প্রকৃত শিক্ষা ও তরবিয়ত।
——————–
ভোপালের একজন সম্মানিত শিক্ষিকা ও দাঈয়া, ফিদা বিনতে আশফাক সাহিবা নিম্নলিখিত প্রশ্ন করেছেন:
|| প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।
শাইখ! একজন মা হিসেবে আমাদের অভিজ্ঞতা হলো, যখন আমরা সন্তানদের কোনো কাজ করতে বলি, তখন বারবার বলতে হয়। কখনো আমরা চিৎকার করি, বকাঝকা করি, কখনো আবার মারধোরও হয়ে যায়। সন্তানদের দিয়ে আমাদের কথা মানানো খুব কঠিন হয়ে পড়ে। কখনো তাদের কোনো পুরস্কারের লোভ দেখাতে হয়, কখনো ভয় দেখাতে হয়।
শাইখ! আমরা কী করতে পারি, যাতে সন্তান নিজেরা কাজ করে? কীভাবে তাদের ভেতরের “অন্তর্নিহিত কম্পাস” জাগ্রত করা যায়? কীভাবে তাদের শেখানো যায়, যাতে তারা নিজেরাই বুঝতে পারে কোনটা তাদের জন্য ভালো আর কোনটা ক্ষতিকর? যেন আমরা স্ক্রিন বা অন্য ক্ষতিকর জিনিস তাদের কাছ থেকে জোর করে কেড়ে না নেই, বরং তারা নিজেরাই বলে—”আমি এটা করব না”, অথবা নিজেরাই বলে—”বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে যাওয়ার চেয়ে পড়াশোনাকে অগ্রাধিকার দেবো।”
আমরা এটা কীভাবে করতে পারি? অনুগ্রহ করে আমাদের দিকনির্দেশনা দিন।
আমার দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, যখন সন্তানরা মাদরাসা বা একাডেমিতে থাকে, তখন শিক্ষকদের ভয়ে বা পুরস্কারের আশায়, কিংবা শাস্তি এড়ানোর জন্য তারা নামাজ, রোজা, পর্দা ইত্যাদি পালন করে। কিন্তু বাসায় এসে তা করে না, অথবা একা হলে তার কোনো প্রভাব থাকে না। একজন শিক্ষক হিসেবে আমরা কী করতে পারি? দয়া করে আমাদেরকে পথ দেখান।
|| উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ও বারাকাতুহু।
আপনার দুটি প্রশ্নই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, আর এর মধ্যেই সন্তান লালন-পালন ও শিক্ষা-দানের আসল সারকথা নিহিত রয়েছে।
অভিভাবকদের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হলো—সন্তানরা তাৎক্ষণিকভাবে তাদের কথা মেনে নেয় না। সাধারণত দেখা যায়, বাবা-মা বারবার বলেন, বকাঝকা করেন, চিৎকার করেন, কখনো পুরস্কারের লোভ দেন, কখনো ভয় দেখান। এতে মনে হয় সন্তান কথা মানছে, কিন্তু আসলে তার অন্তরে কোনো স্থায়ী পরিবর্তন আসে না। এই আনুগত্য কেবল তখনই টিকে থাকে, যতক্ষণ পুরস্কার বা ভয় টিকে থাকে। যখন সেই চাপ বা লোভ কেটে যায়, সন্তান আবার আগের অবস্থায় ফিরে যায়।
আসল উদ্দেশ্য হলো, সন্তান যেন নিজের ভেতর থেকে, নিজের বোধ-বিবেক ও ঈমানের আলোতে বুঝে নেয় কোনটা তার জন্য উপকারী আর কোনটা ক্ষতিকর। যখন সে অন্তরের গভীর থেকে বিশ্বাস করে নেবে যে স্ক্রিনে সময় নষ্ট করা তার স্বাস্থ্য, চোখ ও শিক্ষার জন্য ক্ষতিকর, কিংবা নামাজ কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয় বরং অন্তরের শান্তি, হৃদয়ের আলো ও আল্লাহর নৈকট্যের মাধ্যম—তখন আর তাকে কেউ বলতে হবে না। সে নিজেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেবে, আর তখনই তার জীবন সঠিক পথে অগ্রসর হবে এবং সে দৃঢ়তা ও প্রজ্ঞার সাথে নেক কাজে অবিচল থাকবে।
এখানে শিক্ষার আসল অর্থ বুঝতে হবে। শিক্ষা মানে শুধু এই নয় যে শিক্ষক বা অভিভাবক সন্তানকে কিছু নিয়ম-কানুন মুখস্থ করিয়ে দিলেন। মনে রাখবেন—যা বোঝানো হয়নি, তা শেখানো হয়নি। আর যে বিষয় শিশু বুঝতে পারেনি, সে তা শিখেনি। মুখস্থ নির্ভর শিক্ষা মৃত শিক্ষা—যার কোনো প্রাণ নেই। এর মাধ্যমে না ঈমান জন্মায়, না আল্লাহর বন্দেগি, না ভরসা ও সাহায্য চাওয়ার মানসিকতা গড়ে ওঠে, আর না সন্দেহ-সংশয় দূর হয়।
প্রকৃত শিক্ষা হলো সেই শিক্ষা যা শিশুর বুদ্ধি ও চেতনা জাগিয়ে তোলে, চিন্তা-ভাবনার অভ্যাস গড়ে দেয়, গবেষণা ও গভীর চিন্তার দরজা খোলে এবং বিশ্লেষণ ও যুক্তির দক্ষতা প্রদান করে। এই শিক্ষা মানুষকে সত্যের অনুসন্ধানে প্রবৃত্ত করে। আর যখন মানুষ সত্যের সামনে মাথা নত করে চিন্তা করে, তখন তার চিন্তায় গভীরতা আসে, মনে দৃঢ়তা আসে এবং হৃদয়ে ঈমান জায়গা করে নেয়। এই ঈমানই তাকে ভিতর থেকে শক্তিশালী করে, তার চরিত্রকে পরিশীলিত করে।
তাই অভিভাবক ও শিক্ষকের আচরণ হওয়া উচিত নির্দেশ দেওয়ার চেয়ে প্রজ্ঞার সাথে বোঝানো। যদি চান সন্তান সময়ের মর্যাদা দিক, তবে তাকে বাস্তবভাবে দেখান সময় নষ্ট করার ক্ষতি কী। যদি চান সে খেলাধুলা ও পড়াশোনার মধ্যে ভারসাম্য রাখুক, তবে তার সাথে আলাপ করুন। তাকে জিজ্ঞেস করুন—আগামীকালের পরীক্ষায় সফল হওয়ার জন্য কোন কাজ বেশি উপকারী, আর ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কোন পথ বেছে নেওয়া উচিত। এই প্রশ্নোত্তর অনুশীলন তার ভেতরে ভাবার ও সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা তৈরি করবে।
এসবের সাথে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে ব্যবহারিক দৃষ্টান্ত। যদি অভিভাবক নিজেরাই সময়ের সঠিক ব্যবহার করেন, দিনকে শৃঙ্খলার সাথে কাটান, কুরআন-যিকরকে নিয়মিত করেন, প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেন এবং চরিত্রকে শোভিত করেন—তাহলে সন্তানরা নীরবে এসবই লক্ষ্য করে এবং নিজেদের মধ্যে আত্মস্থ করে নেয়। বাস্তব দৃষ্টান্ত শিক্ষা থেকে অনেক বেশি শক্তিশালী।