Source: https://t.me/DrAkramNadwi/5550
بسم الله الرحمن الرحيم
❝
লেখক: ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী,
অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
—
“আমি যখন অস্তিত্বের মাঠের দিকে তাকাই,
প্রেমের একটি মাত্র দানা খুঁজে পাই; বাকি সব শুধুই খড়।”
মা ভালোবাসার আরেক নাম , আর ভালোবাসা (বিষয়টি) মায়ের মাধ্যমেই প্রকাশ করা যায়।
মায়ের যতই বর্ণনা করা হোক না কেন, তা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। মাকে নিয়ে লিখা যেকোনো রচনা আমাদের অসীম অক্ষমতারই প্রকাশ। একজন ব্যক্তি ধনী হোক বা দরিদ্র, দাস হোক বা রাজা, পুরুষ বা নারী, মুসলিম বা অমুসলিম, পূর্বের বা পশ্চিমের— প্রত্যেকের মা মা-ই হন। বিশ্বস্ত বর্ণনাকারীরা বর্ণনা করেছেন যে,
যখন দেশ ভাগ হয়ে গেল, ঘৃণার বীজ বোনা হলো,
রক্তের নদী বইলো, তখনও পাকিস্তানে যে মা ছিলেন, সেই একই মা ছিলেন ভারতে।
প্রত্যেক পূর্ণতা অর্জিত হয়; প্রচেষ্টার মাধ্যমে মানুষ আবদাল, কুতুব ও গৌস হতে পারে এবং প্রতিটি অবস্থান থেকে উচ্চতর অবস্থানে পৌঁছাতে পারে। কিন্তু মাতৃত্ব, যা সকল পূর্ণতার উৎস এবং সকল অবস্থানের ঊর্ধ্বে, এটি স্বতঃসিদ্ধ এবং একমাত্র আল্লাহর বিশেষ উপহার, যা কেবল নারীদের জন্য নির্ধারিত। জ্ঞানী ও বিজ্ঞ ব্যক্তিরা একমত যে পুরুষ যত কিছুই করুক না কেন, মা হতে পারে না। কুরআনের এই কথাই এ বিষয়ে চূড়ান্ত : “ليس الذكر كالأنثى” (পুরুষ কখনো নারীর মতো নয়)। একবার শহরের এক উপদেশক (ওয়াজি) প্রবল আবেগে বলেছিলেন: নারী খলিফা হতে পারে না। আমি বললাম: বাহ, কী সুন্দর বললেন! যে মা হতে সাহস করে, তার চোখে তুচ্ছ জিনিস কীভাবে মোহিত করতে পারে! যোগ্যতা সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সাহস অনুযায়ী নির্ধারিত।
চোখে সেই বিন্দু আছে,
যা কখনো মুক্তো হয়ে ওঠেনি।
শোনা যায় যে, মায়ের পায়ের নিচে জান্নাত। আর এটাও বলা হয় যে, মায়ের চেয়ে সুন্দর আর কোনো কবিতা নেই:
“আমার শৈশব ছিল, আমার ঘর ছিল, আমার খেলনা ছিল,
আর মায়ের ছায়াটাও যেন ছিল এক কবিতার মতো।”
আমি ছিলাম মায়ের প্রথম সন্তান, এবং তিনি আমাকে গভীরভাবে ভালোবাসতেন। কেউ হয়তো বলবে, “এটা কি লিখার মতো কথা? প্রত্যেক মা তার সন্তানকে ভালোবাসে।” সত্য, তবে যদি কেউ বোঝে যে আল্লাহ সবাইকে মা দিয়েছেন, তবুও প্রত্যেকেই তার নিজের মায়ের কথা বলে। মা সম্পর্কে বললে গভীর ভালোবাসার কথাও আসবে।
:: সময় নিঃশব্দে চলে যায়। মায়ের কোলের ওপর লাফানো, তার হাত ধরে হাঁটা, তাকে হারানোর ভয়ে কাঁদা—সব কিছু কেমন যেন অতীত হয়ে গেছে। শৈশব কি এত তাড়াতাড়ি দূর স্মৃতি হয়ে গেল? সেই সময় কি আর ফিরে আসবে না?
“কোথায় পাব সেই কোমল হৃদয়, যা এখন হারিয়ে গেছে?
কোথায় পাব সেই নিষ্পাপ অনুভূতি?”
প্রতিদিন সকালে, যখন মা রুটি এবং সবজি তৈরি করতেন, আমি তার পাশে চুলার কাছে বসে কুরআনের পাঠ করতাম। যখন সবক ভালোভাবে মুখস্থ হয়ে যেতো , আমি মাদ্রাসায় যেতাম। মায়ের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি: কুরআন পড়া, উর্দু পড়া এবং, এর চেয়েও বেশি, ধৈর্য এবং কৃতজ্ঞতা শিখেছি। যখন আমি জিয়াউল উলুম মাদ্রাসায় ভর্তি হলাম, তখন খুব ভোরে বের হতাম। মা ফজরের নামাজের আগে আমার নাশতা প্রস্তুত করতেন এবং দুপুরের জন্য খাবার প্যাক করতেন। তিন বছর জিয়াউল উলুমে এবং আরও তিন বছর মাওলানা আজাদ শিক্ষা কেন্দ্রে পড়েছি। আজাদে পড়াশোনা একটু দেরিতে শুরু হতো, কিন্তু তার রুটিনে কখনো পরিবর্তন হতো না। বৃষ্টি হোক বা ঠান্ডা, তিনি আমাকে সবসময় প্রস্তুত করতেন, কখনো অসুস্থতা বা ক্লান্তির কথা বলতেন না।
আল্লাহ আমার হৃদয়ে জ্ঞানের ভালোবাসা বসিয়েছিলেন, তাই কখনো স্কুলে যেতে বিরতি দিইনি। অসুস্থ থাকলেও মাদ্রাসায় যেতাম। আত্মীয়-স্বজনের বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতাম না, আর আমার জন্য মা-ও বাড়িতে থাকতেন। সবাই উৎসবে যেতো, আর আমি আর মা বাড়িতে একা থাকতাম।
আমার পড়ার প্রতি আগ্রহ ছিল; যা পেতাম পড়তাম। মায়ের কাছে একটি খাতা ছিল যাতে বিভিন্ন ধরণের কবিতা লেখা ছিল, যা শেষ পর্যন্ত আমার হয়ে গেল। পড়ে শেষ করতাম, আবার শুরু করতাম, যতক্ষণ না সেই খাতা পুরোনো হয়ে গেল। পাতাগুলো একের পর এক ছিঁড়ে গেল, এবং একদিন সেই খাতাটির আর কোনো চিহ্ন রইল না।
মা আমাকে কখনো মারেননি বা বকা দেননি । আমার কোনো কথায় কষ্ট পাননি। আমার মনে আছে, জীবনে যদি কোনো সরল ভালোর কথা মনে থাকে, তবে তা এই যে আমি কখনো মায়ের অবাধ্যতা করিনি বা তাকে কোনো কষ্ট দেইনি। তাকে সবসময় আমার ভবিষ্যতের জন্য উদ্বিগ্ন হতে দেখেছি। মাঝেমধ্যে বলতেন, “তুমি মাওলানা হলে কীভাবে জীবিকা নির্বাহ করবে?” তবু তিনি আনন্দিত ছিলেন যে আমি পরিবারের অন্য সকলের তুলনায় পড়াশোনায় বেশি মনোযোগী ছিলাম। আল্লাহর ইচ্ছায় একদিন মাওলানা হলাম, এবং এই উপলব্ধি থেকে কখনো দুঃখ পাইনি, আর মা-ও কখনো দুঃখ পাননি। আমি সর্বদা আল্লাহর কৃতজ্ঞ যে তিনি আমাকে তার কিতাব বোঝার সৌভাগ্য দিয়েছেন।
আমাদের গ্রামের মহিলারা চারদেয়ালের মধ্যে থাকতেন। মায়ের ক্ষেত্রেও তা-ই ছিল। তিনি একা কোথাও যেতে পারতেন না। তার জীবন সীমাবদ্ধ ছিল বাড়ির চৌহদ্দির মধ্যেই। তবে তিনি প্রার্থনা করতেন, রোজা রাখতেন, রমজানে কয়েকবার কুরআন শেষ করতেন। তিনি দুইবার হজ করেছেন, এবং প্রতিবারই আমি তার সাথে ছিলাম। একবার হজের সময় তিনি কয়েকটি রিয়াল চেয়েছিলেন। আমি জিজ্ঞাসা করেছিলাম, “আপনি তো কখনো নিজে কিছু কিনতে যান না, তাহলে রিয়াল দিয়ে কী করবেন?” তিনি বললেন, “পথে যারা অসহায় অবস্থায় থাকে, তাদের সাহায্য করতে চাই।” তার এই কথা আমার হৃদয়ে গভীর অনুভূতির জন্ম দিয়েছিল, এবং আজও সেই কথা আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
তার বড় গুণ ছিল তিনি কখনো কারো সমালোচনা করতেন না। গৃহবধূরা তার বিপরীত; তাদের মধ্যে অনেকেই চুপ থাকতে পারেন না, আর চুপ থাকার ইচ্ছাও করেন না। মা তাদের সাথে কথা বলতে গিয়ে নীরবে তাদের কথা শুনতেন। তিনি তাদের কথায় না সমর্থন করতেন, না বিরোধিতা করতেন।
ইংল্যান্ডে থাকার প্রথম দিকে নিয়মিত তাকে চিঠি লিখতাম, তিনিও আমাকে চিঠি লিখতেন। একবার ঈদের পরে লিখেছিলাম যে, ঈদ নামাজ পড়ে ঘরে ফিরে আপনার কথা মনে পড়ছিল, সবকিছু যেন শূন্য মনে হচ্ছিল। তার উত্তর এসেছিল: “তোমাকে ছাড়া কিছুই ভালো লাগছিল না।”
যখন আমি ইংল্যান্ড থেকে বাড়ির উদ্দেশ্যে যাত্রা করতাম, তখন মা খাওয়া ছেড়ে দিতেন। যখন পৌঁছাতাম, তার আনন্দের সীমা থাকত না। তিনি আমার পছন্দের খাবার তৈরি করতেন। আমি তার বিছানার পাশে শুয়ে থাকতাম। আমাদের কথোপকথন কমই হতো; আমাদের ভালোবাসার বাঁধন ছিল নীরবতায়।
যেদিন আমার ফিরে আসার দিন আসত, সেদিনটি বিষাদের হত। তার মুখের শান্ত চেহারা ও নীরবতা গভীর অনুভূতির জন্ম দিত। যখন আমি বাড়ি থেকে বের হতাম, মনে হতো যেন ভালোবাসার পৃথিবী ছেড়ে যাচ্ছি।
মায়ের মৃত্যু হয় শুক্রবারের রাতে, ১৪ জিলকদ ১৪৩৪ হিজরিতে, যখন আমি তার থেকে দূরে ছিলাম। তিনি চলে গেলেন, আর জীবন বদলে গেল। কয়েকদিন পরে দেশে ফিরলাম; শুধু বাড়ি নয়, পুরো গ্রাম যেন শূন্য। পরে তার কবরের পাশে দাঁড়ালাম, আমরা দুজনেই নীরব ছিলাম। একসময় না বললেও চোখের মাধ্যমে কথোপকথন হতো, আর এখন সেই কথোপকথনও নেই।
ফুলগুলো মনমরা, ঘাসগুলো বিষন্ন ,
মোমবাতি ফুলের মতো, পালকগুলো দুঃখিত।
গোরস্তানে নিঃসঙ্গ মৃতদের অবস্থায় হৃদয় ভরে গেল।