AkramNadwi

বাড়ির বাইরে নারীদের পর্দা ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/5712

بسم الله الرحمن الرحيم.

|| প্রশ্ন:
মুম্বাইয়ের অধ্যাপক হিনা ফাতিমা সৈয়দ সাহিবা প্রশ্ন করেছেন: বাড়ির বাইরে নারীদের পর্দা কী? এবং গায়র মাহরাম পুরুষদের সঙ্গে মেলামেশার সীমানা কী?

||উত্তর:
নারী ও গায়র মাহরাম পুরুষদের মধ্যে মেলামেশার নির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে, যা ব্যক্তিগত এবং পাবলিক স্থান অনুযায়ী কিছুটা ভিন্ন। এই নীতিমালার বিস্তারিত নিম্নরূপ:

|| ব্যক্তিগত স্থান (Private Space):
নারীরা তাদের ঘরে সাধারণ পোশাকেই থাকতে পারেন, এবং সেখানে তাদের জন্য বড় চাদর পরা বাধ্যতামূলক নয়। যেহেতু নারীরা ঘরের ভেতরে বড় চাদর পরেন না, তাই গায়রে মাহরামদের তাদের এ অবস্থায় ঘরে প্রবেশ করা বা তাদের দেখা অনুমোদিত নয়। যদি কোনো গায়রে মাহরাম পুরুষ ঘরে আসেন, তবে তাদের নিম্নলিখিত নির্দেশনা মেনে চলা উচিত:

১. যদি কোনো পুরুষকে অন্যের ঘরে প্রবেশ করতে হয়, তবে তাকে প্রথমে অনুমতি নিতে হবে। অনুমতি চাওয়ার মাধ্যমে ঘরের নারীরা সতর্ক হয়ে পর্দার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পারবেন।

২. যদি কোনো অপরিচিত পুরুষ বিশেষ কোনো কারণে আসেন এবং তাকে ঘরে প্রবেশের অনুমতি না দেওয়া হয়, তবে তাকে দরজার বাইরে থেকেই কথা বলতে হবে এবং নিজের দৃষ্টি নত রাখতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
“তোমরা যখন তাদের (নবীর স্ত্রীদের) কাছে কোনো কিছু চাও, তখন পর্দার আড়াল থেকে চাও। এটি তোমাদের হৃদয়ের জন্য এবং তাদের হৃদয়ের জন্য অধিক পবিত্র।”
— (সূরা আহযাব, আয়াত ৫৩)

৩. কোনো পুরুষের জন্য এমন স্থানে অপরিচিত নারীর সঙ্গে নির্জনে থাকা নিষিদ্ধ যেখানে অন্য কেউ অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করতে পারে না।
হজরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“কোনো পুরুষ যেন কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে না থাকে, তবে শর্ত হলো তার কোনো মাহরাম সঙ্গে থাকতে হবে।”
— (সহিহ বুখারি, কিতাবুন নিকাহ, باب لا يخلون رجل بامرأة …)
এই বিষয়টি নিয়ে অসংখ্য সহিহ হাদিস রয়েছে এবং এই বিষয়ে সকল ফকিহদের ঐকমত্য রয়েছে।

৪. যদি কোনো কারণে অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে কোনো নারীর নির্জনতা ঘটে বা বাধ্য হয়ে এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়, তবে আল্লাহকে স্মরণ করা উচিত, তাঁর সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত এবং পাপ থেকে বাঁচতে যা সম্ভব তা করা উচিত।
কুরআনুল কারিমে হজরত ইউসুফ (আ.)-এর কাহিনির উল্লেখ রয়েছে, যা তাকওয়া ও ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত। সেই কাহিনি সবসময় মনে রাখা উচিত।

|| জনসমাগম স্থানে (Public Space):
নারীরা তাদের ব্যক্তিগত ও সামাজিক প্রয়োজন মেটানোর জন্য ঘর থেকে বাইরে যাওয়ার অনুমতি পেয়েছেন। উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর স্ত্রী হযরত সওদা বিনতে যাম‘আহ (রা.) রাতের বেলায় কোনো প্রয়োজনে বাইরে বের হয়েছিলেন। হযরত উমর (রা.) তাকে দেখে চিনতে পেরে বললেন, “আল্লাহর কসম! হে সওদা! তুমি আমাদের থেকে গোপন থাকতে পারো না।”
হযরত সওদা (রা.) ফিরে এসে এ কথা রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে জানান। রাসূলুল্লাহ (সা.) তখন আমার ঘরে খাবার খাচ্ছিলেন এবং হাতে মাংসযুক্ত একটি হাড় ধরে ছিলেন। ঠিক সেই মুহূর্তে তাঁর উপর ওহি নাজিল হয়। যখন ওহির অবস্থা শেষ হয়, তখন তিনি (সা.) বললেন:
“হে নারীগণ! তোমাদের প্রয়োজন মেটানোর জন্য বাইরে যাওয়ার অনুমতি আল্লাহ দিয়েছেন।”
(সহিহ বুখারি, কিতাবুন নিকাহ, باب خروج النساء إلى حوائجهن)

|| জনসমাগম স্থান ব্যবহারের শর্তাবলি:
নারীদের ঘর থেকে বের হয়ে জনসমাগম স্থানে যাওয়ার অনুমতি এ শর্তে দেওয়া হয়েছে যে তারা নামাজের সময় যে ধরনের পর্দা করে, সেভাবেই নিজেদের ঢেকে রাখবে। এর পাশাপাশি উপর থেকে জিলবাব বা ঢিলেঢালা কোনো কাপড়ও ব্যবহার করবে।
আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“হে নবী! আপনার স্ত্রীগণ, কন্যাগণ এবং মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন নিজেদের চাদর নিজেদের উপর টেনে নেয়। এটি তাদের চিনে নেওয়ার জন্য এবং যেন তাদের কষ্ট না দেওয়া হয়। আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, দয়ালু।”
— (সূরা আহযাব, আয়াত ৫৯)

বাইরে যাওয়ার সময় নারীদের এ কথাও খেয়াল রাখা উচিত যে তারা এমন কোনো সুগন্ধি ব্যবহার করবে না, যা পুরুষদের আকৃষ্ট করে।
হযরত জয়নাব (রা.), যিনি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.)-এর স্ত্রী ছিলেন, বর্ণনা করেন যে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
“তোমাদের মধ্যে কেউ যখন মসজিদে যায়, তখন যেন কোনো সুগন্ধি ব্যবহার না করে।”
— (সহিহ মুসলিম, কিতাবুস সালাত, باب خروج النساء إلى المساجد)
এ জাতীয় আরও অনেক হাদিস অন্যান্য সাহাবায়ে কেরাম (রা.) থেকেও বর্ণিত রয়েছে।

|| পুরুষদের দৃষ্টি নত রাখা উচিত:
যখনই পুরুষরা জনসমাগম স্থানে নারীদের সঙ্গে মিলিত হয় বা তাদের দেখে, তাদের দৃষ্টি নত রাখা উচিত এবং নারীদের সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় স্থানে কামনার দৃষ্টিতে দেখা থেকে বিরত থাকা উচিত।

আল্লাহ তাআলা কুরআনে বলেন:
“মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে। এটি তাদের জন্য অধিক পবিত্র। নিশ্চয় আল্লাহ তাদের কার্যকলাপ সম্পর্কে সম্যক অবগত।”
— (সূরা নূর, আয়াত ৩০)

|| নারীদেরও দৃষ্টি নত রাখা উচিত:
এভাবে, যখন নারীরা জনসমাগম স্থানে পুরুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বা তাদের দেখে, তখন তাদের দৃষ্টিও নত রাখা উচিত এবং পুরুষদের সৌন্দর্য বা আকর্ষণীয় স্থানে কামনার দৃষ্টিতে দেখা থেকে বিরত থাকা উচিত।
আল্লাহ কুরআনে বলেন:
“আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি নত রাখে এবং তাদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।”
— (সূরা নূর, আয়াত ৩১)

|| পরস্পর সালাম বিনিময়:
পুরুষদের জন্য অনুমতি রয়েছে যে তারা নারীদের সালাম দিতে পারে এবং নারীদের জন্যও অনুমতি রয়েছে যে তারা পুরুষদের সালাম দিতে পারে। সালামের ব্যাপারে সকল নির্দেশনা সাধারণ এবং পুরুষ-নারী উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। এ বিষয়ে নির্দিষ্ট হাদিসও বর্ণিত হয়েছে।
হযরত আসমা বিনতে ইয়াজিদ (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সালাম দেন।
— (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল আদব, باب في السلام على النساء)
হযরত জারীর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) একদল নারীর পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় তাদের সালাম দেন।
— (মুসনাদ আহমদ ইবনে হাম্বল, মুসনাদ জারীর)

ইমাম বুখারী তার সহিহ গ্রন্থে একটি অধ্যায় সংকলন করেছেন “পুরুষদের নারীদের সালাম দেওয়া এবং নারীদের পুরুষদের সালাম দেওয়া”, যেখানে তিনি কিছু হাদিসের মাধ্যমে এ বিষয়ে দলিল পেশ করেছেন।

|| হাত মেলানো:
গায়রে মাহরাম পুরুষ এবং নারীদের একে অপরের সঙ্গে হাত মেলানো, স্পর্শ করা, আলিঙ্গন করা বা চুম্বন করার অনুমতি নেই।
হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত:
“রাসূলুল্লাহ (সা.) কখনও কোনো নারীর গায়ে হাত দেননি।”
— (সহিহ বুখারি, কিতাবুত তালাক, باب إذا أسلمت المشركة والنصرانية; সহিহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, باب كيفية بيعة النساء)

এ বিষয়ক অন্যান্য হাদিসও বর্ণিত হয়েছে। তবে কিছু আলেম গায়রে মাহরাম বৃদ্ধ নারীদের সঙ্গে হাত মেলানোর অনুমতি দিয়েছেন, বিশেষত যদি ফিতনার আশঙ্কা না থাকে।
— (তুহফাতুল ফুকাহা, পৃষ্ঠা ৫৬৯; হিদায়া ৭/১৯৮)

|| সর্বজনীন স্থানে কথোপকথন:
মসজিদ, শ্রেণিকক্ষ বা অফিসের মতো সর্বজনীন স্থানে প্রয়োজন অনুসারে কথা বলার ক্ষেত্রে কোনো আপত্তি নেই। কোরআনে হজরত মূসা (আঃ)-এর বোনের উল্লেখ রয়েছে, যিনি অন্যান্য পুরুষদের সাথে কথা বলেছিলেন:
“তিনি (মূসার মাতা) তার বোনকে বললেন, ‘তাকে অনুসরণ করো।’ ফলে সে দূর থেকে তাকে দেখল, অথচ তারা জানত না।” (সূরা আল-কাসাস: আয়াত ১১-১২)।
একইভাবে কোরআনে হজরত মরিয়ম (আঃ)-এর উল্লেখ রয়েছে, যিনি তার জাতির পুরুষদের সাথে কথা বলেছিলেন।

|| প্রয়োজনমতো নারীদের সাহায্য করা:
গায়রে মাহরাম পুরুষরা নারীদের সাহায্য করতে পারে, যদি উদ্দেশ্য শুদ্ধ থাকে। কোরআনে হজরত মূসা (আঃ)-এর উল্লেখ রয়েছে, যিনি দুই নারীর সাহায্য করেছিলেন:
“যখন তিনি মাদইয়ান-এর পানির কাছে পৌঁছালেন, তখন সেখানে একটি দলকে পানি পান করাতে দেখলেন এবং তাদের থেকে দূরে দুই নারীকে দেখলেন যারা তাদের পশুগুলোকে আটকে রেখেছিল। তিনি বললেন, ‘তোমাদের কী হয়েছে?’ তারা বলল, ‘আমরা পানি তুলতে পারি না যতক্ষণ না রাখালরা চলে যায়, এবং আমাদের পিতা খুব বৃদ্ধ।’ ফলে তিনি তাদের জন্য পানি তুলে দিলেন এবং তারপর ছায়ায় চলে গেলেন।” (সূরা আল-কাসাস: আয়াত ২৩-২৪)।

|| নারীদের পুরুষদের খেলা দেখা:
নারীদের পুরুষদের খেলা দেখার অনুমতি আছে, যদি খারাপ উদ্দেশ্য না থাকে। হজরত আয়েশা (রাঃ) বর্ণনা করেন যে, নবী (সাঃ) তাকে আবিসিনীয়দের খেলা দেখতে দিয়েছিলেন। এটি সহীহ বুখারি ও মুসলিমে উল্লেখিত একটি বিখ্যাত হাদিস।

|| মসজিদে যাওয়া:
নারীরা মসজিদে গিয়ে নামাজ আদায় করতে পারেন এবং পুরুষরা তাদের এতে বাধা দিতে পারে না। সহীহ বুখারি ও মুসলিমের একটি বর্ণনায় হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রাঃ)-এর থেকে নবী (সাঃ)-এর এই বক্তব্য উল্লেখ করা হয়েছে:
“তোমরা নারীদের আল্লাহর মসজিদে যেতে বাধা দিয়ো না।”
(এই বিষয়ে আমার একটি বই দেখুন)।
একইভাবে নারীরা শিক্ষা গ্রহণের জন্য বাইরে যেতে পারেন। আমি এই বিষয়টি একটি প্রবন্ধে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করেছি। তা দেখার জন্য অনুরোধ রইল।
———-

> মূল :
ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড।
> অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *