AkramNadwi

শিরোনাম : আসাতিজাহ |২৩|০৩|২০২৬| بسم الله الرحمن ا

শিরোনাম : আসাতিজাহ
|২৩|০৩|২০২৬|

بسم الله الرحمن الرحيم

আমাদের শিক্ষকরা ছিলেন অত্যন্ত উচ্চমানের জ্ঞানী ও দ্বীনদার ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তাঁদের জীবনকথা এবং আমাদের ওপর তাঁদের গভীর প্রভাব সম্পর্কে আমি আমার গ্রন্থসমূহ “মান ‘আল্লামানী”, “তারিখে নাদওয়াতুল উলামা” এবং “আল-জামি‘ আল-মুঈন ফি তাবাকাতিশ শুয়ূখ আল-মুতাক্কিনীন ওয়াল-মুজীযীন আল-মুসনিদীন”—এ কিছুটা বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছি। এই সম্মানিত শিক্ষকদের একটি উজ্জ্বল তালিকা রয়েছে, যাঁদের মধ্যে রয়েছেন, মাওলানা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ রাবি‘ হাসানি নাদভী, মাওলানা সাঈদুর রহমান আ‘যমী, মাওলানা সাইয়্যিদ মুহাম্মদ ওয়াযিহ রশীদ নাদভী, মাওলানা আবুল ইরফান নাদভী, মাওলানা জিয়াউল হাসান নাদভী, মাওলানা শাহবাজ ইসলাহী, মুফতি মুহাম্মদ জুহূর নাদভী, মাওলানা নাসির আলী, মাওলানা বুরহানুদ্দীন সম্ভলী এবং মাওলানা মুহাম্মদ আরিফ সম্ভলী—রহিমাহুমুল্লাহ।

এই শিক্ষকগণ ছিলেন জ্ঞান ও আমলের জীবন্ত প্রতিমূর্তি। তাঁদের পরিশ্রম কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তাঁরা শিক্ষার্থীদের মনে জ্ঞানের প্রদীপ জ্বালিয়ে দিতেন এবং হৃদয়ে চিন্তার উষ্ণতা সঞ্চার করতেন। তাঁদের সান্নিধ্য ছিল এমন, যেন বৃষ্টি মাটিকে জীবন দান করে; নীরবে নীরবে তাঁরা আমাদের ভেতরে জ্ঞানের শিকড়কে দৃঢ় করে দিতেন। আমরা তাঁদের কাছ থেকে শুধু বইয়ের জ্ঞানই অর্জন করিনি; বরং চিন্তার শুদ্ধতা, গাম্ভীর্য, অধ্যয়নের রুচি এবং জ্ঞানগত সততার মতো মহৎ গুণাবলিও আত্মস্থ করেছি। তাঁদের দানকৃত জ্ঞান ছিল এমন মূল্যবান সম্পদ যে, এর বিনিময়ে সময়ের একটি মুহূর্তও নষ্ট করা আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য ছিল না।

নিশ্চয়ই পৃথিবীতে এমন শিক্ষকের অভাব নেই, যারা পাঠদানকে আকর্ষণীয় করে তুলতে রসিকতা, কৌতুক ও চমৎকার বাক্পটুতার আশ্রয় নেন, এবং তাঁদের মধুর ভাষণে শ্রেণিকক্ষকে এমন রঙিন করে তোলেন যেন কোনো আসরে হাসির বৃষ্টি ঝরছে। বাহ্যত শিক্ষার্থীরা এতে আনন্দও পায়, সময়ও সুখকরভাবে কেটে যায়; কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে এই প্রফুল্লতা শিশিরবিন্দুর মতো (ঝলমলে, কিন্তু ক্ষণস্থায়ী) সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই যার বিলয় ঘটে। জ্ঞানের মূল বক্তব্য, যা প্রকৃত উদ্দেশ্য, তা হাত ফসকে এমনভাবে বেরিয়ে যায়, যেন মুঠোভর্তি বালু ধীরে ধীরে ঝরে পড়ে।

অন্যদিকে, আমাদের শিক্ষকদের পাঠদান ছিল পাথরে খোদাই করা নকশার মতো, নীরব, গম্ভীর, কিন্তু এমন স্থায়ী যে সময়ের আবর্তনও তাকে মুছে দিতে পারেনি। তা কেবল শব্দ ছিল না; বরং এমন ছাপ ছিল, যা মন ও হৃদয়ের পটে চিরস্থায়ী হয়ে গেঁথে গিয়েছিল।

মাওলানা রাবি‘ রহ. ছিলেন ভাষা ও সাহিত্যের এমন একজন ইমাম, যেন আরবির প্রাণ তাঁর ভেতরেই কথা বলত। অভিধানের সূক্ষ্ম দিক, প্রবাদ-প্রবচনের দুর্লভ মুক্তো, এবং ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কবিতার প্রদীপসম পংক্তিগুলো তিনি এমনভাবে একত্র করেছিলেন, যেন কোনো দক্ষ শিকারি ছড়িয়ে থাকা পাখিদের এক জালে জড়ো করে ফেলে। আরবদের ভূগোল, তাঁদের সংস্কৃতি, বংশপরিচয়, ঐতিহাসিক দিনপঞ্জি ও গোত্রসমূহ, আরব আরিবা, আরব বায়িদা ও আরব মুস্তা‘রিবা, সবকিছুই তাঁর স্মৃতিতে এমনভাবে সুরক্ষিত ছিল, যেন কোনো দক্ষ স্থপতির মনে একটি সম্পূর্ণ মানচিত্র অঙ্কিত রয়েছে। তাঁর আসরে বসলে মনে হতো, যেন প্রাচীন যুগের বর্ণনাকারীরা, আসমাঈ ও আবু উবাইদা, তাঁদের পূর্ণ জ্ঞানের জৌলুস নিয়ে জীবন্ত হয়ে সামনে উপস্থিত হয়েছেন, আর অতীতের বইগুলো বর্তমানের জীবন্ত বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।

মাওলানা সাঈদুর রহমান রহ.-এর ব্যক্তিত্বের গাম্ভীর্য ও মর্যাদা ছিল অনন্য। যেখানে সাধারণ শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের ফিসফাস থামাতে হিমশিম খেতেন, সেখানে তাঁর আগমন হতো এক নীরব ঝড়ের মতো। দরজা ধীরে খুলে তাঁর উঁচু কপাল দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁর কণ্ঠস্বর, যা গম্ভীরতা ও মর্যাদায় স্বতন্ত্র, পুরো পরিবেশকে এমনভাবে আচ্ছন্ন করত যে, সব কোলাহল নিজে থেকেই স্তিমিত হয়ে যেত। শিক্ষার্থীদের ওপর নেমে আসত এমন নীরবতা, যেন পাখিরা হঠাৎ কোনো ছায়াময় বৃক্ষে আশ্রয় নিয়েছে।

মাওলানা ওয়াযিহ রহ. ছিলেন তাঁর যুগের এক অসাধারণ প্রতিভাধর সাহিত্যিক, শক্তিমান লেখক ও গভীর চিন্তার অধিকারী মনীষী। তাঁর পাঠদানের ধরন ছিল এক মধুর সুরের মতো, অত্যন্ত সূক্ষ্ম, সুষম ও হৃদয়স্পর্শী। তাঁর কথায় ছিল মাধুর্য, আচরণে উদারতা, আর হৃদয়ে ছিল এমন কোমলতা, যেন শিশিরবিন্দু ফুলের পাপড়িতে স্থির হয়ে আছে। তিনি জটিলতম বিষয়কেও এমন সহজভাবে উপস্থাপন করতেন, যেন কঠিন গিঁটগুলো আপনাআপনি খুলে যাচ্ছে।

মাওলানা নাসির আলী রহ. ছিলেন উসূলুল ফিকহের এমন একজন পণ্ডিত, যার যুক্তির গভীরতা ছিল সীমাহীন সাগরের মতো। কোনো বিষয়ে আলোচনা শুরু হলে মনে হতো চিন্তার নদীগুলো প্রবাহিত হতে শুরু করেছে, আর তা চলতেই থাকত যতক্ষণ না প্রতিটি দিক আলোকিত হয়ে ওঠে। তিনি সময়ের প্রতি অত্যন্ত যত্নশীল ছিলেন, ঘড়ির কাঁটার সঙ্গে তাল মিলিয়ে আসতেন এবং একই শৃঙ্খলায় চলে যেতেন—কিন্তু এই সীমিত সময়ের মধ্যেই তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে গবেষণা ও বিতর্কের এমন শক্তি সঞ্চার করতেন যে, তারা যেন জ্ঞানের অঙ্গনে দক্ষ অশ্বারোহীতে পরিণত হতো। এত

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *