|২৬| জানুয়ারি|২০২৬|
❖ প্রশ্ন
প্রফেসর মুহাম্মদ আরশাদ সাহেবের এক বন্ধুর পক্ষ থেকে কয়েকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে। কিয়ামুল লাইল ও নামাজে তারাবিহর মধ্যে পার্থক্য কী? তারাবিহ নামাজ ঘরে আদায় করা উত্তম, না কি মসজিদে জামাতে? তারাবিহ নামাজের রাকাআত কি নির্দিষ্ট, নাকি এতে প্রশস্ততা ও অবকাশ রয়েছে? বরকতময় রমজান মাস আসন্ন, এবং প্রতি বছরের মতো এ বছরও তারাবিহর রাকাআত সংখ্যা নিয়ে কিছু মহলে বিতর্ক ও বিরোধের আশঙ্কা রয়েছে। এ ধরনের মতভেদের প্রেক্ষাপটে আমাদের দ্বীনি ও নৈতিক অবস্থান কী হওয়া উচিত?
❖ উত্তর
কিয়ামুল লাইল ইসলামের সেই মহান ইবাদতগুলোর অন্যতম, যার কথা কুরআন মাজিদে বারবার উল্লেখিত হয়েছে এবং যার প্রতি স্বয়ং আল্লাহ তাআলা তাঁর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে উৎসাহিত করেছেন। কুরআনে কখনো এ ইবাদত ‘তাহাজ্জুদ’ নামে, কখনো ‘কিয়ামুল লাইল’ নামে বর্ণিত হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, “রাতের কিছু অংশে তাহাজ্জুদ আদায় করো, এটি তোমার জন্য অতিরিক্ত ইবাদত।” অন্যত্র বলেন, “হে চাদরাবৃত ব্যক্তি, তুমি রাতে দাঁড়াও, অল্প সময় ছাড়া।” আবার মুমিনদের গুণাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে, তারা রাতের সামান্য অংশই ঘুমিয়ে কাটাত।
এই আয়াতগুলো স্পষ্ট করে দেয় যে রাতের নামাজ কোনো নতুন বা মৌসুমি ইবাদত নয়। এটি ইসলামের সূচনালগ্ন থেকেই একটি স্থায়ী, প্রিয় ও গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত, যা কেবল রমজানের সঙ্গে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সারা বছরই এর বৈধতা ও মর্যাদা বিদ্যমান।
তারাবিহ নামাজ মূলত সেই কিয়ামুল লাইলেরই একটি বিশেষ রূপ, যা রমজান মাসে ইশার নামাজের পর আদায় করা হয়। আলেমদের পরিভাষায়, রমজানের রাতের প্রথম ভাগে যে কিয়াম আদায় করা হয়, সেটিকেই তারাবিহ বলা হয়। এ নামকরণের কারণ হলো, সলফে সালেহিন রমজানে দীর্ঘ সময় ধরে কিয়াম করতেন এবং প্রতি চার রাকাআতের পর কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতেন। এই বিশ্রামকে বলা হতো ‘তরবীহা’। এ দিক থেকে তারাবিহ কিয়ামুল লাইলেরই একটি শাখা, আলাদা কোনো নতুন ইবাদত নয়।
শরিয়তের দৃষ্টিতে তারাবিহ নামাজ সুন্নত; এটি ফরজও নয়, ওয়াজিবও নয়। কুরআনে একে ফরজ হিসেবে ঘোষণা করা হয়নি এবং রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একে উম্মতের ওপর বাধ্যতামূলক করেননি। তিনি রমজানে কয়েক রাত সাহাবায়ে কেরামের সঙ্গে মসজিদে কিয়াম আদায় করেছিলেন, এরপর নিয়মিত জামাত ছেড়ে দেন। এর কারণ তিনি নিজেই স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন—তিনি আশঙ্কা করেছিলেন, এ নামাজ যদি নিয়মিত হয়ে যায়, তবে উম্মতের ওপর ফরজ করে দেওয়া হতে পারে।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার সহিহ বর্ণনায় এসেছে, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তিনি সাহাবিদের উপস্থিতির কথা জানতেন, কিন্তু এই আশঙ্কায় বের হননি যে, এ নামাজ ফরজ করে দেওয়া হতে পারে। এ কারণেই আলেমদের মধ্যে এ বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে যে, তারাবিহ সুন্নত। ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন।
হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাদিয়াল্লাহু আনহুর যুগে লোকসংখ্যা বৃদ্ধি পেলে দেখা গেল, মানুষ মসজিদে আলাদা আলাদা জামাতে কিয়াম করছে। তখন শৃঙ্খলা ও ঐক্যের স্বার্থে তিনি সবাইকে এক ইমামের পেছনে সমবেত করলেন এবং বললেন, এটি কতই না উত্তম এক নতুন ব্যবস্থা। এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক উপলব্ধি করা প্রয়োজন।
যদি তারাবিহ সেই বাধ্যতামূলক জামাত হতো, যেমনটি ফরজ নামাজে হয়ে থাকে, তবে হযরত উমর রাদিয়াল্লাহু আনহু নিজেই এর ইমামতি করতেন, যেমনটি তিনি অন্যান্য নামাজে করতেন। কিন্তু তিনি নিজে ইমামতি করেননি; বরং হযরত উবাই ইবন কাব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে ইমাম নিযুক্ত করেছিলেন। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে, তারাবিহ মূলত নফল ইবাদত। মসজিদে জামাত কায়েম করা হয়েছিল কেবল সুবিধা, শৃঙ্খলা ও বিশৃঙ্খলা রোধের জন্য; একে আবশ্যিক বা বাধ্যতামূলক করার জন্য নয়।
এই নীতির সমর্থন পাওয়া যায় রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সেই বাণী থেকেও, যেখানে তিনি বলেছেন, ফরজ নামাজ ছাড়া মানুষের সর্বোত্তম নামাজ হলো সেটি, যা সে নিজ ঘরে আদায় করে। যেহেতু তারাবিহ নফল ইবাদত, তাই এর মূল স্থানও ঘরই হওয়া উচিত। বহু সাহাবি রাদিয়াল্লাহু আনহুম এটি নিজ নিজ ঘরে আদায় করতেন। আবার কেউ কেউ প্রয়োজন, সুবিধা কিংবা সামষ্টিক কল্যাণের বিবেচনায় মসজিদে আদায় করতেন।
অতএব, একথা বলা সঠিক নয় যে তারাবিহ কেবল মসজিদে জামাতের সঙ্গেই আদায় করতে হবে। ঘর ও মসজিদ, উভয় পদ্ধতিই বৈধ ও গ্রহণযোগ্য। প্রত্যেক ব্যক্তি নিজের অবস্থা, একাগ্রতা, আন্তরিকতা ও খুশুর আলোকে যে পথটি তার জন্য অধিক উপযোগী মনে করেন, সেটিই গ্রহণ করতে পারেন।
তারাবিহ নামাজের রাকাআতের সংখ্যা সম্পর্কে কথা বলতে গেলে দেখা যায়, শরিয়ত এ বিষয়ে কোনো কঠোর সীমা নির্ধারণ করে দেয়নি। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুমের যুগ থেকেই এবং পরবর্তী সময়গুলোতেও এ বিষয়ে প্রশস্ততা ও অবকাশ বিদ্যমান ছিল। অধিকাংশ সাহাবি ও উম্মতের ফকিহদের আমল ছিল বিশ রাকাআত। মদিনার আহলে ইলম কোনো কোনো সময়ে এর চেয়েও বেশি রাকাআত আদায় করেছেন। আবার কিছু আলেম কম রাকাআতকেও গ্রহণযোগ্য মনে করেছেন।
হযরত আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার যে হাদিসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এগারো রাকাআত আদায়ের কথা এসেছে, তা মূলত তাহাজ্জুদ ও বিতর সম্পর্কিত, রমজানের জন্য নির্ধারিত এই বিশেষ কিয়ামের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত নয়। এ কারণেই রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি সাধারণ নীতি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, রাতের নামাজ দুই রাকাআত দুই রাকাআত করে। অর্থাৎ রাতের নামাজের ভিত্তি সংখ্যা নয়; বরং তার গুণগত মান, খুশু ও অন্তরের প্রশান্তি।
ইমাম ইবন তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ, ইমাম আহমদ এবং অন্যান্য ইমামগণ সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তারাবিহ নামাজে রাকাআত কম বা বেশি, উভয়টাই বৈধ। কারণ এ ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা শরিয়তের পক্ষ থেকে বাধ্যতামূলক করা হয়নি।
আসল সমস্যা রাকাআত কম বা বেশি হওয়ার মধ্যে নয়; বরং সেই মানসিকতা ও আচরণে, যা কিছু মানুষের মধ্যে গড়ে উঠেছে, যেখানে তারা কেবল সংখ্যা পূরণ করার চিন্তায় নামাজকে অস্বাভাবিক দ্রুততার সঙ্গে আদায় করে। কিরাআত, রুকু, সিজদা ও কওমায় তারা প্রশান্তি ও স্থিরতার প্রতি ভ্রুক্ষেপ করে না; কুরআন তিলাওয়াত যেন দৌড়ের মতো করে শেষ করে ফেলে। এমন নামাজ সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, যে নামাজে طمأنینت (স্থিরতা ও প্রশান্তি) নেই, তা আদৌ নামাজ নয়।
তারাবিহ নামাজের উদ্দেশ্য হলো আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, জিকির করা, কুরআন তিলাওয়াত করা এবং অন্তরের বিনয় ও ঝুঁকে পড়া, শুধু রাকাআত গুনে নেওয়া নয়।
এই সব আলোচনার সারকথা হলো, তারাবিহ একটি সুন্নত ইবাদত, এতে প্রশস্ততা রয়েছে, এবং এর মূল লক্ষ্য খুশু, ইখলাস ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন; ঝগড়া, তর্ক-বিতর্ক বা কঠোরতা নয়। রমজান মাস রহমত, মাগফিরাত এবং অন্তরের মিলনের মাস, বিরোধ ও বিবাদের মাস নয়। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, আল্লাহ তাআলার কাছে সবচেয়ে অপছন্দনীয় ব্যক্তি হলো সেই মানুষ, যে ঝগড়াটে স্বভাবের।
অতএব, এই মাসে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি থেকে বেঁচে থাকা প্রয়োজন, তা হলো দীনী বিষয়ে অযথা বিতর্ক, জেদ এবং অন্যকে তুচ্ছ করা। এ প্রেক্ষাপটে পূর্ণ দৃঢ়তার সঙ্গে বলা যায়, যে ব্যক্তি কোনো কারণে তারাবিহ পড়তে পারেনি, কিন্তু কারও সঙ্গে ঝগড়া করেনি, কারও নিয়ত নিয়ে আক্রমণ করেনি এবং উম্মতের ঐক্যে ফাটল ধরায়নি, সে আল্লাহর কাছে সেই ব্যক্তির চেয়ে উত্তম, যে বিশ রাকাআত পড়েও দ্বীনকে তর্ক ও বিবাদের ময়দানে পরিণত করে।
ইবাদতের কবুলিয়াত সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে অন্তরের অবস্থার ওপর, ইখলাসের ওপর এবং উত্তম চরিত্রের ওপর। আমাদের কর্তব্য হলো, আমরা নিজেরাও এই প্রশস্ততাকে গ্রহণ করব এবং অন্যদের জন্যও দীনকে সহজ ও প্রিয় করে তুলব। এটাই রমজানের আত্মা, এবং এটাই নববী সুন্নতের প্রকৃত দাবি।
————–
ক্যাটাগরি : সালাত, রামাদান, ফিকাহ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8282