|২৮|0২|২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, শাইখ।
গতকাল অক্সফোর্ডে আপনার প্রথম রমজান সম্পর্কে রচিত হৃদয়স্পর্শী নিবন্ধে আপনি রায়বরেলীর রমজানগুলোর স্মৃতির কথা উল্লেখ করেছিলেন। জানতে খুব ইচ্ছে হয়, আপনি কি কখনো এমন সৌভাগ্য লাভ করেছেন যে রমজানের কোনো অংশ রায়বেরেলীতে হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) এর সান্নিধ্যে কাটাতে পেরেছেন? যদি পেয়ে থাকেন, অনুগ্রহ করে সেই অভিজ্ঞতার অনুভূতি আমাদের সামনে তুলে ধরবেন।
জাযাকুমুল্লাহু খাইরান।
সুলায়মান কাজী
❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
প্রিয় সুলায়মান কাজী,
আপনার স্নেহভরা ও চিন্তাজাগানিয়া প্রশ্নের জন্য ধন্যবাদ। আপনার প্রশ্ন কেবল একটি স্মৃতিকে নাড়া দেয়নি; যেন আমার হৃদয়ের এক নীরব কক্ষের দরজায় মৃদু কড়া নেড়েছে। সেই দরজার ওপারে আছে এক মাস, যে মাস এমন এক আলোর স্নানে ধৌত, যাকে বছরের ধুলো মলিন করতে পারেনি, সময়ের ঝড় নিভিয়ে দিতে পারেনি। সেই আলো আজও স্মৃতির দিগন্তে তেমনি উজ্জ্বল, যেমন ভোরের আকাশে জ্বলে থাকা শেষ তারা।
আপনি জানতে চেয়েছেন, রায়বেরেলীতে হযরত মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) এর সান্নিধ্যে রমজানের কোনো অংশ কাটানোর সৌভাগ্য কি আমার হয়েছিল?
হ্যাঁ, সে সৌভাগ্য আমার হয়েছিল। তবে তার বর্ণনা দেওয়া যেন মুঠোয় চাঁদের আলো ধরে রাখার চেষ্টা, কিংবা সুগন্ধ-ভরা বাতাসকে হাতের মুঠোয় বন্দী করার প্রয়াস।
এ ঘটনা শাবান ১৪০২ হিজরি (১৯৮২ খ্রিস্টাব্দ) এর। লাখনৌয়ে ফাজিলতের পরীক্ষা শেষ করে ছুটি কাটাতে গ্রামে ফিরেছিলাম। ইচ্ছে ছিল নিভৃতে, সরলভাবে দিনগুলো কাটাব, দীর্ঘ সফরের পর কোনো পথিক যেমন ছায়া খুঁজে নেয়।
কিন্তু নাদওয়ার সঙ্গীরা, উজ্জ্বল মুখ, কোমল হৃদয়, অতীতের স্মৃতিতে দীপ্ত, রায়বেরেলীর তাকিয়া শাহ আলমুল্লাহর রমজানের কথা এমনভাবে বলতে শুরু করলেন, যেন দীর্ঘ খরার পর কেউ প্রিয় এক বাগানের প্রথম ঝলক বর্ণনা করছে; যেন শুকনো ঠোঁটে কেউ আবে-হায়াতের ফোঁটা ছুঁইয়ে দিয়েছে।
তারা বলতেন, সেখানে রোজা ও ই‘তিকাফ বুকের ভেতর জমাট বেদনা এমনভাবে উপড়ে ফেলে, যেমন দক্ষ মালী কাঁটা তুলে জমিনকে বাগানে পরিণত করে। অন্তরের আয়নাকে এমন মসৃণ করে তোলে যে তা রূপার মতো দীপ্তিময় হয়ে ওঠে। হৃদয়কে এমন মুক্তোয় ভরে দেয়, যেন সমুদ্রের ঢেউ এসে বুকে আছড়ে পড়ছে।
তাদের কথা শুনে মনে হতো, আমি কোনো বর্ণনা নয়, বরং এক আহ্বান শুনছি; এমন এক ডাক, যা কানে নয়, হৃদয়ের গভীর থেকে আসে। চোখের সামনে ভেসে উঠত হযরত নিজামুদ্দীন আওলিয়া (রহ.) এর মাহফিলের দৃশ্য, হযরত মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)এর নির্জন সাধনার ঐশ্বর্য, আর সেই প্রাচীন খানকাহগুলো, যেখানে জিকির ছিল মাটির তলদেশে বয়ে চলা নদীর মতো, নীরবে তৃষ্ণার্তদের সিক্ত করে দিত।
তারপর নিজের যুগের দিকে তাকিয়ে দেখতাম, ধোঁয়া, কোলাহল, আত্মপ্রশংসা, আর এমন জ্ঞান, যা আত্মা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে শুকনো কাঠের মতো নিস্তেজ। কোথায় গেল সেই মরুপ্রান্তর, যেখানে আকুলতার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হতো? কোথায় সেই প্রেমপাগল পথিকেরা, যাদের পদচারণায় পথ আলোকিত হতো? মনে হতো, মহব্বতের কাফেলা থেমে গেছে, ইবাদতের তাঁবু গুটিয়ে নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু সঙ্গীদের কথায় এমন সত্য ও এমন আবেগ ছিল যে, আর অস্বীকার করা গেল না। প্রতিটি বাক্য আকাঙ্ক্ষার আগুন আরও জ্বালিয়ে দিত, যেমন কবির বেদনা প্রতিটি কবিতায় গভীরতর হয় এবং হৃদয়ের জমিনকে আরও কোমল করে তোলে।
অতএব আঠারো রমজানের ফজরের পর গ্রাম থেকে রওনা হলাম। আমি কেবল একটি স্থান নয়, একটি মানসিক অবস্থাকেও পেছনে ফেলে যাচ্ছিলাম, আধুনিকতার সেই শুষ্কতা, যেখানে আত্মার স্নিগ্ধতা কমে গেছে; সেই মানসিক অহংকার, যা জ্ঞানের ভারে ভারাক্রান্ত হলেও বিনয়ের আলোহীন।
দুপুরের মধ্যেই রায়বেরেলী পৌঁছালাম। সূর্য মাথার ওপরে যেন কোনো কঠোর শাসকের মতো দাঁড়িয়ে, তার তাপ মাটির ওপর এমনভাবে ঝরছে যে বাতাসও কাঁপছে। রোজার অবস্থায় অনুভূতিগুলো তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে, তৃষ্ণা গলায় আগুনের রেখার মতো জ্বলে, ক্লান্তি অঙ্গপ্রত্যঙ্গে সীসার শিকলের মতো জড়িয়ে ধরে।
শহর থেকে তাকিয়া পর্যন্ত পথ ছিল খোলা প্রান্তর, না ছায়া, না আশ্রয়। গরম বাতাস যেন জ্বলন্ত চুল্লির নিশ্বাস, যেন প্রকৃতিও পরীক্ষার অংশীদার।
শক্তি অবশেষে সাড়া দিল না। পথের একটি মসজিদে ঢুকে যোহর আদায় করলাম। ঠান্ডা মাটিতে শুয়ে পড়লাম, মনে হলো, যেন পৃথিবী নিজেই মায়ের মতো বুকে টেনে নিচ্ছে; যেন মাটির শীতলতা কপালে স্নেহভরা হাত রেখে দিয়েছে।
সূর্যের তেজ কিছুটা নরম হলে একটি রিকশা নিলাম। আসরের আগে সাই নদীর তীরে অবস্থিত সেই সরল মসজিদে পৌঁছালাম, যা ছিল পথিকদের নোঙর ফেলার স্থান, ক্লান্ত হৃদয়ের জন্য নিরাপদ বন্দর; যেখানে অবসন্ন প্রাণ এসে থামে, আর আত্মা পায় আশ্রয়।
এর প্রাঙ্গণে পা রাখতেই এক অদ্ভুত আপন অনুভূতি আমাকে ঘিরে ধরল। এ ছিল প্রথম আগমন, তবু মনে হলো যেন বহুবার স্বপ্নে দেখা কোনো পুরোনো ঘরের দোরগোড়ায় ফিরে এসেছি। হয়তো এ কারণে যে, এই ভূমির কাহিনিগুলো শৈশব থেকেই আমার অন্তরের অংশ ছিল। জৌনপুর ও আজমগড়ের আলেমদের কথা, বিশেষত সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.) এর সঙ্গে সম্পৃক্ত বুযুর্গদের আলোচনা, আমি ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি। তাঁদের সংস্কার আন্দোলন, সুন্নাহর পুনর্জাগরণ, বিদ‘আত দূরীকরণের সংগ্রাম, এসব যেন এই মাটির রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে ছিল। এই মাটি তাঁদের পদচিহ্ন আপন বুকে ধারণ করেছে; এর বাতাস আজও তাঁদের দোয়ার প্রতিধ্বনি বয়ে বেড়ায়। হৃদয় যদি অপরিচিত বোধ না করে থাকে, তবে সে এজন্য যে আত্মা নিজের সূত্র চিনে নিয়েছিল, যেমন নদী সাগরকে চিনে নেয়।
মসজিদ ও তার সরল কক্ষগুলো দেখলাম। না কোনো অলংকরণের বাহার, না মার্বেলের জৌলুস, না সোনালি গম্বুজের দীপ্তি। সে দাঁড়িয়ে আছে সরলতায়, যেন সাদাসিধে পোশাকে আবৃত কোনো নেককার বুযুর্গ, যার অন্তরে কোহিনূরের মতো মহিমা লুকানো। আজকের যুগে, যখন অনেক মসজিদ জাঁকজমকের প্রতিযোগিতায় মেতে ওঠে, এ মসজিদ যেন নিজেকে প্রদর্শন থেকে আড়াল করে রেখেছে, যেন কোনো গুপ্তধন মাটির নিচে রক্ষিত, যার সন্ধান কেবল হৃদয়বানদের জন্য। শাহ আলমুল্লাহ (রহ.) একে নির্মাণ করেছিলেন ইবরাহিমীয় চেতনা নিয়ে, যিকির ও ইবাদতের জন্য, প্রতিযোগিতার জন্য নয়; একান্ত নিষ্ঠা ও আল্লাহমুখিতার জন্য, আত্মপ্রদর্শনের জন্য নয়।
কিন্তু এই সরলতার নিচে ছিল শতাব্দীর স্তর। সে দেখেছে সাম্রাজ্যগুলোকে ঢেউয়ের মতো উত্থিত হতে এবং বালুরাশিতে বিলীন হয়ে যেতে। দেখেছে প্রজন্মগুলোকে উদয়-অস্ত হতে, যেমন সূর্য প্রতিদিন আকাশপথ অতিক্রম করে। তার দেয়ালগুলো কুরআনের মৃদু তিলাওয়াত, তাহাজ্জুদকারীদের অশ্রু, আর সাহরির নিঃশ্বাস আপন বুকে সঞ্চয় করে রেখেছে। তার আধ্যাত্মিক সুবাস কোনো এক দিনের নয়; যুগের পর যুগের সঞ্চিত ঘ্রাণ, যা সময়ের সঙ্গে আরও গভীর হয়েছে। শাহ আলমুল্লাহ (রহ.), সৈয়দ আহমদ বেরেলভী (রহ.), আর পরে সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) তাঁদের উপস্থিতি এ পরিবেশে এমনভাবে ছাপ রেখে গেছে, যেমন সুগন্ধ কাপড়ে মিশে যায়।
মাওলানা আলী মিয়াঁ (রহ.) এর তত্ত্বাবধানে এই সাধারণ আস্তানা যেন প্রাচীরহীন নগরীতে রূপ নিয়েছিল। চারদিক থেকে মানুষ আসত, উলামা, ছাত্র, সাধারণ জনতা, আধুনিক শিক্ষিত, শুভ্রদাড়ি প্রবীণ, দীপ্তিময় তরুণ। স্বভাব আলাদা, প্রবণতা ভিন্ন, কিন্তু আন্তরিকতা তাদের নক্ষত্রের মতো এক আকাশগঙ্গায় গেঁথে দিত। অধিবাসীরা ছিলেন প্রশস্তহৃদয়, কোমলস্বভাব, যেন বর্ষার জল শুষ্ক ভূমিকে সিক্ত করে। সম্পদ তাদের গর্বিত করত না, পদমর্যাদা তাদের উদ্ধত বানাত না। ধন তাদের হাত দিয়ে এমনভাবে প্রবাহিত হতো, যেন হাতের তালুতে স্থির হয়ে আবার বয়ে যাওয়া পানি নিষ্কলুষ, অনাসক্ত।
কয়েক দিন সেখানে কাটিয়ে মনে হলো, জীবনের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হয়েছে; যেন চোখের পর্দা সরে গেছে। যদি লখনউয়ের নাদওয়া ছিল চিন্তা ও দৃষ্টির দরবার, গবেষণা ও লেখনীর উজ্জ্বলতায় পূর্ণ, তবে এই তাকিয়া ছিল কর্ম ও চরিত্রের পাঠশালা; অন্তরের পরিশুদ্ধির মাদরাসা, যেখানে জ্ঞান হৃদয়ে নেমে চরিত্রে রূপ নেয়। নিষিদ্ধ সময় ছাড়া মসজিদ ইবাদতের সুরে মুখর থাকত, কোথাও নামাজ, কোথাও তিলাওয়াত, কোথাও যিকিরের আসর, যেন মৌমাছির অবিরাম গুঞ্জন। যারা নীরবে বসে থাকত, তাদেরও মনে হতো, বুকের অন্তরালে কোনো প্রদীপ জ্বলছে। সেই ক্ষুদ্র ভূমিখণ্ড যেন জান্নাতের এক কোণা, যেন আকাশের এক টুকরো নেমে এসেছে ধরায়।
সকাল প্রায় দশটায় মাওলানা শাহবাজ (রহ.) কুরআনের দার্স শুরু করতেন। তিনি অর্থ এমনভাবে উন্মোচন করতেন, যেন কোনো জহুরী মখমল সরিয়ে রত্ন দেখাচ্ছেন; প্রতিটি আয়াত থেকে যেন আলোর রশ্মি বিচ্ছুরিত হতো। এরপর মাওলানা আবদুল্লাহ হাসনি (রহ.) হাদিস পাঠ করাতেন, ফিকহ ও ভালোবাসাকে একসূত্রে গেঁথে; সুন্নাহর পুনর্জাগরণ ও বিদ‘আত পরিহারের তাগিদ দিতেন। তাঁর বক্তব্যে তাসাওউফের মাধুর্য মিশে থাকত, যেন চকমকি পাথর থেকে স্ফুলিঙ্গ বেরিয়ে হৃদয়ে উষ্ণতা জাগিয়ে তোলে, শীতল অন্তরকে উষ্ণ করে দেয়।
যোহর ও আসরের পর আধ্যাত্মিক শিক্ষার গ্রন্থ পাঠ হতো, বিশেষত মাওলানা আলী মিয়াঁ (রহ.) এর রচনাবলি। যোহরের পর সমবেত যিকির ও দোয়া অনুষ্ঠিত হতো, পরম শিষ্টতায়, খতমে খাজেগানের সঙ্গে। প্রতিটি আমল পরিমিত, প্রতিটি মুহূর্ত যেন তসবিহর দানার মতো সুতোয় গাঁথা, দিনটি যেন যিকিরের মালায় পরিণত হতো।
ইশা ও তারাবির পর মাওলানা আলী মিয়াঁ (রহ.) এর সংক্ষিপ্ত বৈঠক বসত, দিনের মুকুট যেন সেটিই। তাঁর উপস্থিতি ছিল শান্ত হ্রদের মতো, গভীর, প্রশান্ত, আকাশের প্রতিবিম্ব ধারণ করে। কথাগুলো নির্ভার ভঙ্গিতে বেরিয়ে আসত, অথচ প্রতিটি শব্দ চিন্তার ভাটিতে পুড়ে আসত। কখনো একটি বাক্য হৃদয়ে এমনভাবে রোপিত হতো, যেন উর্বর মাটিতে বীজ—যা বহু বছর পর মহীরুহ হয়ে ছায়া দিত।
পরবর্তী বছরগুলোতে মুহাম্মাদ রাবী হাসানি নদভী এর নেতৃত্বে ই‘তিকাফের সৌভাগ্যও লাভ করেছি। মুখগুলো বদলে গিয়েছিল, কিন্তু সুবাস ছিল একই; ইবাদতের সুর, অন্তরের শিক্ষা, সরলতার মর্যাদা, সবই অটুট ছিল। যেন সুর নতুন কণ্ঠে গাওয়া হচ্ছে, অথচ গানটি সেই একই।
সেখানে স্থায়ী বাসিন্দাদের বিনয় ছিল সত্যিই উল্লেখযোগ্য। অতিথিদের জন্য জায়গা ছেড়ে দিতেন, নিজেরা নীরবে পেছনে সরে যেতেন। পরিচ্ছন্নতা, ভদ্রতা, সংযম এসবই ছিল তাদের পরিচয়চিহ্ন। ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির মানুষ আসতেন, কিন্তু ভেতরে প্রবেশ করতেই সব পার্থক্য মিলিয়ে যেত, যেন দুধ ও চিনি মিশে এক মধুর সুধায় রূপ নেয়।
ইফতারের ব্যবস্থা হতো মাওলানার পক্ষ থেকে। জুমার দিনে থাকত বিশেষ আয়োজন, সুগন্ধি বিরিয়ানি, আর জর্দা যার রং যেন জাফরানি রৌদ্রের মতো দীপ্ত। এর পাশাপাশি বিভিন্ন পরিবার থেকেও খাবার আসত। আমি নিজ চোখে দেখেছি আবুল হাসান আলি নদভী (রহ.), আবু বকর হাসানি (রহ.), আব্দুল্লাহ হাসানি (রহ.), হামযা হাসানি (রহ.) এবং অন্যান্য প্রবীণজন নিজেদের হাতে প্লেট তুলে এনে পরিবেশন করছেন। এটি ছিল বিনয়ের এক জীবন্ত দৃশ্য, ঘোষণা ছাড়া উদারতা, বক্তৃতা ছাড়া শিক্ষা। তরুণ প্রজন্ম সেবার পাঠ শিখেছিল উপদেশ থেকে নয়, কর্ম থেকে, যেমন এক প্রদীপ থেকে আরেক প্রদীপ জ্বলে ওঠে।
তারাবিহ আদায় হতো খোলা প্রাঙ্গণে। আকাশের ছাদের নিচে দাঁড়িয়ে মনে হতো—আমাদের কাতার যেন ঊর্ধ্বলোকে আরও নিকটবর্তী হয়েছে। কুরআনের তিলাওয়াত ধূপের সুগন্ধের মতো ঊর্ধ্বমুখী হতো, শীতল বাতাস কপাল ছুঁয়ে যেত, ঠান্ডা পানি গলার আগুন নেভাত। দেহের আরাম ও আত্মার উত্থান, দুই নদীর মিলনের মতো এক অপূর্ব সংযোগ। আমরা ছাত্ররা প্রায়ই খোলা আকাশের নিচে ঘুমাতাম, চাঁদ নীরব সঙ্গী, তারা যেন মখমলের ওপর ছড়ানো মুক্তো। গ্রীষ্মের পোকামাকড়ও ছিল, কিন্তু কাঁটা তো সবসময় গোলাপের সঙ্গেই থাকে।
সাহরির ব্যবস্থাও সেই খাদেমদের হাতেই ছিল, তবে তার পরিবেশ ছিল ভিন্ন, ইফতারের উচ্ছ্বাসের বিপরীতে নিদ্রার সঙ্গে এক নীরব সংগ্রাম। বহুবার ডেকে তোলা হতো। ক্ষুধা তেমন থাকত না, তবু সুন্নতের নিয়ত ও পরদিনের প্রস্তুতির তাগিদে কিছু না কিছু খেয়ে নিতাম, যেন সৈনিক পরবর্তী যুদ্ধের আগে নিজেকে প্রস্তুত করে।
বিদায়ের সময় ফজরের পর মাওলানার সঙ্গে মুসাফাহা করা হতো। আগমনের করমর্দনে থাকে উজ্জ্বল প্রত্যাশা; বিদায়ের করমর্দনে থাকে আর্দ্রতা ও মর্যাদা। চোখ সিক্ত, হৃদয় পূর্ণ। মানুষ যেন কোনো ঝরনা থেকে পানি ভরে ফিরছে, এমন এক পানি, যা পথের প্রতিটি তৃষ্ণা নিবারণ করে।
সেখানে কাটানো একটি দিনও গভীর প্রভাব রেখে যেত, যেমন লোহা ভাটিতে উত্তাপ নিয়ে দীর্ঘক্ষণ উষ্ণ থাকে। হৃদয় কোমল হয়ে উঠত, ভাষা হতো স্নিগ্ধ, সংকল্প হতো সুষম। এক ক্ষণস্থায়ী মানুষ মুহূর্তের জন্য যেন চিরন্তন বৃক্ষের শাখায় সংযুক্ত হতো, যেন সময়ের বালুকায় অনন্তের ছায়া পড়ে।
প্রিয় সুলায়মান, ভাষার পরিসর এত বিস্তৃত নয় যে সে দিনগুলোর পূর্ণ আলো ধারণ করতে পারে। এগুলো কেবল পৃষ্ঠতলের প্রতিবিম্ব; গভীরতা এখনও অব্যক্ত। তবে আমি সাক্ষ্য দিতে পারি, রায়বেরেলীর সেই রমজানগুলো কেবল কিছু দিন ছিল না; ছিল জীবন্ত পবিত্রতার সঙ্গে সাক্ষাৎ। সেখানে জ্ঞান বিনয়ের সামনে নত হতো, ইবাদত সেবায় রূপ নিত, আর আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.)এর উপস্থিতি এক সরল মসজিদকে সত্যিই এক অনন্ত ঝরনায় পরিণত করেছিল।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এমন ঝরনাগুলোর স্মৃতি জীবিত রাখার এবং সেখানকার কয়েক ফোঁটা পানি আমাদের যুগের মরুভূমিতেও পৌঁছে দেওয়ার তাওফিক দান করুন। আমীন।
————–
ক্যাটাগরি : রামাদান, তাজকিয়াহ, ইসলামি আলোচনা, সৃতিচারণ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8557