রোজার সত্য কেবল দিনভর ক্ষুধার্ত থাকা নয়। এর সঙ্গে যদি অন্তরের সংশোধন, দৃষ্টির পবিত্রতা এবং ভাষার সততা যুক্ত না হয়, তবে তা কেবল পরিশ্রমেই সীমাবদ্ধ থাকে। রোজা লজ্জাশীলতার শিক্ষা দেয়, নীরবতায় সত্যের পাঠ দেয়, নির্জনতায় ইখলাসের সাধনা শেখায়। মুমিন নিজের আমল গুনে বেড়ায় না, প্রদর্শনীর বস্তু বানায় না। সে এ মাসকে বরণ করে যেন প্রিয়তম এসেছে। আর যখন তার বিদায়ের কথা মনে পড়ে, হৃদয়ে নেমে আসে এক মৃদু বিষণ্নতা, এমন বিষণ্নতা, যার গভীরে থাকে ভালোবাসার সুগন্ধ।
এ মাস ধৈর্যের মাস। যে এতে আনুগত্য অবলম্বন করে, তার জন্য সুসংবাদ, তার প্রতিদান দুনিয়ার কোনো সাম্রাজ্যের মাপে মাপা যাবে না। সে এমন পুরস্কার পাবে, যার পরিমাপ স্বয়ং আল্লাহর হাতে। দুনিয়ার সব জাঁকজমক ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু আনুগত্যের প্রতিদান চিরস্থায়ী। রোজাদারের জন্য রয়েছে এক বিশেষ দরজা, যেখান দিয়ে সে প্রবেশ করবে; রয়েছে এমন এক জান্নাত, যা তার আগমনের জন্য সজ্জিত৷ যেখানে নেই বিচ্ছেদ, নেই ভয়; নেই অবক্ষয়, নেই শঙ্কা।
হে রমজানের মালিক! আমরা এ দাবি করি না যে আমাদের চেয়ে বড় গুনাহগার আর কেউ নেই; কারণ এ স্বীকারোক্তির ভেতরেও কোথাও না কোথাও আত্মপ্রদর্শনের সূক্ষ্ম ছায়া থেকে যায়, আর এককতার দম্ভ অন্তরের ইখলাসকে কলুষিত করে। আমরা শুধু নিজেদের দুর্বলতার কথা জানি। আমাদের এতটুকু বোধ আছে, আমরা সম্পূর্ণ অভাবগ্রস্ত, আর তুমি সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী; আমরা ভুলে পরিপূর্ণ, আর তুমি আচ্ছাদন ও ক্ষমার আধার; আমরা দুর্বলতার প্রতিমূর্তি, আর তুমি সীমাহীন ক্ষমতার উৎস। আমাদের ললাট অনুতাপে নত, আর তোমার করুণার দরজায় আশার প্রদীপ কাঁপছে।
হে রমজান! এসো, তোমার পদধ্বনিতে হৃদয়ের বিরানভূমি সবুজ হয়ে উঠুক। আমাদের অন্তরে এমন প্রদীপ প্রজ্বলিত করো, যা পাপের ঘন অন্ধকার বিদীর্ণ করে দেয়। এমন এক প্রভাত দাও, যার আলোয় নফসের উচ্ছৃঙ্খলতা নিজেই অবনত হয়ে যায়। আমাদের সংকল্পকে দাও অবিচলতার শিলা, আমাদের হৃদয়কে দাও সেই কোমল স্নিগ্ধতা, যাতে অশ্রু ইবাদতে রূপ নেয়, নীরবতা দোয়ার মর্যাদা পায়। আমাদের এমন নৈকট্যের স্বাদ দাও, যাতে দুনিয়ার সব আকর্ষণ তুচ্ছ হয়ে যায়।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে তোমার প্রতীক্ষায় ছিলাম, নিজেদের বঞ্চনার মরুভূমিতে তোমার আগমনের দোয়া করতে করতে। আজ তুমি যখন আলোর চাদর জড়িয়ে আমাদের দিগন্তে উদিত হয়েছ, আমাদের এমনভাবে রূপান্তরিত করো, যেন তোমার বিদায়ের সময় আমাদের পরিচয়ই বদলে যায়। আমাদের হৃদয় আর আগের মতো না থাকে; আমাদের সংকল্প আর হোঁচটের অভ্যাসে অভ্যস্ত না থাকে; আমাদের দৃষ্টি আর দুনিয়ার কুয়াশায় হারিয়ে না থাকে।
এমন করো, যখন তুমি বিদায় নেবে, তখন আমরা নিজের ভেতর এক নতুন জন্মের রহস্য আবিষ্কার করি। গুনাহর অন্ধকার থেকে বেরিয়ে তওবার আলোয় স্নাত হয়ে দাঁড়াই; গাফলতের নিদ্রা ভেঙে সচেতনতার প্রভাতে জেগে উঠি। যেন তোমার বিদায় বঞ্চনা না হয়ে এক আমানত হয়ে থাকে, যা আমাদের অন্তরে চিরদিনের জন্য প্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকে; আমাদের হৃদয়ে জাগায় নতুন অন্তর্দৃষ্টি, আমাদের আমলে আনে নতুন পবিত্রতা, আর আমাদের জীবনে সৃষ্টি করে এক নতুন দিশা।
———-
ক্যাটাগরি : রামাদান, ইসলামি চিন্তাধারা, তাজকিয়াহ,
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8427