আমি ভারতের লখনৌ শহরের দারুল উলুম নদওয়াতুল উলামা থেকে একজন আলেম হিসেবে প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছি। পাশাপাশি লখনৌ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডক্টরেট সম্পন্ন করেছি। সম্প্রতি আমি ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েই এক বক্তৃতা দিয়েছিলাম—বিষয় ছিল, মুসলিম নারীরা কীভাবে ইসলামি শিক্ষাবিদ হিসেবে নিজেদের জনপরিসরের মর্যাদা পুনরুদ্ধার করতে পারেন।
সংক্ষেপে বললে, আমার অধ্যয়নের মূল কেন্দ্র ইসলামি ঐতিহ্যবাহী শাস্ত্রসমূহ—তাফসির (কুরআনের ব্যাখ্যা), হাদিস, এবং ফিকহ। তবে এসব বিষয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার পথে আমি বিস্তৃতভাবে আরবি ও উর্দু সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস এবং এসব শাস্ত্রের সমালোচনামূলক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলাম। এ অভিজ্ঞতা আমার চিন্তা ও লেখনশৈলীতে অসাধারণ সহায়তা দিয়েছে, বিশেষত আরবি ও উর্দু ভাষায় ভাব প্রকাশের দক্ষতা অর্জনে। আফসোস, ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি ও চিন্তায় একই রকম প্রস্তুতি নিতে পারিনি।
সাহিত্যসমালোচনা ও ইতিহাসচর্চা আমার জন্য বিশেষভাবে উপকারী হয়েছে। এ দুই শাস্ত্র আমাকে শিখিয়েছে—কোনো ক্লাসিক সাহিত্য বা ধর্মীয় গ্রন্থ অধ্যয়নের সময় শব্দচয়ন, বাক্যগঠন এবং ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ কতটা গুরুত্বপূর্ণ।
আমি ফিকহ, উসুলুল ফিকহ, তাফসির, আরবি ব্যাকরণ, বালাগাত (রেটরিক), মান্তিক (যুক্তি), এবং হাদিস বিষয়ে ব্যাপকভাবে লিখেছি। অবশ্য এসব বিষয়ে আমি কীভাবে অধ্যয়ন ও গবেষণা করি, তার সব দিক একসঙ্গে বর্ণনা করা বাস্তবসম্মত নয়। তবে আমার চলমান সবচেয়ে বৃহৎ গবেষণা প্রকল্পের দিকটি সংক্ষেপে তুলে ধরা যেতে পারে—তা হলো: ইমাম মুসলিম (রহ.) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘সহিহ মুসলিম’-এ হাদিস নির্বাচনে ও বিন্যাসে যে পদ্ধতি গ্রহণ করেছেন, তার বিশ্লেষণ।
এই বিশ্লেষণের অংশ হিসেবে ইমাম মুসলিমের পদ্ধতির সঙ্গে ইমাম বুখারির পদ্ধতির তুলনাও অপরিহার্য। এ কাজে হাদিসের মূল পাঠের পাশাপাশি হাদিসগ্রন্থের ব্যাখ্যামূলক উপকরণগুলোর ভাষা, বিন্যাস ও ইঙ্গিতগুলোর সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ জরুরি—বিশেষত যেখানে ইমাম মুসলিম নীরব থেকেছেন বা ইঙ্গিত দিয়েছেন, সেখানকার মর্ম অনুধাবন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এই ধরনের গবেষণায় প্রবেশের আগে একজন শিক্ষার্থীর প্রথম কাজ হলো ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্পষ্টভাবে বোঝা। আমাদের জানতে হবে—ইমাম মুসলিম কী উদ্দেশ্যে এই কাজ করেছিলেন, কেন করেছিলেন, তিনি কাদের উদ্দেশে লিখেছিলেন, এবং তাঁর কাজ সমসাময়িক ও পরবর্তী প্রজন্মে কীভাবে গ্রহণ করা হয়েছিল।
কেবল ‘সহিহ মুসলিম’-এর কোনো ছাপানো সংস্করণ হাতে নিয়ে পড়া যথেষ্ট নয়; বরং আমাদের বুঝতে হবে, বইটি প্রথমে কী লক্ষ্য নিয়ে রচিত হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়—ইমাম নববীর সুপরিচিত সংস্করণে যে অধ্যায়ের শিরোনাম ও বিভাগগুলো দেখা যায়, সেগুলো মূল রচনায় ছিল না।
ইমাম মুসলিমকে বুঝতে হলে তাঁর সময়ের বাস্তবতা জানা অপরিহার্য। সে যুগে বিভিন্ন মান ও ধরনের বহু হাদিসসংকলন প্রচলিত ছিল। মুসলিম (রহ.) অনুভব করেছিলেন—মুসলিম সমাজের জন্য একটি নির্ভরযোগ্য ও প্রামাণ্য হাদিসভাণ্ডার গড়ে তোলার প্রয়োজন আছে। তাই তিনি হাদিসের পাঠ ও বর্ণনাকারীদের নির্ভরযোগ্যতা যাচাইয়ের জন্য এক সুনির্দিষ্ট ও ধারাবাহিক পদ্ধতি বিকাশ করেন। একই সময়ে ইমাম বুখারিও ভিন্ন অথচ নিজস্ব এক নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে একই কাজ সম্পন্ন করেন।
এইভাবেই ইসলামি জ্ঞানের মহান দুই ইমাম আমাদের সামনে রেখে গেছেন এমন দুইটি দৃষ্টান্ত, যা শুধু হাদিসের জগতে নয়, বরং জ্ঞানের প্রতিটি ক্ষেত্রেই গবেষণার পদ্ধতিগত গভীরতার এক অনন্য নমুনা হয়ে আছে।
যখন আমি সহিহ মুসলিম অধ্যয়ন করি, তখন আমি প্রথমে দুটি বিষয়ে লক্ষ্য রাখি—
এক: ইমাম মুসলিমের কাছে যে হাদিসগুলো পৌঁছেছিল কিন্তু তিনি সেগুলো সংকলনে অন্তর্ভুক্ত করেননি।
দুই: কেন তিনি সেগুলো বাদ দিয়েছেন—এর পেছনে তাঁর যুক্তি বা উদ্দেশ্য কী ছিল।
এরপর আমি লক্ষ্য করি, হাদিস ও বর্ণনাকারী নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাঁর পদ্ধতি ইমাম বুখারির পদ্ধতি থেকে কোথায় ভিন্ন। তারপর আমি প্রতিটি হাদিসের মূল পাঠ (মতন) ও বর্ণনাশ্রেণি (ইসনাদ) গভীরভাবে বিশ্লেষণ করি—বোঝার চেষ্টা করি, ইমাম মুসলিম কোন যুক্তিতে নির্দিষ্ট হাদিসগুলোকে যে ক্রমে সাজিয়েছেন, এবং তিনি কোন হাদিসকে কতটা মূল্যায়ন দিয়েছেন।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় শব্দ ব্যবহারে অত্যন্ত সূক্ষ্ম মনোযোগ প্রয়োজন। উদাহরণস্বরূপ, “রাওয়া” (বর্ণনা করেছেন) জাতীয় শব্দের ভিন্ন ভিন্ন রূপ ব্যবহারে ইমাম মুসলিমের উদ্দেশ্য কী—তা অনুধাবন করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
এভাবে দীর্ঘ ও ধৈর্যশীল অধ্যয়নের পর আমি ধীরে ধীরে সহিহ মুসলিম ও সহিহ বুখারি-এর মধ্যে পদ্ধতিগত পার্থক্য বুঝতে এবং তা ব্যাখ্যা করতে সক্ষম হই। এই পার্থক্যগুলো অধ্যয়ন করে আমি আরও গভীরভাবে উপলব্ধি করি—এই দুই মহান মুহাদ্দিসের গবেষণার নৈপুণ্য কতটা সূক্ষ্ম ও পেশাদার ছিল, এবং তাঁদের এ অধ্যবসায়ের পেছনে কতখানি ধর্মীয় গম্ভীরতা কাজ করেছিল।
তাঁরা নির্ভুলতা ও সত্যনিষ্ঠার প্রতি এত যত্নবান ছিলেন, কারণ ইসলামি আইনশাস্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা ও ইসলামি জীবনের সঠিকতা সেই হাদিসগুলোর সুদৃঢ় ভিত্তির ওপরই দাঁড়িয়ে আছে।
আমরা যখন ইসলামি জ্ঞানচর্চায় নিজেকে নিবেদিত করি, তখন যদি আমাদের মনে থাকে এই জ্ঞানের মহান উদ্দেশ্য—তবে অধ্যয়ন ও লেখালেখির শৃঙ্খলা ও সততা বজায় রাখা অনেক সহজ হয়ে যায়।
এই প্রচেষ্টা কেবল ব্যক্তিগত আচরণ ও পরকালের ফলাফলের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়; এটি মুসলিম সমাজের আচরণ, নৈতিক মান ও সম্মিলিত ভবিষ্যতের উপরও গভীর প্রভাব ফেলে।
——————–
ক্যাটাগরি : হাদিস, শিক্ষা, ইসলামি চিন্তাধারা।
—
✍️ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7504