AkramNadwi

শিরোনাম : আয়াতুন নূরের তাফসির। ——————-

بسم الله الرحمن الرحيم.

সূরা নূরের মূল বিষয় হলো হিদায়াত, পবিত্রতা এবং নির্মলতা। এ সূরা মূলত সূরা মু’মিনূনের শুরুতে (১–১১ আয়াত) যে মুমিনদের গুণাবলি ও বৈশিষ্ট্যের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে, তারই বিস্তারিত রূপ। এটি মুসলিম সমাজের সীমারেখা ও শিষ্টাচার নির্ধারণ করে, সামাজিক পবিত্রতার মৌলিক নীতিমালা স্থাপন করে।

কিন্তু এর মাঝে একটি আয়াত—৩৫ নম্বর আয়াত, যেটি আয়াতুন নূর নামে প্রসিদ্ধ—এসেছে এক অসাধারণ উপমারূপে। এতে মুত্তাকীদের বৈশিষ্ট্য, তাদের অন্তরের গোপন জীবন এবং কীভাবে ঈমান তাদের হৃদয় আলোকিত করে, তা স্পষ্ট করে তুলে ধরা হয়েছে। এই আলো আবার তাদের কর্মে প্রতিফলিত হয়। কুরআনের অন্যতম মহৎ এ আয়াতের উদ্দেশ্য হলো ঈমান ও সৎকর্মের আলোকে কাফেরদের অন্ধকার ও তাদের আমলের শূন্যতার বিপরীতে দাঁড় করানো। এজন্য আল্লাহ এতে ধারাবাহিক তিনটি চিত্র এঁকেছেন—
১. আলোর চিত্র, যা ঈমান।
২. মরীচিকার চিত্র, যা কাফেরদের আমল।
৩. অন্ধকারের চিত্র, যা কুফরের প্রকৃত রূপ।

এইভাবে সত্যকে এমন অনুপম ভঙ্গিতে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা একইসাথে হৃদয় ও বুদ্ধিকে বন্দী করে রাখে।

প্রথম চিত্র: আলোর চিত্র

আল্লাহ বলেন:
আল্লাহ আসমানসমূহ ও যমীনের নূর। তাঁর নূরের উপমা একটি তাকের মতই। তাতে রয়েছে একটি প্রদীপ, প্রদীপটি রয়েছে একটি চিমনির মধ্যে। চিমনিটি উজ্জ্বল তারকার মতই। প্রদীপটি বরকতময় যাইতূন গাছের তেল দ্বারা জ্বালানো হয়, যা পূর্ব দিকেরও নয় এবং পশ্চিম দিকেরও নয়। এর তেল যেন আলো বিকিরণ করে, যদিও তাতে আগুন স্পর্শ না করে। নূরের উপর নূর। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা হিদায়াত করেন তাঁর নূরের দিকে। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উপমাসমূহ উপস্থাপন করেন। আর আল্লাহ প্রতিটি বস্তু সম্পর্কে সম্যক জ্ঞাত।
(সূরা নূর: ৩৫)

কিছু মানুষ ভেবে বসেন, এ আয়াতে সরাসরি আল্লাহর নূরের উপমা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যখন আমরা আয়াতের তিনটি উদাহরণ একসাথে দেখি, তখন স্পষ্ট হয়—এখানে আসলে উদ্দেশ্য হলো ঈমান ও সৎকর্মের হিদায়াত। এর প্রমাণ আয়াতের শেষাংশ: “আল্লাহ যাকে চান তাঁর নূরের দিকে পরিচালিত করেন।”

তাহলে “আল্লাহ আসমান ও জমিনের নূর” কথার অর্থ হলো—তিনি-ই সব নূরের উৎস। সূর্য, নক্ষত্রের আলো, অথবা ঈমান ও সৎকর্মের আলো—সবই তাঁর দান। আর যে আল্লাহর দিকে মুখ ফেরায় না, সে কখনো আলো পায় না। যেমন আল্লাহ বলেন:
“আর যার জন্য আল্লাহ নূর নির্ধারণ করেন না, তার আর কোনো নূর নেই।” (সূরা নূর: ৪০)

উপমার বিশ্লেষণ :
এই কোরআনিক উপমায় ঈমানকে তুলনা করা হয়েছে এক প্রদীপের সাথে, যা জ্বলছে এক খোপে। সেই খোপ হলো মানুষের অন্তর, আর প্রদীপ হলো ঈমানের আলো, যা আল্লাহর ইচ্ছা ও তাঁর ওহির নিঃশ্বাসে প্রজ্বলিত। প্রদীপটি রাখা আছে এক স্বচ্ছ, ঝকঝকে কাঁচের ভেতর, যা আকাশে ঝলমল করা নক্ষত্রের মতো দীপ্তিমান। এ কাঁচ প্রতীক সেই সুস্থ অন্তরের, যে তার ফিতরাতকে নির্মল রেখেছে; ফলে ঈমানের আলো সেখানে প্রতিফলিত হয়েছে তার শ্রেষ্ঠ রূপে।

আর প্রদীপের জ্বালানী তেল এসেছে এক বরকতময় জলপাই গাছ থেকে। এটি না পূর্বের, না পশ্চিমের—বরং ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলের, বিশেষ করে শাম অঞ্চলের, যেখানে উৎকৃষ্ট ও বরকতময় জলপাই উৎপন্ন হয়। এ তেল এতটাই স্বচ্ছ ও হালকা যে, আগুন না লাগালেও তা যেন আলো দিতে উদ্যত হয়।

এ তেল প্রতীক সেই নির্মল ফিতরাতের, যা আল্লাহ প্রতিটি মানুষের মধ্যে প্রোথিত করেছেন। যখন এ ফিতরাত মিলিত হয় ওহির সাথে, তখন সৃষ্টি হয় দ্বিগুণ আলো। কুরআনের ভাষায়: “আলো-উপর-আলো।”

এ আলো অন্তরকে খুলে দেয়।
এ আলো বুদ্ধিকে জাগ্রত করে।
এ আলো কর্মকে চালিত করে সঠিক পথে।

আলোর পূর্ণতা :

এভাবে বুঝা যায়, ঈমানের আলো কোনো ক্ষণিকের ঝলক নয়। এটি এমন এক সর্বব্যাপী আলো, যা ভেতর ও বাহির—উভয়কেই আলোকিত করে।

মিশকাত হলো অন্তর।
প্রদীপ হলো ঈমান।
কাঁচ হলো হৃদয়ের স্বচ্ছতা।
তেল হলো ফিতরাতের পবিত্রতা।
আগুন হলো ওহির আলো।

এসব একত্র হলে অন্তর আলোকিত হয়ে ওঠে, আলোতে ভরে যায়, অন্ধকার ছিন্নভিন্ন হয়। ফলে মুমিনের জ্ঞান ও কর্ম—দুটোই নূরে রূপান্তরিত হয়। তার জ্ঞান তাকে দেয় দূরদৃষ্টি, তার কর্ম তাকে চালিত করে সোজা পথে।

অন্যদিকে কাফেরের অবস্থা হলো মরীচিকার মতো। সে তাতে দৌড়ায়, কিন্তু পায় না কিছুই। তার আমল সব শূন্য হয়ে যায়, আর কুফরের আঁধার তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলে। মুমিন জানে সে কোথা থেকে এসেছে, কোথায় যাচ্ছে; কিন্তু কাফের আঁধারে হোঁচট খেতে খেতে কোনো পথ খুঁজে পায় না, কোনো গন্তব্যে পৌঁছায় না।

আলোকে কেন্দ্র করে সমাজ :
আল্লাহ এই উপমায় প্রদীপ, কাঁচ, জলপাই গাছ ও মিশকাতের কথা বলেছেন। এভাবে তিনি আলোর সব উপাদানকে একত্র করেছেন—

গাছের বরকত,
তেলের স্বচ্ছতা,
কাঁচের দীপ্তি,
প্রদীপের শক্তি,
মিশকাতের সুরক্ষা।

তারপর এ আলোকে তিনি যুক্ত করেছেন মসজিদের সাথে, যেখানে আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়। যেখানে এমন মানুষ আছে, যারা রুকু করে, সিজদা করে, সালাত কায়েম করে, যাকাত প্রদান করে এবং হিসাবের দিনের ভয় হৃদয়ে ধারণ করে।

এসবই আলোর বহিঃপ্রকাশ। আর সবশেষে আল্লাহ ঘোষণা করেছেন:
“আল্লাহ যাকে চান তাঁর নূরের দিকে পরিচালিত করেন।”

উপসংহার

এই হলো প্রথম চিত্র, যা আমাদের সামনে তুলে ধরে—যখন ঈমানের প্রদীপ অন্তরে প্রজ্বলিত হয়, তখন তা দূর করে দেয় সব অন্ধকার। মানুষ তখন আলোর পর আলোতে এগোতে থাকে। এ-ই হলো প্রকৃত নূর, এ-ই হলো দুনিয়া ও আখিরাতের আসল সুখের রহস্য।

——————–

ক্যাটাগরি : তাফসির, কোরআন।

✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7159

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *