শিরোনাম : আল্লাহর বাণী : “وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي”—এর অর্থ
১৭/৩/২০২৬
❖ প্রশ্ন:
সম্মানিত আলেম মাওলানা মাহমুদ হাসান গাজী সাহেব (রহ.)-এর পক্ষ থেকে নিম্নোক্ত প্রশ্নটি এসেছে—
কুরআনের আয়াত “فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي” সম্পর্কে মেহেরবানি করে কিছু আলোকপাত করুন। এখানে “مِن رُّوحِي” দ্বারা আল্লাহ তাআলা কী বোঝাতে চেয়েছেন? এটি কি আক্ষরিক অর্থে, না রূপক অর্থে?
❖ উত্তর:
পবিত্র আয়াত “فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِن رُّوحِي” (সূরা আল-হিজর: ২৯) কুরআনের সেই সূক্ষ্ম ও গভীর বোধগম্যতার ক্ষেত্রগুলোর একটি, যেখানে শব্দার্থ ও আকীদাগত নীতিমালার যথাযথ বিবেচনা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। বিশেষ করে “مِن رُّوحِي” বাক্যাংশটি যুগে যুগে আলেমদের চিন্তা-গবেষণার বিষয় হয়ে এসেছে। আর এখানে যে জটিলতার উদ্ভব হয়, তা মূলত ‘নিসবত’ বা সম্বন্ধের প্রকৃতি সঠিকভাবে নির্ধারণ না করার ফলেই ঘটে।
কিছু চিন্তাশীল ব্যক্তি এ নিসবতকে আরবি ভাষার সেই রীতির আলোকে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছেন, যাকে বলা হয় ‘অংশকে সম্পূর্ণের দিকে সম্বন্ধিত করা’—যেমন, “যায়েদের মাথা” বা “যায়েদের চোখ”। কিন্তু যদি এখানে সেই অর্থ গ্রহণ করা হয়, তাহলে তার অবশ্যম্ভাবী ফল দাঁড়ায়, মানব-আত্মা আল্লাহ তাআলার সত্তার কোনো অংশ। অথচ এ ধারণা শুধু কুরআনের সামগ্রিক বক্তব্যের বিরোধী নয়, বরং তাওহীদের মৌলিক আকীদার সঙ্গেও সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ, আল্লাহ তাআলা সম্পর্কে অকাট্য ও চূড়ান্ত নীতি হলো “তাঁর সদৃশ কিছুই নেই”; তিনি সকল প্রকার সাদৃশ্য, গঠন ও অংশবিশিষ্টতার ঊর্ধ্বে ও পবিত্র। সুতরাং তাঁর সত্তায় কোনো অংশ বা বিভাজনের ধারণা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য।
এই বাস্তবতায়, আয়াতটির সঠিক অর্থ বুঝতে হলে আরবি ভাষার স্বীকৃত ও প্রাঞ্জল রীতির দিকে ফিরে যেতে হয়। এখানে “روحی” শব্দটির সম্বন্ধ সেই ধরনের, যা কোনো বস্তুকে তার স্রষ্টা ও মালিকের দিকে সম্বন্ধিত করে বোঝানো হয়। অর্থাৎ, “আমার রূহ” বলতে বোঝানো হয়েছে সে রূহ, যা আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি এবং তাঁরই মালিকানাধীন। আরবি ভাষায় এ ধরনের ব্যবহার বহুল প্রচলিত, যেমন, “যায়েদের সম্পদ” বা “যায়েদের ঘর” যেখানে সম্বন্ধের উদ্দেশ্য মালিকানা ও বিশেষ সম্পর্ক প্রকাশ করা, কোনো অংশ বা সত্তাগত অন্তর্ভুক্তি নয়।
এখানে একটি সূক্ষ্ম দিকও লক্ষণীয়। সমগ্র সৃষ্টিজগতের প্রতিটি বস্তুই আল্লাহ তাআলার সৃষ্টি ও তাঁরই মালিকানাধীন। তবুও, কুরআনের কিছু স্থানে বিশেষ কিছু সৃষ্টিকে আল্লাহ তাআলার দিকে বিশেষভাবে সম্বন্ধিত করা হয়। এই বিশেষ সম্বন্ধ কেবল মালিকানার ঘোষণা নয়; বরং এতে এক অতিরিক্ত তাৎপর্য নিহিত থাকে, তা হলো সম্মান, মর্যাদা ও মহিমার প্রকাশ।
কুরআনের একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত হলো—“سُبْحَانَ الَّذِي أَسْرَىٰ بِعَبْدِهِ”—যেখানে “তাঁর বান্দা” বলে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ সব মানুষই তাঁর বান্দা। এখানে এই বিশেষ সম্বন্ধের মাধ্যমে নবী করীম ﷺ-এর ‘আবদিয়্যাত’-এর মহিমা ও উচ্চ মর্যাদা তুলে ধরা হয়েছে।
ঠিক একই নীতির আলোকে “مِن رُّوحِي” বাক্যাংশটি বুঝতে হবে। এখানে রূহকে আল্লাহ তাআলার দিকে সম্বন্ধিত করার মাধ্যমে মানব-আত্মার মহত্ত্ব, তার অনন্য মর্যাদা এবং হযরত আদম আলাইহিস সালামের সৃষ্টির প্রসঙ্গে তার বিশেষ অবস্থানকে উদ্ভাসিত করা হয়েছে।
অতএব, এই অভিব্যক্তির মধ্যে কোনোভাবেই আল্লাহ তাআলার সত্তার অংশ হওয়ার ধারণা নেই, না এতে তাঁর জন্য কোনো দেহগত গঠন বা সংযোজনের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। বরং এটি কুরআনের এক অনুপম, বাগ্মিতাপূর্ণ শৈলী—যেখানে কোনো সৃষ্টিকে তার স্রষ্টার দিকে সম্বন্ধিত করে তার সম্মান ও মর্যাদাকে উজ্জ্বলভাবে প্রকাশ করা হয়, আর একই সঙ্গে আল্লাহ তাআলার পরম পবিত্রতা ও অতুলনীয়তার আকীদা অটুট থাকে।
———-
ক্যাটাগরি : তাফসির, কোরআন, ফিলোসোফি, ইসলামি চিন্তাধারা
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8716