- ১৬ জানুয়ারি ২০২৬
|| প্রশ্ন
একজন দাঈয়া ও শিক্ষিকা জানতে চেয়েছেন :
আসসালামু আলাইকুম।
কুরআন মাজিদে মানুষের জন্য ‘বাশার’ শব্দটিও ব্যবহৃত হয়েছে। ‘ইনসান’ ও ‘বাশার’ এই দুই শব্দের অর্থগত পার্থক্য কী? এরা কি ভিন্ন ভিন্ন বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করে, নাকি পরস্পরের প্রতিশব্দমাত্র? অনুগ্রহ করে কুরআনের আলোকে এ শব্দদ্বয়ের তাৎপর্য ও সূক্ষ্ম পার্থক্য বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করবেন।
|| উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
কুরআন কারিম আরবি ভাষার সেই সর্বোচ্চ স্তরে অবতীর্ণ হয়েছে, যেখানে প্রতিটি শব্দের ভেতর অর্থ, প্রজ্ঞা ও অলংকারশৈলীর বহু স্তর নিহিত থাকে। এই হেদায়াতের গ্রন্থে এমন বহু শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, যেগুলো বাহ্যত পরস্পরের প্রতিশব্দ বলে মনে হয়, অথচ ভাষাবিদ, তাফসিরকার ও অলংকারশাস্ত্রবিদদের কাছে তাদের মধ্যে সূক্ষ্ম কিন্তু অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। আরবি ভাষায় কোনো বিশেষ্য কেবল একটি সত্তার নামমাত্র নয়; বরং তা প্রায়ই সেই সত্তার কোনো বিশিষ্ট গুণ, অবস্থা কিংবা দিককে প্রতিনিধিত্ব করে। এই নীতির আলোকে কুরআন মাজিদে মানুষের জন্য বিভিন্ন পরিভাষা ব্যবহৃত হয়েছে, যেমন ইনসান, বাশার, ইবনু আদম ইত্যাদি। যদিও কিছু ক্ষেত্রে এই শব্দগুলো একে অন্যের স্থলে ব্যবহারযোগ্য, তবু প্রতিটি শব্দের সঙ্গে যুক্ত থাকে একটি স্বতন্ত্র অর্থরঙ ও ভাবগত ইঙ্গিত।
এ কথাটিও লক্ষণীয় যে, কুরআন মাজিদ একই ঘটনা বা কাহিনি বিভিন্ন স্থানে বর্ণনা করার সময় শব্দচয়নেও ভিন্নতা অবলম্বন করে। এই পরিবর্তনের উদ্দেশ্য সবসময় অর্থগত পার্থক্য সৃষ্টি করা নয়; অনেক সময় এটি বাগ্মিতা, ভাষাশৈলীর সৌন্দর্য, প্রসঙ্গের দাবি কিংবা শ্রোতা ও পাঠকের রুচি ও বোধকে সামনে রেখেই করা হয়। কুরআন এমন এক গ্রন্থ, যার পাঠ ও শ্রবণ উভয়ই হৃদয়ে আনন্দ ও প্রভাব সৃষ্টি করে। তাই অনেক ক্ষেত্রে একটি শব্দ অন্যটির তুলনায় অধিক উপযুক্ত, অধিক প্রাঞ্জল ও অধিক প্রভাবশালী হয়ে ওঠে। তবে এটাও সত্য যে, বহু স্থানে শব্দচয়নের পেছনে গভীর অর্থবহ প্রজ্ঞা সক্রিয় থাকে, আর ইনসান ও বাশার-এর পার্থক্য সেই প্রজ্ঞারই একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
ভাষাবিদদের গবেষণা অনুযায়ী, ‘বাশার’ ও ‘ইনসান’ উভয় শব্দই বনি আদমের গুণাবলির দিকে ইঙ্গিত করে, তবে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে। আরবি ভাষায় ‘বাশার’ শব্দটি মানুষের বাহ্যিক, দৈহিক ও বস্তুগত অবয়বকে নির্দেশ করে। এর মূল ধাতু ‘بشر’ (বাশারুন), যার অর্থ ত্বক বা বাহ্যিক স্তর। সুতরাং ‘বাশার’ শব্দটি মানুষের সেই শারীরিক কাঠামোর প্রতি ইঙ্গিত করে, যা সমস্ত বনি আদমের মধ্যে অভিন্ন। ত্বক এমন একটি বৈশিষ্ট্য, যা কোনো অবস্থাতেই মানুষ থেকে বিচ্ছিন্ন হয় না। মানুষ তার কিছু অঙ্গ হারাতে পারে, কিন্তু সে তার বাশারত্ব হারাতে পারে না, এবং তার কোনো বিকল্পও নেই। এ কারণেই হযরত আদম আলাইহিস সালামকে ‘আবুল বাশার’ বলা হয়, কেননা তিনিই মানবজাতির এই অভিন্ন দৈহিক বাস্তবতার প্রথম প্রকাশ। এই অর্থে ‘বাশার’ মানুষের জৈবিক, শারীরবৃত্তীয় ও বস্তুগত অস্তিত্বের নাম, অর্থাৎ মানুষ একটি জীবন্ত শারীরিক সত্তা হিসেবে।
এর বিপরীতে ‘ইনসান’ শব্দটি মানুষের আরও উচ্চতর, গভীর ও ব্যাপক বাস্তবতাকে প্রকাশ করে। ভাষাবিদদের মতে, এ শব্দটি ‘انس’ (উনস)থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ঘনিষ্ঠতা, সখ্য ও সম্পর্ক স্থাপন। ইনসান সেই সত্তা, যার আছে বুদ্ধি, চেতনা ও বাকশক্তিসম্পন্ন আত্মা; যার মাধ্যমে সে তার পরিবেশকে বোঝে, তার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে এবং নিজের মতো অন্যদের সঙ্গে সামাজিক বন্ধন, সম্পর্ক ও সম্বন্ধ গড়ে তোলে। এই উনসের গুণই মানুষকে নিছক একটি দৈহিক সত্তা থেকে উন্নীত করে সামাজিক, নৈতিক ও দায়িত্বশীল অস্তিত্বে। তবে এই গুণ সব বনি আদমের মধ্যে কার্যকরভাবে সমানভাবে বিদ্যমান থাকে না। কেউ অন্যদের জন্য সান্ত্বনা ও স্বস্তির উৎস হয়, আবার কেউ কষ্ট, বিশৃঙ্খলা ও শত্রুতার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ কারণেই হযরত আদম আলাইহিস সালামকে ‘আবুল ইনসান’ বলা হয়নি, কারণ উনসের গুণ প্রতিটি ব্যক্তির মধ্যে সমানভাবে বাস্তবায়িত নয়।
এই আলোচনার মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, ‘বাশার’ মানুষের বস্তুগত ও শারীরিক অস্তিত্বের নাম, আর ‘ইনসান’ তার চেতনাগত, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক সত্তার প্রতিনিধিত্ব করে। অন্য কথায়, বাশার হলো মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, আর ইনসান তার অন্তর্গত ও অর্থবহ পরিচয়। সুতরাং এ কথা বলা যথার্থ যে, প্রত্যেক ইনসানই বাশার, কিন্তু প্রত্যেক বাশার তখনই ইনসান হয়ে ওঠে, যখন সে উপলব্ধি, চেতনা ও দায়িত্ববোধের গুণে ভূষিত হয়।
স্মরণ রাখা প্রয়োজন যে, একটি ভালো বই সে নয়, যার সঙ্গে পাঠক নিঃশর্তভাবে একমত হয়ে যায়; বরং প্রকৃত ভালো বই হলো সেটিই, যা পাঠককে চিন্তায় নিমগ্ন করে, তার মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে এবং তাকে আরও গভীর অনুসন্ধান ও ভাবনার পথে আহ্বান জানায়। এ ধরনের গম্ভীর, সুশৃঙ্খল ও সমালোচনামূলক অধ্যয়ন একজন শিক্ষার্থীর মধ্যে শুধু জ্ঞানগত বিস্তৃতি সৃষ্টি করে না; বরং তার ভেতরে সংযম, সততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রজ্ঞাও গড়ে তোলে। দোয়া করি, আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সঠিক নিয়ত, গভীর উপলব্ধি এবং জ্ঞানের সঙ্গে আমল করার তাওফিক দান করুন; আর জ্ঞানকে আমানত মনে করে তা দায়িত্বশীলতার সাথে সামনে এগিয়ে নেওয়ার মানুষ তৈরি করে দেন।
————-
ক্যাটাগরি : কোরআন, লোগাহ, তাফসির, ইসলামি চিন্তাধারা,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8210