বৃহস্পতিবার, ১২ জমাদিউল আউয়াল, ১৪৪৬ হিজরি
✍️ লিখেছেন: ড. মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
بسم الله الرحمن الرحيم
বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আমি দারুল উলুম আল-সালামের ইফতা বিভাগের ছাত্রদের জন্য আল্লামা ইবনু আবেদীনের “শরহু রসমুল মুফতি” আলোচনা করেছিলাম। প্রথমে সাহাবি ও তাবেঈনদের মধ্যে মুফতিদের বিষয় নিয়ে কথা বলি, যারা কেবল কুরআন, হাদিস এবং অল্প পরিমাণে রায়ের ওপর নির্ভর করতেন। এরপর এমন মুফতিদের আলোচনা করি যারা নিজেদের এলাকার আলেমদের অনুসরণ করতেন, যেমন মদীনা, কুফা এবং বসরার আলেমরা। তারপর এমন মুফতিদের আলোচনা করি যারা নির্দিষ্ট মুজতাহিদ ব্যক্তিত্বদের অনুসরণ করতেন। এরপর আসেন মুফতিরা, যারা নির্দিষ্ট মাযহাব মেনে চলতেন। শেষে পরবর্তী যুগের তাকলিদকারী মুফতিদের আলোচনা করি। ইবনু আবেদীন এই শেষ শ্রেণির অন্যতম একজন প্রতিভাবান ছিলেন।
আমি শাখা-প্রশাখা ও অংশবিশেষে নসখের (বাতিলের) ধারণা বুঝিয়ে দেই এবং রায় ও ফতোয়া প্রদানের ক্ষেত্রে কঠোরতার সমালোচনা করি।
রাত ৮টা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি থাকতেই আমি স্ট্যানস্টেড বিমানবন্দরের উদ্দেশ্যে রওনা দেই। উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফতোয়া অ্যান্ড রিসার্চের ৩৫তম অধিবেশনে যোগদান করা। এই অধিবেশন তুরস্কের কুনিয়া শহরে ১৪-১৮ জমাদিউল আউয়াল ১৪৪৬ হিজরিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। আমার পরিবার এবং শ্বশুর ফয়জুল্লাহ আমাকে বিমানবন্দরে পৌঁছে দেন। সেখানে আমি রাত সাড়ে ৯টায় পৌঁছি। বিমানবন্দর প্রায় খালি ছিল, ফলে প্রক্রিয়া কয়েক মিনিটেই শেষ হয়ে যায়। আমি সেখানে বসে নিজের কাজ করছিলাম।
আমার কাছে মনে হয়, জ্ঞানার্জন ও শিক্ষাদানের কাজগুলো আমাকে টানছে, এবং দাওয়াহ ও লেখালেখির কাজগুলোও আমাকে আকর্ষণ করছে। কিন্তু আমার জীবন থেকে সময় এমনভাবে ফুরিয়ে গেছে যেন তা বিদায় নিয়ে চলেছে, আর মৃত্যু যেন আমার কাছে অত্যন্ত নিকটবর্তী। হায়! যদি আমি ইবাদত ও আনুগত্যের প্রতি মনোযোগ দিতাম! যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয়ে নিজের অন্তরকে পবিত্র করে এবং তাঁর সন্তুষ্টির জন্য প্রচেষ্টা চালায়, সেই মানুষ ফেরেশতাদের মতো।
হায় আফসোস! হায় দুঃখ! কুরআনের উপদেশ বা নসীহত আমার হৃদয়কে শান্ত করতে পারেনি। আমি যেন এমন কোনো আলামতের অপেক্ষায় আছি, যা আমাকে আমার প্রস্থান দিবসের প্রস্তুতির দিকে ফিরিয়ে দেবে।
বিমান সময়মতো উড্ডয়ন করল, আর আমি পুরো পথ ঘুমালাম। ভোর সাড়ে ৫টায় উঠে ওজু করলাম এবং ৬টা বাজতে ৫ মিনিট বাকি থাকতেই নামাজ আদায় করলাম। পরে বিমান ইস্তানবুলের সাবিহা বিমানবন্দরে অবতরণ করলে আমাকে জানানো হয়, তখনো ফজরের সময় হয়নি। তাই আমি আবার ৭টা বাজতে ১৫ মিনিট বাকি থাকতেই নামাজ আদায় করি।
বিমানবন্দরে এক ব্রিটিশ মুসলিম যুবকের সঙ্গে দেখা হয়। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করি, সে কেন তুরস্কে এসেছে। সে জানায়, পরিস্থিতি জটিল হওয়ায় সে তুরস্কের নাগরিকত্ব পেতে চেষ্টা করছে। তার বাবা-মা ইস্তানবুলে বসবাস করছেন এবং ইতিমধ্যেই এখানে নাগরিকত্ব পেয়েছেন।
কুনিয়া যাওয়ার ফ্লাইট ধরার জন্য সময় খুব অল্প ছিল। আমি দ্রুতগতিতে এগিয়ে যাই, কিন্তু দেখা গেল অভ্যন্তরীণ ফ্লাইটের পথ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। আমাকে পাসপোর্ট চেকের অংশে এবং পরে অন্য একটি জায়গায় পাঠানো হয়। আমি ভয়ে ছিলাম, ফ্লাইট মিস হয়ে যাবে। অনেক কষ্টে ফ্লাইট ধরতে সক্ষম হই। আলহামদুলিল্লাহ।
ফ্লাইটে কিছু কাজ করলাম এবং পরে কুনিয়ার বিমানবন্দরে অবতরণ করলাম। মাওলানা জালালুদ্দিন রুমীর সুবাস যেন চারপাশে। বাইরে গিয়ে দেখি কিছু ভাই আমাকে স্বাগত জানাচ্ছেন। আমাদের কুনিয়া শহরের বাইরে একটি হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। বলা হলো, এটি আরামদায়ক এবং প্রাকৃতিক গরম পানির সুবিধা রয়েছে, যা মানুষের রোগ নিরাময়ের জন্য বিখ্যাত।
এটি আমার প্রথমবার কুনিয়া ভ্রমণ। এটি মাওলানা জালালুদ্দিন রুমীর শহর এবং তাঁর মাজার এখানেই অবস্থিত। আমি তাঁর “মসনবী”র প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত, যদিও আমি এর কিছু বিষয়ের তীব্র সমালোচক।
কুনিয়া দক্ষিণ আনাতোলিয়ার মধ্যভাগে অবস্থিত। ১০৫ হিজরিতে মরওয়ান বিন মুহাম্মদের নেতৃত্বে এটি মুসলমানরা বিজয় করেছিল। এটি সেলজুক সাম্রাজ্যের রাজধানী ছিল মঙ্গোল আক্রমণের আগ পর্যন্ত এবং পরে এটি উসমানীয় সাম্রাজ্যের অংশ হয়। এ শহরের এক গৌরবময় ইতিহাস রয়েছে।
মাওলানা জালালুদ্দিন রুমি ইবাদত ও সৌন্দর্যের প্রেমকে একত্র করেছেন। তিনি স্পষ্টতই আবুল আলা মা’য়ারির বক্তব্য খণ্ডন করেছেন:
“যদি বলা হয়, একজন যুবক সাধু এবং সে সৌন্দর্যের প্রেমে মত্ত, তবে সে সাধু নয়।”
আমার ইচ্ছা, মাওলানার মাজার পরিদর্শন করে তাঁর চিন্তা থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়া, যেমন কবি, সুফি ও সাধারণ মানুষ তাঁর কথাগুলো থেকে গ্রহণ করেছেন।
আমি দুই সম্মানিত আলেম, ড. জামাল বদরী এবং ড. ইসাম আল-বাশার-এর সঙ্গে হোটেলে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। পথে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারি বলে আমি আনন্দিত।