|০২ |ফেব্রুয়ারি |২০২৬|
❖ প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
আমার স্ত্রীর পিতা (আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন) দু’দিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। আমার শাশুড়ি বর্তমানে সেই ফ্ল্যাটে একা থাকছেন, যেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে বসবাস করতেন। তবে তাঁর এক ছেলে ঠিক সামনের ফ্ল্যাটে থাকেন; দূরত্ব আনুমানিক দশ মিটার। দুই ফ্ল্যাটই একই ভবনে, এক ফ্ল্যাট থেকে অন্য ফ্ল্যাটে যেতে ভবনের বাইরে যেতে হয় না।
প্রশ্ন হলো, ইদ্দতের সময়ে আমার শাশুড়ির জন্য কি দিনে বা রাতে ছেলের ফ্ল্যাটে যাওয়া বৈধ? আর স্বাস্থ্য রক্ষার উদ্দেশ্যে হাঁটার জন্য কি তিনি যে আবাসিক কমপ্লেক্সে থাকেন, তার যৌথ বাগানে বের হতে পারবেন? উল্লেখ্য, তাঁর নিজস্ব কোনো ব্যক্তিগত বাগান নেই।
আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন এবং আপনার পদচারণা সঠিক পথে পরিচালিত করুন।
❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
আমরা আল্লাহ তাআলার কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আপনার শ্বশুরকে তাঁর অবারিত রহমতের চাদরে ঢেকে নেন, তাঁর এই বিপদকে মর্যাদা ও উচ্চ মর্যাদার কারণ বানান এবং তাঁর পরিবার-পরিজনকে ধৈর্য ও সওয়াবের তাওফিক দান করেন।
যে নারীর স্বামী ইন্তেকাল করেছেন, তাঁর ইদ্দত কুরআন, সুন্নাহ ও উম্মাহর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত দ্বারা প্রমাণিত। এর মেয়াদ চার মাস দশ দিন। আল্লাহ তাআলা বলেন :
“তোমাদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করে এবং স্ত্রী রেখে যায়, তাদের স্ত্রীরা নিজেদের বিষয়ে চার মাস দশ দিন অপেক্ষা করবে।”
এই ইদ্দত আল্লাহ তাআলা নির্ধারণ করেছেন স্বামীর অধিকারের মর্যাদা রক্ষার্থে, নারীর সম্মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য এবং সন্দেহ ও কুপ্রবৃত্তির পথ রুদ্ধ করার উদ্দেশ্যে। এ বিধানের অন্তর্ভুক্ত একটি গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম হলো, ইদ্দত পালনকারী নারী সেই ঘরেই অবস্থান করবেন, যেখানে স্বামীর ইন্তেকালের সময় তিনি বসবাস করছিলেন। তিনি সে ঘর ত্যাগ করবেন না, তাকে সাময়িক ঠিকানা হিসেবে নয়; বরং পুরো ইদ্দতকালজুড়ে বসবাস ও অবস্থানের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করবেন, যতক্ষণ না কোনো গ্রহণযোগ্য ও অনিবার্য প্রয়োজন দেখা দেয়।
এই মূলনীতির আলোকে, আপনার শাশুড়ি যেহেতু সেই ফ্ল্যাটেই থাকছেন, যেখানে তিনি তাঁর স্বামীর সঙ্গে থাকতেন, তাই তাঁর জন্য সেখানেই অবস্থান করা আবশ্যক। কাছের অন্য কোনো ফ্ল্যাটে, এমনকি একই ভবনের ভেতরে হলেও. স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত হওয়া সঠিক নয়। তবে শরিয়ত মানুষের বাস্তব অবস্থাকে বিবেচনায় রেখেছে এবং অযথা কষ্ট চাপায়নি। প্রয়োজন দেখা দিলে ইদ্দত পালনকারী নারীর জন্য ঘর থেকে বের হওয়ার অনুমতি দিয়েছে, যদি ঘরে থাকা কষ্টকর হয়ে ওঠে, কোনো ক্ষতির আশঙ্কা থাকে, একাকিত্ব বা ভয়ের কারণে মানসিক চাপ তৈরি হয়, অথবা এমন কারও সহায়তা প্রয়োজন হয়, যিনি তাঁর দেখভাল করবেন।
এ প্রেক্ষিতে, আপনার শাশুড়ির জন্য ছেলের সামনের ফ্ল্যাটে যাওয়া বৈধ (দিনে হোক বা রাতে) যখন প্রয়োজন দেখা দেবে। যেমন: খাবার, ওষুধ, সেবা কিংবা এমন সান্নিধ্য, যা তাঁর একাকিত্ব দূর করে। তবে শর্ত হলো, এই যাওয়া হবে প্রয়োজনের সীমায়; কাজ শেষ হলে তিনি নিজ বাসস্থানে ফিরে আসবেন। ছেলের ফ্ল্যাটে অবস্থানকে যেন তিনি নিয়মিত বা স্থায়ী অভ্যাসে পরিণত না করেন। কারণ ইদ্দতের উদ্দেশ্য হলো নির্দিষ্ট বাসস্থানে অবস্থান, এক বাসা থেকে আরেক বাসায় অবাধ চলাচল নয়।
একইভাবে, যদি তাঁর নিজস্ব কোনো বাগান না থাকে, তবে যে আবাসিক কমপ্লেক্সে তিনি থাকেন, তার যৌথ বাগানে দিনে বের হওয়াও বৈধ, যদি উদ্দেশ্য হয় স্বাস্থ্য রক্ষা, হালকা হাঁটা বা মানসিক প্রশান্তি অর্জন। এক্ষেত্রে শালীনতা ও পর্দা রক্ষা করতে হবে, কোনো অনুচিত মেলামেশা বা ফিতনার আশঙ্কা থাকা চলবে না, এবং প্রয়োজন শেষে আবার নিজ বাসস্থানে ফিরে আসতে হবে।
রাতে বের হওয়ার ব্যাপারে মূলনীতি হলো নিষেধাজ্ঞা। কেবল তখনই অনুমতি রয়েছে, যখন সুস্পষ্ট কোনো প্রয়োজন বা জরুরি অবস্থা দেখা দেয়। কারণ ইদ্দতকালীন শিথিলতা মূলত দিনের বেলাতেই সীমাবদ্ধ।
সারকথা, এই বিষয়ে শরিয়ত একদিকে যেমন অধিকার ও শিষ্টাচার সংরক্ষণ করেছে, অন্যদিকে তেমনি বাস্তব প্রয়োজন ও কষ্ট লাঘবের পথও খুলে দিয়েছে। ইদ্দত পালনকারী নারীর ওপর বাসস্থানে অবস্থান ফরজ করেছে, আবার প্রয়োজনের সময় সীমিত পরিসরে বাইরে যাওয়ার অনুমতিও দিয়েছে, অতি শৈথিল্য ছাড়াই, যেন অনুমতিকে অভ্যাসে আর রুখসতকে মূলনীতিতে পরিণত করা না হয়।
————-
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, উসরাহ
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8335