AkramNadwi

শিরোনাম : ওয়াসওয়াসার স্বরূপ।
১৭ |নভেম্বর|২০২৫

শিরোনাম : ওয়াসওয়াসার স্বরূপ।<br>১৭ |নভেম্বর|২০২৫

|| প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম শায়খ। আমার প্রশ্ন হলো:
শয়তানের ওসওয়াসা কীভাবে আমাদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে? অতিরিক্ত ভাবনা, দুশ্চিন্তা বা প্যানিক অ্যাটাক, এসব কি সবই শয়তানের ওয়াসওয়াসা? আমরা কীভাবে এর প্রভাব থেকে বাঁচব? এগুলো কি ঈমান বা তাওয়াক্কুলের দুর্বলতার লক্ষণ?
আপনার সাম্প্রতিক প্রবন্ধ, যেখানে আপনি রাসূল সা. এর জীবন ও তাঁর উপর নেমে আসা কঠিন পরীক্ষার আলোচনা করেছেন, তা পড়ে আল্লাহর পরীক্ষার প্রকৃতি নতুনভাবে বুঝতে পেরেছি। কিন্তু সাধারণ মানুষ হিসেবে আমরা কীভাবে জীবনকে সহনীয় করব? আর কীভাবে তাওয়াক্কুল বাড়াতে পারবো ?

|| উত্তর:

ওয়ালাইকুম সালাম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ,
আপনার প্রশ্ন আন্তরিকতার প্রতিফলন, নিজের অন্তরকে কুরআন, সুন্নাহ এবং উলামায়ে কেরামের দিকনির্দেশনার আলোকে বুঝতে চাওয়ার সুন্দর চেষ্টা। আল্লাহ আপনাকে উত্তম প্রতিদান দিন এবং আপনাকে স্বচ্ছতা ও প্রশান্তি দান করুন।

শয়তানের প্রভাবের কথা বললে মনে রাখতে হবে, তার প্রধান অস্ত্র ওয়াসওয়াসা: সূক্ষ্ম ইঙ্গিত, ভীতি, সন্দেহ ও বিভ্রান্তির ফিসফাস, যা মানুষের হৃদয়কে আল্লাহর স্মরণ, দৃঢ়তা ও শান্তি থেকে সরাতে চায়। কুরআন আমাদের জানায়,শয়তান ফিসফাস করে, সরে যায়, আবার ফিরে আসে; ভয়কে বড় করে দেখায়; গুনাহকে সুন্দর করে তোলে; সন্দেহ জাগায়; বিশেষত যখন মানুষ দুর্বল অবস্থায় থাকে, তখন তাকে বিভ্রান্ত করতে চায়।
তবে একটি সত্য সবসময় মনে রাখতে হবে, এই ফিসফাস কাউকে বাধ্য করতে পারে না। আল্লাহকে স্মরণকারী মুমিনের উপর এর কোনো কর্তৃত্ব নেই। ওয়াসওয়াসা কেবল আহ্বান, আদেশ নয়।

ওয়াসওয়াসা থাকা দুর্বলতা নয়। বরং রাসূল সা. সাহাবাদের বলেছিলেন, যে অদ্ভুত ও বিরক্তিকর চিন্তায় তারা কষ্ট পান, সেটিই ঈমানের নিদর্শন। মুমিন ওই চিন্তাকে অপছন্দ করে, বিরক্ত হয়, এটাই প্রমাণ যে তার হৃদয় জীবিত। মৃত হৃদয়ই কিছু অনুভব করে না।

তবে এটি বোঝাও জরুরি যে আধ্যাত্মিক ওয়াসওয়াসা এবং মানসিক-মানবিক দুর্বলতা এক বিষয় নয়।
প্রতি দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, প্যানিক অ্যাটাক বা অতিরিক্ত ভাবনা, এসব সবসময় শয়তান থেকে আসে না।
ইমাম নববী, ইবনুল কাইয়্যিমসহ বহু আলেম ব্যাখ্যা করেছেন, কিছু অনুপ্রবেশকারী চিন্তা আসে শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক ক্লান্তি, অতীতের আঘাত কিংবা মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যপ্রক্রিয়া থেকে।

রাসূল সা. নিজেও দুঃখ, ভয়, শোক, এসব অনুভব করেছেন। খাদিজা রা. এর মৃত্যুতে, নির্যাতনের দিনে, দায়িত্বের ভারে তিনি গভীর বেদনা অনুভব করেছেন। তবু এসব তাঁর মর্যাদা কমায়নি; আপনারটাও কমায় না।

প্যানিক অ্যাটাক আসে উদ্বেগ থেকে,
অতিরিক্ত ভাবনা আসে চাপ থেকে,
ভয় আসে ক্লান্তি বা অবসাদ থেকে।
এসব অবস্থায় সহানুভূতির প্রয়োজন, নিজেকে দোষারোপ নয়। ইসলাম মানুষের স্বভাবগত দুর্বলতাকে লজ্জা দেয় না।
পরীক্ষা, সে-তো জীবনেরই অংশ।
কুরআন জানায়, আল্লাহ অবশ্যই পরীক্ষা নেবেন; এবং হাদিস বলে, আল্লাহ যাদের ভালোবাসেন, তাদের পরীক্ষা কঠিন হয়, তাদের দুর্বলতার জন্য নয় বরং তাদের উন্নতির জন্য।

শয়তান সাধারণত সেই দরজায় আঘাত করে, যেখানে আগে থেকেই ফাটল আছে:
ক্লান্তি, ভয়, একাকীত্ব, গুনাহ, অবহেলা, মানসিক চাপ, এসব জায়গায়।
সে ছোট সমস্যাকে বড় করে তোলে, স্বচ্ছ বিষয়কে অস্পষ্ট করে, সন্দেহের মাধ্যমে মনোযোগ নষ্ট করতে চায়।
কিন্তু যে হৃদয় আল্লাহর দিকে ফিরে যায়, তার উপর শয়তানের কোনো কর্তৃত্ব নেই।
স্মরণ, ইবাদত, সৎ সঙ্গ, এসব যত বাড়ে, ওয়াসওয়াসা তত দুর্বল হয়।

ওয়াসওয়াসা দূর করার জন্য নবী সা. কয়েকটি সহজ ও গভীর উপায় শিখিয়েছেন :

১. নিয়মিত যিকির
আল্লাহকে স্মরণকারী হৃদয় হয়ে যায় সুরক্ষিত ঘর, যেখানে শয়তানের প্রবেশ কঠিন।
সকাল-সন্ধ্যার যিকির, আয়াতুল কুরসি, সুরা বাকারা,সবচেয়ে শক্তিশালী রক্ষণ।

২. ওসওয়াসা এলে ‘আউযু বিল্লাহ’ বলা
এটি তার শক্তি মুহূর্তেই নষ্ট করে।

৩. ভিত্তিহীন চিন্তা উপেক্ষা করা
ইবন তাইমিয়া বলেছেন: ওয়াসওয়াসা তখনই বাড়ে, যখন তাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়; আর উপেক্ষা করলে তা নিভে যায়।

ইসলাম আধ্যাত্মিক উপায়ের পাশাপাশি বাস্তব পদক্ষেপকেও উৎসাহিত করে।
মানসিক কষ্টে বিশেষজ্ঞের সহায়তা নেওয়া ঈমানের দুর্বলতা নয়; বরং রাসূল সা. এর নির্দেশ মানা।
তিনি বলেছেন: আল্লাহ প্রতিটি রোগের জন্য চিকিৎসা সৃষ্টি করেছেন।
থেরাপি, কাউন্সেলিং, চিকিৎসা, নিয়মতান্ত্রিক রুটিন, ঘুম, সামাজিক সহায়তা, শরীরচর্চা, সবই ইসলামের সামগ্রিক চিকিৎসা-পদ্ধতির অংশ।
দেহ, মন ও আত্মা পরস্পরসংযুক্ত, একটি শক্তিশালী হলে অন্যগুলোও শক্তি পায়।

আপনি জানতে চেয়েছেন, সাধারণ মানুষ কীভাবে জীবনকে সহনীয় করবে।
এর একটি পথ হলো এই সত্য মেনে নেওয়া, দুনিয়া পরীক্ষা ও উত্থান-পতনের জায়গা; কখনো আলো, কখনো ভার, এটাই জীবনের নিয়ম।

সৃষ্টির শ্রেষ্ঠতম মানুষও এ নিয়মের বাইরে ছিলেন না।
তবে আল্লাহ আমাদের অন্তরে দিয়েছেন এমন উপকরণ, নামাজ, দুয়া, কুরআন, মনোসংযোগ, ধৈর্য, শোকর, যার সাহায্যে কষ্টকে উন্নতিতে রূপান্তর করা যায়।
কষ্ট সহজ হয় যখন আমরা তার অস্তিত্ব অস্বীকার না করে বরং আল্লাহর কাছে শক্তি চাই।

তাওয়াক্কুল বৃদ্ধি তিনটি উপাদানের সমন্বয়ে ঘটে:

১. আল্লাহকে জানা।
তাঁর দয়া, হিকমত, কোমলতা ও ক্ষমতা সম্পর্কে গভীর জ্ঞান লাভ।
মানুষ কেবল তাকেই ভরসা করে, যাকে সে চেনে।

২. কর্ম ও প্রচেষ্টা।
রাসূল ﷺ বলেছেন: ‘উট বেঁধে তারপর আল্লাহর উপর ভরসা কর।’
অর্থাৎ তাওয়াক্কুল নিষ্ক্রিয়তা নয়; প্রচেষ্টা ও সমর্পণের সমন্বয়।
আপনি যতটা পারেন চেষ্টা করবেন, আর ফল সম্পূর্ণভাবে আল্লাহর হাতে ছেড়ে দেবেন।

৩. অন্তরের সমর্পণ।
আল্লাহর ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকা, তাঁর নেয়ামতগুলো স্মরণ করা, এবং উপলব্ধি করা যে আল্লাহ বান্দার জন্য যা নির্ধারণ করেন সেটিই উত্তম।
ইবনুল কাইয়্যিম সুন্দরভাবে বলেছেন:
সত্যিকারের তাওয়াক্কুল হলো এমন এক শান্ত হৃদয়, যা এই উপলব্ধিতে স্থির থাকে যে আল্লাহর পরিকল্পনা মানুষের নিজের পরিকল্পনার চেয়ে বেশি হিকমতপূর্ণ।

সারসংক্ষেপ:
ওয়াসওয়াসা বাস্তব, তবে মানুষের প্রতিটি মানসিক সংগ্রাম শয়তানের কাজ নয়।
অনাকাঙ্ক্ষিত চিন্তা থাকা ঈমান কমায় না।
ইসলাম চিন্তা, অনুভূতি ও কঠিন পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য আধ্যাত্মিক ও বাস্তব, উভয় পদ্ধতিই দেয়।
এই দুনিয়ায় কষ্ট অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু সঠিক অন্তররীতি নিয়ে তা ঈমান বৃদ্ধির মাধ্যম হয়ে ওঠে।
তাওয়াক্কুল বাড়ে আল্লাহকে গভীরভাবে জানা , আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং এমন হৃদয় থেকে, যে জানে, আল্লাহ কখনো তাঁর বান্দাকে পরিত্যাগ করেন না।

——————–

ক্যাটাগরি : তাজকিয়াহ, উপদেশ, আখলাক, ইসলামি চিন্তাধারা।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7681

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *