AkramNadwi

আর্থিক সংকটে নারীদের স্বর্ণ ও যাকাতের বিধান

আর্থিক সংকটে নারীদের স্বর্ণ ও যাকাতের বিধান

|০২| ফেব্রুয়ারি| ২০২৬|

প্রশ্ন
আসসালামু আলাইকুম।
যাকাত সংক্রান্ত একটি প্রশ্ন।
আমার কাছে সাড়ে সাত তোলা সামান্য বেশি স্বর্ণ রয়েছে। আমি এগুলো পরি এবং বিশেষভাবে আমার মেয়ের বিয়ের জন্য সংরক্ষণ করে রেখেছি। আমার স্বামী বারো বছর আগে অবসর নিয়েছেন। আমি নিজেও কোনো কাজ করি না; আমি একজন গৃহিণী। আমাদের পরিবারের এমন কেউ নেই যে উপার্জন করতে পারে। আমরা কেবল স্বামীর পেনশন আয়ে চরম কষ্টে দিনযাপন করছি। আমাদের অবস্থা এমন যে ঘরে প্রায় কিছুই নেই, নামমাত্র আসবাবপত্রও নেই, হাত থেকে মুখে তুলে বেঁচে আছি।

এই অবস্থাতেও আমি এই স্বর্ণটুকু ধরে রেখেছি শুধু আমার মেয়ের বিয়ের জন্য। তাকে বিয়ে দেওয়ার মতো কোনো সঞ্চয় বা নগদ অর্থ আমার নেই। এসব বিষয়ে আমার স্বামী কখনো বিশেষ মনোযোগ দেননি। আমার কোনো ছেলে সন্তানও নেই।

পূর্ববর্তী বছরগুলোতে আমি এই স্বর্ণের যাকাত আদায় করেছি। কিন্তু এ বছর আমাদের আর্থিক অবস্থা আরও খারাপ হয়েছে, আর যাকাত দেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে—বিশেষ করে এখন স্বর্ণের দাম খুব বেশি।
এই পরিস্থিতিতে কি আমার ওপর এখনো যাকাত ফরজ থাকবে?

উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।

আপনি যে পরিস্থিতির কথা বর্ণনা করেছেন, তাতে বহু বিশিষ্ট আলেমের একটি শক্তিশালী ও সুপ্রতিষ্ঠিত মত অনুযায়ী এই স্বর্ণের ওপর আপনার যাকাত ফরজ নয়।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় বোঝা জরুরি, শরিয়তে যাকাতের উদ্দেশ্য দরিদ্রকে বোঝা চাপানো নয়; বরং তাদের সহায়তা করা, কষ্ট লাঘব করা এবং সমাজে আর্থিক ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। যে নারী নিজস্ব কোনো আয় নেই, উপার্জন করেন না, এবং সীমিত পেনশন বা অন্যের সহায়তায় জীবনধারণ করেন, তিনি নীতিগতভাবে যাকাত আদায়কারীর চেয়ে যাকাত গ্রহণের অধিক নিকটবর্তী। কেবল কিছু গহনার মালিক হওয়া তাকে অভাবমুক্ত করে না, যদি সেই গহনা থেকে কোনো আয় না আসে এবং তা বিক্রি করা বাস্তবে মারাত্মক কষ্ট ছাড়া সম্ভব না হয়।

উপমহাদেশসহ অনুরূপ সমাজগুলোতে এটি সুপরিচিত বাস্তবতা যে দরিদ্র ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত নারীরা সামান্য স্বর্ণ রাখেন ব্যবসা, বিনিয়োগ বা সম্পদ সঞ্চয়ের জন্য নয়; বরং অপরিহার্য ব্যক্তিগত ও পারিবারিক প্রয়োজনের জন্য। এসব গহনা সাধারণত মেয়ের বিয়ে, আকস্মিক বিপদ এবং মর্যাদা ও নিরাপত্তা রক্ষার আশ্রয় হিসেবে সংরক্ষিত থাকে। যাকাত দেওয়ার জন্য এই গহনা বিক্রি করা হলে বাস্তবে সেই আশ্রয়টাই ধ্বংস হয়ে যায়, যার ওপর ভর করে তারা অনিবার্য ভবিষ্যৎ দায়িত্ব পালনের আশা রাখেন। গহনা থাকা সত্ত্বেও তাদের দারিদ্র্য ঘোচে না, আর তারা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বীও হয়ে ওঠেন না।

ফিকহি দৃষ্টিকোণ থেকে নারীদের বৈধ ব্যক্তিগত ব্যবহারের গহনার ওপর যাকাত ফরজ নয়, এ কথা বলার পক্ষে শক্ত ও নির্ভরযোগ্য ভিত্তি রয়েছে। মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি মাযহাবসহ অধিকাংশ আলেমের অভিমত এটিই। তাঁদের মতে, নারীদের পরিধেয় বা বৈধ ব্যক্তিগত প্রয়োজনে সংরক্ষিত গহনা অন্যান্য ব্যক্তিগত সামগ্রীর মতোই, যেমন পোশাক বা গৃহস্থালি দ্রব্য, যেগুলোর ওপর যাকাত আরোপিত হয় না।

তাঁরা ব্যাখ্যা করেন, কুরআন ও হাদিসে স্বর্ণ ও রৌপ্যের যাকাত সংক্রান্ত যে সাধারণ বিধান এসেছে, তা মূলত অর্থ ও চলমান সম্পদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, ব্যক্তিগত গহনার ক্ষেত্রে নয়। সংশ্লিষ্ট শব্দসমূহ, যেমন আল-ওয়ারিক, আর-রিকাহ ও আল-আওয়াকী, আরবি ভাষা ও প্রচলিত ব্যবহারে মুদ্রিত ও প্রচলিত স্বর্ণ-রৌপ্য মুদ্রাকেই বোঝায়, গহনা নয়। ইমাম আবু উবাইদ আল-কাসিম ইবন সাল্লাম ও ইমাম ইবন খুযাইমার মতো ভাষা ও ফিকহের প্রখ্যাত আলেমগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে এসব শব্দ আরবিতে গহনার জন্য ব্যবহৃত হয় না।

ইমাম শাওকানিও পরিষ্কার করেছেন যে এসব বর্ণনাকে গহনার যাকাতের দলিল হিসেবে ব্যবহার করা ভাষাগতভাবে সঠিক নয়; বরং শব্দগুলোর প্রকৃত অর্থ গহনার বিপরীতেই নির্দেশ করে এবং মুদ্রিত অর্থের দিকেই ইঙ্গিত করে।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সাহাবিদের আমল এই মতকে আরও শক্তিশালী করে। নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত যে আনাস ইবন মালিক, জাবির ইবন আবদুল্লাহ, আবদুল্লাহ ইবন উমর, আয়েশা এবং আসমা বিনতে আবু বকর রাদিয়াল্লাহু আনহুম, এই সকল বিশিষ্ট সাহাবি নারীদের গহনার ওপর যাকাত ফরজ মনে করতেন না। ইমাম আহমদ ইবন হাম্বল এ বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন, আর ইমাম ইবন হাজম নির্ভরযোগ্য সনদে এসব বর্ণনা সংকলন করেছেন।

বিশেষ করে আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার আমল একেবারে সুস্পষ্ট। তিনি তাঁর এতিম ভাতিজিদের তত্ত্বাবধানে ছিলেন, যাদের স্বর্ণালঙ্কার ছিল; কিন্তু তিনি সেই গহনাগুলোর যাকাত আদায় করেননি। ইমাম মালেকের মুয়াত্তায় এটি লিপিবদ্ধ আছে। শাইখ মুহাম্মদ আমিন শানকিতি মন্তব্য করেছেন, আয়েশা রাদিয়াল্লাহু আনহার পক্ষে কোনো ফরজ বিধান জেনেশুনে ত্যাগ করা বা এতিমদের সম্পদকে শাস্তির হুমকির মুখে ফেলা কল্পনাও করা যায় না, বিশেষত যখন তিনি অন্যান্য সম্পদের যাকাত আদায়ে অত্যন্ত সতর্ক ছিলেন। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে যে তিনি গহনাকে যাকাতযোগ্য মনে করতেন না।

একইভাবে আবদুল্লাহ ইবন উমর রাদিয়াল্লাহু আনহুমা তাঁর কন্যা ও দাসীদের স্বর্ণালঙ্কারে সজ্জিত করতেন এবং সেগুলোর যাকাত দিতেন না।

এই সব প্রমাণের আলোকে দৃঢ়ভাবে বলা যায়, যে দরিদ্র নারী কেবল ব্যক্তিগত গহনার মালিক, যার কোনো স্বতন্ত্র আয় নেই, এবং যে গহনা তিনি নিজের ব্যবহারের জন্য বা অনিবার্য প্রয়োজনের জন্য, যেমন মেয়ের বিয়ে—সংরক্ষণ করে রেখেছেন, তার ওপর সেই গহনার যাকাত ফরজ নয়। শরিয়তের দৃষ্টিতে তিনি ধনী গণ্য হন না; কারণ এই গহনা কোনো বর্ধনশীল সম্পদ নয়, এবং বাস্তবসম্মতভাবে যাকাত আদায়ের মতো উদ্বৃত্ত সম্পদও নয়।

আরও নিশ্চিন্ত হওয়ার জন্য ভালো হলো—এই গহনাগুলো সত্যিই ব্যবহৃত অবস্থায় রাখা এবং মাঝে মাঝে পরিধান করা, যাতে তা সঞ্চিত সম্পদ বা ব্যবসায়িক পণ্য থেকে স্পষ্টভাবে পৃথক থাকে। এই অবস্থায় অধিকাংশ ফকিহের মতে যাকাত ফরজ নয়, এবং এ ছাড় গ্রহণ করতে কোনো দ্বিধা থাকা উচিত নয়।

উপসংহারে বলা যায়, যদি কোনো নারীর গহনা তার মৌলিক প্রয়োজন, মর্যাদা এবং অনিবার্য ভবিষ্যৎ দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তবে শরিয়ত তাকে গরিবই গণ্য করে। এমন নারীর কাছ থেকে যাকাত দাবি করা যাকাতের উদ্দেশ্য, ন্যায়বিচারের নীতি এবং অধিকাংশ যোগ্য আলেমের অবস্থানের সঙ্গে অসংগত।

————–
ক্যাটাগরি : ফাতাওয়া, ফিকাহ, ইসলামি চিন্তাধারা

✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8341

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *