্ণনার অন্তর্নিহিত প্রজ্ঞা এক নতুন জ্ঞানতাত্ত্বিক দিগন্তে উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। ফলে কুরআনের শপথগুলো কেবল ঈমানকে স্পষ্ট করে তোলে না, বরং মানববুদ্ধি, স্বভাব ও অভিজ্ঞতার আলোকে সত্যের সত্যতা প্রতিষ্ঠার এক গভীর দার্শনিক ও বাস্তব পথও খুলে দেয়।

————–

ক্যাটাগরি : কোরআন, তাফসির, ইসলামি চিন্তাধারা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8270

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *