শিরোনাম : দ্বীনের খেদমতে আত্মবিশ্বাস ও বিনয়ের ভারসাম্য।
——————–
আমার ছাত্রী, জ্ঞান-সন্ধানী ও একনিষ্ঠ শিক্ষিকা নিলোফার আহমেদি আমাকে লিখেছেন:
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহ, প্রিয় উস্তায। আপনি মেহেরবানি করে সময় নিয়ে উত্তর দিন, আমি জানি আপনার সময় অত্যন্ত মূল্যবান। আল্লাহ তায়ালা আপনার সব প্রচেষ্টা তাঁর দ্বীনের জন্য কবুল করুন এবং তাতে অফুরন্ত বরকত দান করুন।
আমি কিছু প্রশ্ন নিয়ে ভাবছিলাম, যা আমি আপনার সঙ্গে শেয়ার করতে চাই—
প্রশ্ন ১
আমরা কীভাবে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে কাজ করব, একইসাথে অহংকার থেকে বাঁচব, যেন অহংকারের ভয় আমাদের দ্বীনের খেদমত করা থেকে পিছিয়ে না দেয়?
উত্তর:
এটি একটি অত্যন্ত চিন্তাশীল প্রশ্ন এবং এটি এমন এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের দিকে ইঙ্গিত করছে, যা প্রতিটি মুমিনকে রক্ষা করার চেষ্টা করতে হয়।
কোনো অর্থবহ খেদমতের জন্য আত্মবিশ্বাস অপরিহার্য। আল্লাহ তায়ালা আমাদের প্রত্যেককে কিছু না কিছু যোগ্যতা দান করেছেন, আর সেগুলোকে চেনা এবং দ্বীনের খেদমতে কাজে লাগানোই হলো আমাদের আমানত। যদি নিজের সামর্থ্যে ন্যূনতম আত্মবিশ্বাস না থাকে, তবে মানুষ দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং পিছিয়ে যায়—ফলে তেমন কিছুই সম্পাদিত হয় না। শিক্ষা দেওয়া, পথনির্দেশ করা, এমনকি দৈনন্দিন দায়িত্বগুলোও পালন করতে আত্মবিশ্বাসের প্রয়োজন। বরং আত্মবিশ্বাসকে তাওয়াক্কুলের অংশ হিসেবেই দেখা যায়—আমরা আল্লাহর ওপর ভরসা করি যে, তিনি আমাদের যা দিয়েছেন তাই আমাদের করণীয় কাজের জন্য যথেষ্ট।
তবে মুমিনকে অহংকার ও গর্ব (কিবর) থেকে সবসময় সজাগ থাকতে হবে। এর সুরক্ষা হলো এই উপলব্ধিতে যে, এসব ক্ষমতা স্বয়ং নিজের সৃষ্টি নয়, বরং আমাদের রবের দান। আল্লাহ তায়ালা বলেন: “তোমাদের যা কিছু নেয়ামত আছে, সবই আল্লাহর পক্ষ থেকে।” (নাহল: ৫৩) এই সত্যকে অন্তরে ধারণ করা এবং সর্বদা শোকর আদায় করা হলো অহংকারের রোগ থেকে সবচেয়ে নিশ্চিত প্রতিকার। শোকর মানুষের হৃদয়কে আত্মগর্ব থেকে সরিয়ে নিয়ে যায় এবং আল্লাহর অনুগ্রহ বিনয়ের সঙ্গে স্বীকার করতে শেখায়।
তাহলে বোঝা গেল, আত্মবিশ্বাস ও বিনয় আসলে বিপরীত নয়, বরং পরস্পরের সঙ্গী। আত্মবিশ্বাস মানুষকে কাজ করতে প্রেরণা দেয়, আর বিনয় তাকে মনে করিয়ে দেয়—এ কাজ কেবল আল্লাহর তাওফিকেই সম্ভব। রাসূলুল্লাহ ﷺ ছিলেন মানবজাতির মধ্যে সর্বাধিক আত্মবিশ্বাসী তাঁর দায়িত্ব পালনে, তবুও তিনি ছিলেন সর্বাধিক বিনয়ী। কখনো সফলতাকে নিজের কৃতিত্ব হিসেবে দেখেননি, বরং সবসময় তা তাঁর রবের প্রতি সমর্পণ করেছেন।
শেষে মনে রাখতে হবে, গর্ব ও অহংকার দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী রোগ। কিয়ামতের দিন এগুলোর কোনো স্থান থাকবে না, কারণ সব সৃষ্টিই তখন তাদের রবের সামনে বিনত হয়ে দাঁড়াবে। তাই মুমিনের দায়িত্ব হলো দৃঢ়তার সঙ্গে কাজ করা, কিন্তু প্রতিটি অর্জনকে শোকর ও স্মরণে আল্লাহর সঙ্গে যুক্ত রাখা। এভাবে আত্মবিশ্বাস পরিণত হয় ইবাদতে, অহংকারে নয়।
প্রশ্ন ২
পেশাগত বা ধর্মীয় কাজে আমরা কীভাবে আমাদের যোগ্যতা ও অবদান এমনভাবে প্রকাশ করতে পারি, যাতে তা উপকারী হয় অথচ আত্মপ্রশংসা মনে না হয়?
উত্তর:
এই প্রশ্নটি খুবই প্রচলিত, বিশেষ করে ধর্মীয় ও পেশাগত সেবার ক্ষেত্রে, যেখানে অনেকে ভয় পান নিজের দক্ষতার কথা বললে তা আত্মপ্রশংসার মতো মনে হতে পারে। এ সমস্যার সমাধান হলো দুটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা—
“আকমাল” (যিনি বেশি দক্ষ/যোগ্য) এবং “আফদাল” (যিনি বেশি মর্যাদাবান/সওয়াবের অধিকারী)।
প্রথমত, কারও কাছে যদি এমন দক্ষতা বা যোগ্যতা থাকে যা অন্যদের উপকারে আসে, তবে পরিস্থিতি যখন দাবি করে তখন সেটি প্রকাশ করা শুধু বৈধই নয়, বরং প্রশংসনীয়ও। উদাহরণস্বরূপ, আমি যদি দক্ষ কারিগর বা শিক্ষক হই এবং সমাজে কেউ নির্দেশনা চাইছে—কে সবচেয়ে উপযুক্ত সে দায়িত্ব পালনে—তাহলে আমার কর্তব্য হলো স্পষ্টভাবে নিজের যোগ্যতা জানানো। এটি অহংকার নয়, বরং আমানতের অংশ। কারণ এমন প্রেক্ষাপটে নিজের ক্ষমতা গোপন করা মানে মানুষকে সেরা সেবাবঞ্চিত করা।
কুরআনে এ বিষয়ে আমাদের উদাহরণ দিয়েছেন নবী ইউসুফ (আলাইহিস সালাম)। তিনি স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন: “আমাকে দেশের ভাণ্ডারসমূহের দায়িত্ব দাও; আমি একজন জ্ঞানী ও বিশ্বস্ত রক্ষক।” (ইউসুফ: ৫৫) এখানে তিনি স্পষ্ট করে নিজের যোগ্যতার কথা বলেছেন, কারণ জনগণের কল্যাণ তার ওপর নির্ভরশীল ছিল।
দ্বিতীয়ত, কোনো ক্ষেত্রে বেশি যোগ্য হওয়া মানেই আল্লাহর কাছে বেশি মর্যাদাবান হওয়া নয়। শিক্ষা, কারিগরি, কিংবা দুনিয়াবি ও ধর্মীয় দক্ষতার যেকোনো বিষয়ই আসলে ক্ষমতা, প্রশিক্ষণ ও পরিশ্রমের ফল। কিন্তু প্রকৃত মর্যাদা কেবল আল্লাহ তায়ালা-ই জানেন, যিনি অন্তর ও নিয়তের বিচারক। কোনো ব্যক্তি হয়তো নির্দিষ্ট কাজে কম দক্ষ, তবুও তিনি আল্লাহর কাছে অনেক বেশি নিকটবর্তী হতে পারেন সেই ব্যক্তির চেয়ে, যার দুনিয়াবি যোগ্যতা অসাধারণ। তাই আমরা নিজেদের যোগ্যতা মানুষের কল্যাণে প্রকাশ করতে পারি, তবে কখনোই সেটিকে আল্লাহর কাছে তাকওয়া বা মর্যাদার শ্রেষ্ঠত্বের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলতে পারি না।
অতএব ভারসাম্য নির্ভর করে নিয়তের ওপর। যদি কেউ নিজের দক্ষতা অন্যদের উপকার ও প্রয়োজন পূরণের জন্য প্রকাশ করে, তবে সেটি ইবাদতেরই একটি রূপ, আত্মপ্রশংসা নয়। কিন্তু যদি তা অহংকার থেকে আসে, কিংবা মানুষের অন্তরে মর্যাদা অর্জনের আকাঙ্ক্ষা হয়, তবে তা নিন্দনীয়। এজন্য মুমিনকে সবসময় নিয়তকে পবিত্র রাখার চেষ্টা করতে হবে—
প্রয়োজনমতো নিজের যোগ্যতা প্রকাশ করা, সফলতাকে আল্লাহর দান হিসেবে স্বীকার করা, আর মনে রাখা যে প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্ব নির্ধারিত হয় দক্ষতায় নয়, বরং তাকওয়ায়।
এইভাবে মানুষ পেশাগত ও ধর্মীয় উভয় ক্ষেত্রেই আন্তরিক ও উপকারীভাবে অংশ নিতে পারে, আত্মপ্রশংসার ফাঁদে না পড়ে।
——————–
ক্যাটাগরি : আখলাক, তাজকিয়াহ
—-
✍️ মূল রচনা: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড
✍️ অনুবাদ, যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ
—
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/7040