AkramNadwi

ভারতীয় উপমহাদেশে মসনবির অধ্যয়ন ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/5864

بسم الله الرحمن الرحيم.

মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি (৬০৪/১২০৭ – ৬৭২/১২৭৩) শুধু ফারসি সাহিত্যের একজন মহান কবিই ছিলেন না, বরং তাঁর চিন্তাধারা ও দর্শন সারা বিশ্বে আধ্যাত্মিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনের সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় উপমহাদেশেও মাওলানা রুমির শিক্ষার গভীর প্রভাব পড়েছে, যেখানে তাঁর ধারণাগুলো সুফি, আলেম, কবি এবং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে বিশেষ স্থান করে নিয়েছে। তাঁর মসনবিকে প্রাচ্যে “দ্বিতীয় কোরআন” হিসেবে মর্যাদা দেওয়া হয়েছে:

مثنوى مولوى معنوى
هست قرآں در زبان پهلوى
এতে কোনো সন্দেহ নেই যে মসনবিকে কোরআনের মর্যাদা দেওয়া বা একে কোরআনের সমতুল্য গণ্য করা অতিরঞ্জন। আল্লাহর কিতাব সম্পূর্ণ পথনির্দেশিকা, কিন্তু মসনবি কোনো পথনির্দেশিকা নয়। মাওলানা রুমি কেবল অনুভূতি ও আধ্যাত্মিক আবেগের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মানুষকে ঈমান ও আমল থেকে দূরে সরিয়ে দেননি; বরং ঈমানে যে বিচ্যুতি দর্শন ও কালামের কারণে এসেছিল এবং আমলে যে অতিরঞ্জন ফিকহের কারণে সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করেছেন এবং ঈমান ও আমলের মূল উদ্দেশ্য—আল্লাহর দিকে পৌঁছার ব্যাখ্যা দিয়েছেন। মাওলানা রুমি অনুভূতি ও আবেগের ভিত্তিতে কোনো সম্প্রদায়ের ভিত্তি স্থাপন করেননি, বরং মিল্লাতে ইবরাহিম ও সুন্নাতে মুস্তফাকে শক্তিশালী করার জন্য প্রেম ও ভালোবাসার আহ্বান জানিয়েছেন।

|| আলেমদের ওপর রুমির প্রভাব :

ভারতীয় উপমহাদেশে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ফারসি ভাষার প্রচলন ছিল, এবং এর মাধ্যমেই মাওলানা রুমির চিন্তাধারা এখানকার আলেমদের কাছে পৌঁছায়। দিল্লি সালতানাত (১২০৬-১৫২৬ খ্রি.) এর সময় আলেমদের মধ্যে মাওলানা রুমির কবিতার প্রতি আগ্রহের নানা দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। মোগল আমলে (১৫২৬-১৮৫৭ খ্রি.) ফারসি ভাষা ও সুফি সাহিত্যের আরও বিস্তার ঘটে। মোগল সম্রাট আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের সময় আলেম ও সুফিরা গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে মাওলানা রুমির মসনবি পাঠ ও অধ্যয়ন করতেন। সে সময় রাজদরবারে ফারসি সাহিত্য পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করত এবং বিভিন্ন জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সাহিত্যিক আসর বসত, যেখানে মসনবির শেরের ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ উপস্থাপন করা হতো।

মোগল আমলে মসনবির পাঠ রাজদরবার ও বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল। মোল্লা আব্দুল কাদির বদায়ুনি ও ফৈজি’র মতো বিদ্বানরা ফারসি সাহিত্যকে বিস্তৃত করেছেন এবং মসনবিকে তাসাউফের মৌলিক উৎস হিসেবে গ্রহণ করেছেন। আওরঙ্গজেবের আমলেও সুফিবাদের শিক্ষা গুরুত্ব পেয়েছিল এবং মসনবির অধ্যয়ন খানকাহ ও মাদরাসায় ব্যাপকভাবে প্রচলিত ছিল।

রুমির দর্শনে প্রেম ও সহনশীলতা মৌলিক স্থান অধিকার করে, যা ভারতীয় উপমহাদেশে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর কবিতার বার্তা ছিল, ধর্ম ও বিশ্বাসের সীমানা অতিক্রম করে মানুষকে ভালোবাসা ও নৈতিকতার পথে চলতে হবে। এই চিন্তাধারা ভারতীয় উপমহাদেশের বিভিন্ন মহলে প্রসার লাভ করেছে।

সুফি দর্শনের পরিসরে :
দিল্লি সালতানাত ও মুঘল আমলে জ্ঞান ও তাসাওউফের মধ্যে যথেষ্ট সামঞ্জস্য বজায় ছিল। তবে যাদের মধ্যে তাসাওউফের প্রভাব বেশি ছিল, তাদের মধ্যে মসনবী অধ্যয়নের প্রতি অধিক মনোযোগ দেখা যেত। সুফি সাধকরা শুধু মাওলানা রূমির চিন্তাগুলোকেই গ্রহণ করেননি, বরং তা সাধারণ মানুষের মধ্যেও প্রচার করেছেন। পীর-মাশায়েখগণের মধ্যে যেমন হযরত নিজামুদ্দিন আউলিয়া, আমীর খসরু প্রমুখ মাওলানা রূমির শিক্ষা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিলেন। সুফি তরীকা, বিশেষত চিশতিয়া ও কাদেরিয়া তরীকায় মাওলানা রূমির আদর্শ বাস্তব রূপ লাভ করে।

মাওলানা রূমির দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আসল প্রেম (আশেকে হাকিকি), যা উপমহাদেশের সুফি কবিদের, যেমন খাজা গুলাম ফারিদ, বুল্লে শাহ, শাহ আবদুল লতীফ ভিটাই প্রমুখের রচনায় স্পষ্ট প্রতিফলিত হয়েছে। তাদের কবিতায় সেই একই ভালোবাসা, ঐক্য ও মানবপ্রেমের বার্তা পাওয়া যায়, যা মাওলানা রূমির কাব্যে বিদ্যমান।

মসনবী পাঠের প্রতি যে মনোযোগ হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী (১৮১৭-১৮৯৯) দিয়েছিলেন, তার পূর্বে এমন দৃষ্টান্ত পাওয়া কঠিন। হাজী সাহেব ছিলেন প্রসিদ্ধ সুফি সাধক ও চিশতিয়া তরীকার অন্যতম প্রধান ব্যক্তি। তিনি মাওলানা রূমির মসনবীর প্রতি গভীর অনুরাগ পোষণ করতেন এবং ফারসি ভাষায় তাঁর বিশেষ দক্ষতা ছিল। তিনি মসনবী ব্যাখ্যা ও শিক্ষাদানে পারদর্শী ছিলেন। তাঁর খলিফা ও মুরিদগণ তাঁর নিকট থেকে মসনবীর পাঠ গ্রহণ করতেন। তিনি মসনবীর পাঠদানকালে এর গভীর আধ্যাত্মিক ব্যাখ্যা ও তত্ত্ব তুলে ধরতেন।

হাজী ইমদাদুল্লাহর মসনবীপ্রেম ও এর শিক্ষা তাঁর নিজস্ব রচনা ও আধ্যাত্মিক শিক্ষায়ও প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর গ্রন্থ “মসনবী তোহফাতুল উশশাক” তারই সুস্পষ্ট প্রমাণ, যা তাঁর মসনবীর প্রতি গভীর অনুরাগ ও এর অন্তর্নিহিত অর্থের উপলব্ধির প্রতিচ্ছবি। এছাড়াও তাঁর অন্যান্য গ্রন্থ, যেমন “জিয়াউল কুলুব” ও “গিজায়ে রূহ” গ্রন্থেও মসনবীর প্রভাব

সুস্পষ্টভাবে অনুভূত হয়।

হাজী সাহেবের প্রধান খলিফা ছিলেন মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গোহী। তাঁর উপর সুন্নাহ ও হাদিসের প্রভাব ছিল গভীর। তিনি হাজী সাহেবের মসনবীর পাঠদান পছন্দ করতেন না, বরং এর ব্যাখ্যার সমালোচনাও করতেন।

মাওলানা আশরাফ আলী থানভী (১৮৬৩-১৯৪৩) একদিকে যেমন মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গোহীর নিকট থেকে উপকৃত হয়েছিলেন, অন্যদিকে সুফিবাদী প্রবণতায় তিনি তাঁর শায়খ হাজী ইমদাদুল্লাহর অধিক নিকটবর্তী ছিলেন। তাঁর ভাষণ ও মালফুজাতে মসনবীর থেকে উপকৃত হওয়ার দৃষ্টান্ত সুস্পষ্টভাবে বিদ্যমান। তিনি এর একটি ব্যাখ্যাগ্রন্থও রচনা করেছেন, যা “কালীদে মসনবী” নামে পরিচিত।

মাওলানা থানভী তাঁর এই ব্যাখ্যাগ্রন্থে মসনবীর শেরসমূহের ব্যাখ্যা প্রদান করেছেন, পাশাপাশি তাদের পটভূমি, কুরআনের আয়াত, হাদিস ও সুফি কাহিনির উদ্ধৃতি দিয়ে গভীর ও জটিল অর্থগুলোকে স্পষ্ট করেছেন। তিনি ফারসি শেরগুলোর উর্দু অনুবাদও পেশ করেছেন, যাতে যারা ফারসি জানেন না, তারাও এই অর্থগুলো থেকে উপকৃত হতে পারেন। তাঁর এই প্রচেষ্টা উর্দু ভাষায় মসনবীর অন্যতম বৃহৎ ও বিশদ ব্যাখ্যাগ্রন্থ হিসেবে গণ্য হয়। মাওলানা থানভী তাঁর ভূমিকায় লিখেছেন:

“আজকাল বেশিরভাগ শ্রেণির মানুষের মধ্যে মাওলানা রূমির মসনবীর প্রতি এক বিশেষ আগ্রহ দেখা যায়, তবে শিল্প সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে তারা প্রায়শই এর বিষয়বস্তু বুঝতে ভুল করে। যেহেতু এর ব্যাখ্যা ও টীকা গ্রন্থগুলো সাধারণত হয় খুব দীর্ঘ, নয়তো খুব গভীর, আবার কিছু ব্যাখ্যা মূল বিষয় থেকে দূরে সরে যায়, অথবা শরয়ি নীতির পরিপন্থী হয়ে ওঠে, তাই এগুলোকে চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হিসেবে গ্রহণ করা সম্ভব হয় না। এজন্য প্রয়োজন ছিল এমন একটি সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা, যা সহজ ভাষায় মূল বিষয়টি তুলে ধরবে এবং যাতে অবান্তর বা ভ্রান্ত ব্যাখ্যা স্থান পাবে না। আল্লাহর নামে আমি এ কাজ শুরু করছি এবং এর নাম রাখছি কালীদে মসনবী” (কালীদে মসনবী ১/২, মুতবা মুহাম্মদী কানপুর)।

এই ব্যাখ্যাগ্রন্থটি সম্পূর্ণরূপে সুফিবাদী ও আধ্যাত্মিক দৃষ্টিকোণ থেকে রচিত হয়েছে। এতে মসনবীর সাহিত্যিক মূল্যায়নের প্রতি কোনো দৃষ্টি দেওয়া হয়নি, এবং মাওলানা রূমির কাব্যের বিষয়ে কোনো সমালোচনামূলক আলোচনা করা হয়নি।

বিশদ বিশ্লেষণমূলক অধ্যয়ন:

মৌলানা রূমীর জীবন ও তাঁর কবিতা ও বার্তার সমালোচনামূলক ও অন্তর্দৃষ্টিপূর্ণ অধ্যয়নের জন্য সর্বোত্তম গ্রন্থ হল আল্লামা শিবলীর “সওয়ানেহ্‌ মৌলানা রূমী”। আল্লামা শিবলী নোমানী (১৮৫৭-১৯১৪) ছিলেন ব্রিটিশ ভারত উপমহাদেশের একজন বিশিষ্ট ইসলামী পণ্ডিত, ঐতিহাসিক, শিক্ষাবিদ এবং সাহিত্যিক।

“সওয়ানেহ্‌ মৌলানা রূমী” দুটি ভাগে বিভক্ত। প্রথম ভাগে লেখক মৌলানা রূমীর জীবনের বিভিন্ন দিক বিশদভাবে আলোচনা করেছেন। তিনি মৌলানার শৈশব, শিক্ষাদীক্ষা, আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা এবং তাঁর শিক্ষাগুরু ও পীর-মুর্শিদদের সম্পর্কে তথ্য প্রদান করেছেন। এই অংশে মৌলানার ব্যক্তিত্ব, তাঁর আচার-আচরণ এবং আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতাসমূহের উপরও আলোকপাত করা হয়েছে।

দ্বিতীয় ভাগে শিবলী “মসনভী মাআনভী”র বিশদ পর্যালোচনা উপস্থাপন করেছেন। তিনি মসনভীর বিভিন্ন বিষয়বস্তু, শৈলী এবং এর সাহিত্যিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আলোচনা করেছেন। এছাড়াও, তিনি মসনভীর কবিতার ব্যাখ্যা ও এর অর্থ স্পষ্ট করেছেন। শিবলী মসনভীকে আকাইদ ও কালামের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করেছেন এবং এর অন্তর্নিহিত হিকমত ও দর্শন তুলে ধরেছেন।

শিবলী প্রথম লেখক যিনি মসনভীর কালামসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্যগুলো স্পষ্ট করেছেন। আল্লামা সৈয়দ সুলায়মান নদভী লেখেন:
“মসনভী শরীফ হাজার হাজার লক্ষ মানুষ পড়েছেন, এর বহু ব্যাখ্যা লেখা হয়েছে, কিন্তু (যতদূর জানা যায়) একে শুধুমাত্র তাসাউফের গ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই সূক্ষ্ম অন্তর্দৃষ্টি কেবল আল্লামা শিবলীর দৃষ্টির জন্য সংরক্ষিত ছিল যে, মসনভী মাআনভী হল কালামের ক্ষেত্রেও এক অনন্য সংকলন।” (হায়াতে শিবলী, পৃ. ৩৭৬)।

শিবলী নোমানীর গবেষণা শৈলী একদিকে প্রজ্ঞাপূর্ণ, অপরদিকে সমালোচনামূলক। মৌলানার কবিতা সম্পর্কে শিবলীর মন্তব্য চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের মতো—
“মৌলানার প্রকৃত কবিত্ব ছিল না, এই কারণে তাঁর কবিতায় সেই স্বাভাবিক প্রবাহ, সাবলীলতা, শব্দের গাঁথুনি ও সৌন্দর্য পাওয়া যায় না, যা প্রতিষ্ঠিত কবিদের কবিতায় দেখা যায়। অনেক ক্ষেত্রে দুর্লভ ও অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে, অতিরিক্ত সংযোজন (ইযাফাত) যা কাব্যরীতিতে ন্যূনতম ছোটখাটো ত্রুটি বলে বিবেচিত হয়, তা মৌলানার কবিতায় এত বেশি পরিমাণে আছে যে, পড়ার সময় ক্লান্তি বোধ হতে পারে। ভাষাগত জটিলতারও বহু উদাহরণ দেখা যায়। তবে, শত শত, বরং হাজারো কবিতা এমনও আছে, যা স্বচ্ছতা, সাবলীলতা ও আকর্ষণের দিক থেকে অতুলনীয়।”

মৌলানা রূমী একজন মুজাদ্দিদ ও সংস্কারক হিসেবে:

মৌলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী (১৯১৩-১৯৯৯) তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “তারীখে দাওয়াত ও আজীমত”-এ মুজাদ্দিদ ও সংস্কারকদের আলোচনার পাশাপাশি মৌলানা রূমীর আলোচনা করেছেন।

এই গ্রন্থে মৌলানা রূমীর জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে, যেমন তাঁর শৈশব, শিক্ষাদীক্ষা, আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা এবং রচনাবলী। মৌলানা নদভী রূমীর শিক্ষার পর্যালোচনা করতে গিয়ে তাঁর “ফলসফায়ে ইশ্‌ক ও মহব্বত” (ভালোবাসা ও প্রেমের দর্শন) বিষয়ে বিশদ আলোচনা করেছেন। তিনি মসনভী মাআনভীর বিভিন্ন উপকথা ও কবিতার ব্যাখ্যা দিয়ে তার গভীর অন্তর্নিহিত অর্থ ব্যাখ্যা করেছেন। পাশাপাশি, তিনি রূমীর শিক্ষার তুলনামূলক বিশ্লেষণ করেছেন অন্যান্য সুফি, দার্শনিক ও কালামের স্কলারদের চিন্তার সাথে।

সপ্তম হিজরি শতাব্দীতে দর্শন ও কালামের নেতিবাচক প্রভাব পর্যালোচনা করার পর মৌলানা নদভী লেখেন:
“এমন পরিস্থিতিতে মুসলিম বিশ্বকে এমন এক উচ্চতর ও শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের প্রয়োজন ছিল, যিনি হৃদয়ের ব্যথা ও চিন্তার গভীরতা—এই দুই বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে সমৃদ্ধ হবেন। যাঁর জন্য বুদ্ধিবৃত্তিক সমুদ্র সহজসাধ্য হয়ে উঠেছে, এবং বাহ্যিক শব্দ ও আকারের মায়াজাল ভেঙে গেছে। যিনি তাঁর প্রেমের উত্তাপ ও অন্তরের জ্বলন দ্বারা এই জমে যাওয়া মুসলিম সমাজে নতুন প্রাণ সঞ্চার করতে সক্ষম হবেন, এবং এই চিন্তার জগতে ভালোবাসার শিঙ্গা বাজাতে পারবেন। যিনি এমন এক নতুন কালামশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন করবেন, যা কেবলমাত্র প্রতিপক্ষের যুক্তির মোকাবিলা বা বিরুদ্ধবাদীদের জব্দ করার জন্য থাকবে না, বরং তা মনের সংকীর্ণতা দূর করবে, হৃদয়ের গিঁট খুলবে এবং মানুষকে প্রশান্তি, ঈমান ও নিশ্চিত বিশ্বাস দ্বারা পরিপূর্ণ করবে।

এই ব্যক্তিত্ব ছিলেন মৌলানা জালালউদ্দিন রূমী, যাঁর মসনভী ছিল ঐতিহ্যগত কালামের অতিরিক্ততা ও বুদ্ধিবৃত্তিক অহংকারের বিরুদ্ধে এক প্রতিবাদ, বরং এক যুদ্ধের ঘোষণা। এবং এমন এক নতুন কালামশাস্ত্রের ভিত্তি স্থাপন, যা পরিবর্তনশীল মুসলিম বিশ্বের জন্য অত্যন্ত জরুরি ছিল।” (তারীখে দাওয়াত ও আজীমত, ১/৩৩৭)।

রূমির ধারা:

রূমির আধ্যাত্মিক কাব্যের ধারাবাহিকতা যদি কোথাও খুঁজে পাওয়া যায়, তবে তা হল আল্লামা ইকবালের কবিতায়। আল্লামা মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭ – ১৯৩৮) ব্রিটিশ ভারত উপমহাদেশের এক বিশিষ্ট কবি, দার্শনিক ও চিন্তাবিদ ছিলেন। তার কবিতায় মাওলানা রূমির প্রভাব স্পষ্টভাবে অনুভব করা যায়। ইকবাল মাওলানা রূমিকে তার আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকার করেছিলেন এবং তার শিক্ষা থেকে গভীর দিকনির্দেশনা লাভ করেছিলেন।

ইকবাল তার কবিতায় বহু স্থানে মাওলানা রূমির উল্লেখ করেছেন এবং তাকে “পীর রূমী” ও “মুরশিদ” (গুরু) উপাধিতে ভূষিত করেছেন। “ইস্রারে খুদী” কাব্যে তিনি মাওলানা রূমিকে তার পথপ্রদর্শক হিসেবে স্বীকার করে বলেন:

پیر رومی خاک را اکسیر کرد
از غبارم جلوہ ہا تعمیر کرد

(পীর রূমী মৃত মাটিকে পরিণত করলেন মহামূল্যে,
তিনি আমার ধূলিকণাকে রূপ দিলেন এক মহিমান্বিত জ্যোতিতে।)

এখানে ইকবালের কিছু নির্বাচিত কবিতা তুলে ধরা হলো, যা থেকে বোঝা যায়, তিনি রূমির মহত্ত্বের কতটা গভীরভাবে স্বীকৃতি দিয়েছেন:

نه اٹها پهر كوئى رومى عجم كے لاله زاروں سے
وہى آب وگل ايراں، وہى تبريز ہے ساقى

(আর কোনো রূমী জন্ম নিল না আজমের প্রস্ফুটিত প্রান্তর থেকে,
ইরানের সেই মাটি-জল এখনো আছে, এখনো আছে সেই তবরিজ, ও সাকি।)

مقام ذكر كمالات رومى وعطار
مقام فكر مقالات بو على سينا
مقام فكر ہے پيمائش زمان ومكاں
مقام ذكر ہے سبحان ربي الأعلى

(উপযুক্ত স্থান রূমী ও আত্তারের গুণাবলি স্মরণ করার,
উপযুক্ত স্থান বু আলী সিনার দর্শন ও আলোচনা করার।
চিন্তার স্থান হলো সময় ও স্থানের পরিমাপ,
আর জিকিরের স্থান হলো— ‘সুবহানা রাব্বিয়াল আ’লা’।)

شرح او كردند اورا كس نديد
معنئ او چوں غزال از ما رميد
رقص تن از حرف او آموختند
جسم را از رقص جاں بردوختند

(তারা তার ব্যাখ্যা করল, কিন্তু তাকে কেউই দেখল না,
তার অর্থ হরিণের মতো আমাদের কাছ থেকে পালিয়ে গেল।
তার বাক্য থেকে দেহের নৃত্য শিক্ষা নিল,
কিন্তু আত্মার রকসের মাধ্যমে দেহকে একসূত্রে গেঁথে দিল।)

صحبت پير روم سے مجهـ پر ہوا يه راز فاش
لاكهـ حكيم سر بجيب ايكـ كليم سر بكف

(পীর রূমীর সাহচর্যে আমার সামনে এই রহস্য প্রকাশ পেল,
লাখো দার্শনিক মগ্ন থাকে চিন্তায়, আর এক কালিম (নবী) থাকে আত্মসমর্পণে প্রস্তুত।)

پير رومى مرشد روشن ضمير
كاروان عشق ومستى را امير
منزلش بر تر زماه وآفتاب
خيمه را از كہكشاں سازد طناب

(পীর রূমী, উজ্জ্বল হৃদয়ের মুর্শিদ,
প্রেম ও আত্মমত্ততার কাফেলার নেতা।
তার গন্তব্য চাঁদ ও সূর্যের চেয়েও উচ্চ,
তার তাঁবুর রশি বানানো হয় তারকা থেকে।)

نور قرآن درميان سينه اش
جام جم شرمنده از آئينه اش

(তার বুকের মাঝে জ্বলছে কুরআনের আলো,
জামে-জাম (জামের পেয়ালা) তার আয়নার সামনে লজ্জিত।)

از نئے آن نے نواز پاكـ زاد
باز شورے در نہاد من فتاد

(তার বাঁশির সেই পবিত্র সুরে,
আবারও আমার হৃদয়ে নতুন এক আন্দোলন সৃষ্টি হলো।)

هم خو گر محسوس ہيں ساحل كے خريدار
اكـ بحر پر آشوب وپر اسرار ہے رومى

(আমরা সবাই চোখে দেখা জিনিসের অভ্যস্ত ক্রেতা,
কিন্তু রূমী হলেন এক উত্তাল ও রহস্যময় সাগর।)

تو بهى ہے اسى قافلۂ شوق ميں اقبال
جس قافلۂ شوق كا سالار ہے رومى

(তুমিও সেই ভালোবাসার কাফেলার যাত্রী, হে ইকবাল,
যার নেতা হলেন রূমী।)

اس عصر كو بهى اس نے ديا ہے كوئى پيغام
كہتے ہيں چراغ ره احرار ہے رومى

(এই যুগকেও তিনি কোনো বার্তা দিয়েছেন,
লোকেরা বলে, মুক্তচিন্তার পথের প্রদীপ হলেন রূমী।)

——————

# ইসলামী দর্শন ও চিন্তাধারা #ইতিহাস ও জীবনচরিত

মূল :
ড. মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *