শিরোনাম : অজু ছাড়া কুরআন স্পর্শ: ফিকহি দৃষ্টিভঙ্গি
———-
❖ প্রশ্ন
ভারত থেকে ড. বদরুদ্দীন সাহেব নিম্নোক্ত প্রশ্ন করেছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
একটি বিষয়ে আপনার দিকনির্দেশনা চাই। আশা করি আপনি অনুগ্রহ করে এর উত্তর দেবেন।
অজু ছাড়া কুরআন শরিফ স্পর্শ করা এবং তিলাওয়াত করার বিষয়ে আলেমদের মধ্যে ভিন্নমত রয়েছে। এ ব্যাপারে আপনার মত কী?
❖ উত্তর
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ।
অজু ছাড়া কুরআনুল কারিম স্পর্শ করা এবং তিলাওয়াত করার বিষয়টি প্রাচীনকাল থেকেই আলেমদের মধ্যে আলোচনার বিষয় হয়ে আছে। উম্মাহর ফকিহগণ কুরআন ও হাদিসের দলিল এবং সেগুলোর উপলব্ধির ভিত্তিতে এ বিষয়ে বিভিন্ন মতামত প্রকাশ করেছেন। এই মতভেদ মূলত শরিয়তের দলিলসমূহকে গভীরভাবে অনুধাবন করা এবং সেগুলোর প্রয়োগের পদ্ধতির পার্থক্য থেকে সৃষ্টি হয়েছে, কুরআনের মর্যাদা ও সম্মান সম্পর্কে কোনো মৌলিক মতভেদ থেকে নয়। তাই বিষয়টি বুঝতে হলে আলেমদের মতামত ও তাদের উপস্থাপিত দলিলগুলোকে ভারসাম্যপূর্ণ দৃষ্টিতে দেখা প্রয়োজন।
উম্মাহর অধিকাংশ ফকিহের মত হলো, কুরআনের মুসহাফ স্পর্শ করার জন্য অজু থাকা আবশ্যক। এ মতটি সাহাবি আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. , তাবিয়ি হাসান বসরি রহ. , আতা ইবনে আবি রাবাহ রহ. এবং তাউস ইবনে কায়সান থেকে বর্ণিত হয়েছে। পাশাপাশি এই মতই গ্রহণ করেছেন চার ইমাম (ইমাম মালিক, ইমাম শাফি, ইমাম আবু হানিফা এবং ইমান আহমদ ইবনে হাম্বল) এবং অধিকাংশ ফকিহ। তাদের মতে কুরআনের মহিমা ও তার যথাযথ আদবের দাবি হলো, মানুষ যেন পবিত্র অবস্থায় তাকে স্পর্শ করে।
অধিকাংশ আলেম সাধারণত তাদের মতের পক্ষে দুটি দলিল উপস্থাপন করেন। প্রথমটি কুরআনের এই আয়াত:
“لَّا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ”
আর দ্বিতীয় দলিল হলো আমর ইবনে হাজম রা. আনহু সূত্রে বর্ণিত সেই হাদিস:
“لا يمس القرآن إلا طاهر”
এই দলিলগুলোর ভিত্তিতে তারা এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন যে কুরআন স্পর্শ করার জন্য পবিত্রতা শর্ত, যাতে এই মহিমান্বিত কিতাবের সম্মান ও মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকে।
অন্যদিকে কিছু আলেম, বিশেষত দাউদ জাহিরি এবং আহলে জাহিরের অধিকাংশ মত দিয়েছেন যে, অজু ছাড়া মুসহাফ স্পর্শ করা বৈধ। তাদের যুক্তি হলো, রাসুলুল্লাহ সা. রোম সম্রাটের উদ্দেশে যে পত্র প্রেরণ করেছিলেন, তাতে কুরআনের একটি আয়াতও উল্লেখ ছিল। স্বাভাবিকভাবেই নবী সা. জানতেন যে সেই চিঠি সম্রাটের হাতে পৌঁছাবে। তাদের মতে, এ ঘটনা থেকে বোঝা যায় যে কুরআনের শব্দসমূহ স্পর্শ করার জন্য অজু থাকা বাধ্যতামূলক, এমন কোনো চূড়ান্ত দলিল নেই।
তবে অধিকাংশ ফকিহ এই যুক্তিকে শক্তিশালী মনে করেন না। তাদের মতে, কোনো চিঠি বা লেখায় কুরআনের একটি আয়াত উদ্ধৃত থাকলেই সেটি মুসহাফের হুকুমে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায় না। তাই তারা এই ঘটনাকে মুসহাফ স্পর্শের বিধানের সঙ্গে তুলনা করা সঠিক মনে করেন না।
কিছু গবেষক এই আয়াতের দলিল হওয়া সম্পর্কেও গভীর আলোচনা করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে:
“إِنَّهُ لَقُرْآنٌ كَرِيمٌ
فِي كِتَابٍ مَّكْنُونٍ
لَّا يَمَسُّهُ إِلَّا الْمُطَهَّرُونَ”
তাদের মতে, এখানে সর্বনামটি মুসহাফকে নির্দেশ করে না; বরং সেই গোপন সংরক্ষিত কিতাবকে বোঝায়, যাকে কুরআন “কিতাবুন মাকনূন” বলেছে—অর্থাৎ লাওহে মাহফূজ। সে ক্ষেত্রে “মুতাহ্হারূন” দ্বারা উদ্দেশ্য হবে ফেরেশতাগণ, যাদের আল্লাহ পবিত্র ও নিষ্পাপ করে সৃষ্টি করেছেন। এই ব্যাখ্যার পক্ষে আরেকটি বিষয়ও উল্লেখ করা হয়—এখানে “المطهرون” শব্দটি এসেছে, অথচ মানুষের জন্য সাধারণত “المتطهرون” শব্দটি ব্যবহৃত হয়। যেমন কুরআনে বলা হয়েছে:
“إِنَّ اللّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ”
এই ভিত্তিতে কিছু আলেম মনে করেন, এই আয়াত থেকে মুসহাফ স্পর্শ করার জন্য অজু থাকা বাধ্যতামূলক—এমন সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয় না।
এভাবেই “لا يمس القرآن إلا طاهر” হাদিসটি নিয়েও মুহাদ্দিসগণের মধ্যে কিছু দ্বিধা রয়েছে। কিছু আলেম এর সনদ নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা করেছেন, যদিও অনেক মুহাদ্দিস এটিকে গ্রহণও করেছেন। তাছাড়া “طاهر” শব্দটির অর্থও প্রসঙ্গভেদে ভিন্ন হতে পারে। এর দ্বারা বোঝানো হতে পারে—
যে ব্যক্তি বড় অপবিত্রতা থেকে পবিত্র,
অথবা ছোট অপবিত্রতা থেকে পবিত্র,
অথবা যার শরীরে কোনো নাপাকি নেই,
অথবা এর দ্বারা মুমিন ব্যক্তিকেও বোঝানো হতে পারে।
এই শেষ অর্থটির সমর্থনে সেই হাদিসটি উল্লেখ করা হয়:
“إن المؤمن لا ينجس”
এবং কুরআনে মুশরিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে:
“إِنَّمَا الْمُشْرِكُونَ نَجَسٌ”
এই ভিত্তিতে কিছু আলেম এ হাদিসের অর্থ এভাবে ব্যাখ্যা করেছেন যে কুরআন কোনো কাফিরের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়; কারণ সে এর সম্মান রক্ষা করার পরিবর্তে তার অবমাননার কারণ হতে পারে।