بسم الله الرحمن الرحيم
❝
লেখক: ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী
অক্সফোর্ড
———————–
যখন স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মতবিরোধ চরম পর্যায়ে পৌঁছে যায়, এবং সমঝোতার সব পথ বন্ধ হয়ে যায়, তখন তালাক একটি অনিবার্য বিচ্ছেদের মাধ্যম হয়ে ওঠে। কিন্তু আমরা সবাই জানি—একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া এই অনিবার্য পরিস্থিতির সমাধান নয়। বরং এর পেছনে থাকে নারীর অধিকার হরণ এবং তাদের অবমাননার মানসিকতা। এটি কুরআনের সেই সুস্পষ্ট নির্দেশনার পরিপন্থী, যেখানে পুরুষদের বলা হয়েছে তালাকের সময় ভদ্র আচরণ ও উত্তম চরিত্র বজায় রাখতে।
যেমন বিয়ের সময় ভালবাসা ও সদয় ব্যবহারের নিয়ম পালন করা আবশ্যক, ঠিক তেমনি রাগের বশবর্তী হয়ে ঘৃণাভরে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে দেওয়া আল্লাহর আদেশ থেকে বিমুখ হওয়া। এটি একটি অজ্ঞতাপূর্ণ ও অমানবিক কাজ, এবং মুসলমানদের মধ্যে পারস্পরিক দয়া ও ভালোবাসার নীতিমালার বিরোধিতা।
কুরআনে কোথাও একত্রে তিন তালাকের উল্লেখ নেই। হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—এই ধরণের তালাক কার্যকর নয় এবং তা এক তালাক হিসেবেই গণ্য হবে। হযরত উমর (রাযি.) কুরআন ও হাদীসকে বাতিল করেননি। এটা পরিষ্কার, কারণ নবী ব্যতীত কেউ ওহিভিত্তিক বিধান বাতিল করতে পারে না। বরং তিনি মুসলিম শাসক হিসেবে এই ঘৃণিত কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখতে শাস্তিস্বরূপ একসঙ্গে তিন তালাককে কার্যকর করেছিলেন। ফুকাহাগণও তাঁর অনুসরণে নিজেদের সময়ে এটিকে কার্যকর বলে বিবেচনা করেছেন।
তবে সব ফকীহ একমত—একসঙ্গে তিন তালাক দেওয়া ভুল কাজ এবং অনেকে এটিকে বিদআত পর্যন্ত বলেছেন। যখন ইসলাম প্রভাবশালী ছিল, তখন এ ধরণের শাস্তি উপযুক্ত ছিল এবং এটি বিদআত প্রতিরোধের একটি সঠিক উপায়।
আজ যদি মাঝে মাঝে কেউ এই ভুল তালাক দিত, তবে হয়তো তা নিয়ে উদ্বেগের কিছু ছিল না—কারণ দুনিয়ার সব আইনই কোনো না কোনো সময়ে অপব্যবহারের শিকার হয়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আজ তালাক বলতে অধিকাংশ মানুষই বোঝে—ঘৃণা ও অপমানসূচকভাবে একসঙ্গে তিন তালাক দিয়ে দেওয়া। যদি কোনো আইন বারবার এমনভাবে অপব্যবহৃত হয়, এবং এর ফলে সমাজে অপমান, কষ্ট ও অন্যায়ের সৃষ্টি হয়—তাহলে এমন আইনের মুসলমানদের কাছে কীই বা মর্যাদা থাকতে পারে?
হ্যাঁ, একটি ইসলামী আইনের প্রতীকী মূল্য থাকতে পারে, কারণ তা ধর্ম ও উম্মাহর প্রতিনিধিত্ব করে। কিন্তু আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা। যদি কোনো আইন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তাকে সংশোধন করা ধর্মীয় দায়িত্ব হয়ে যায়। বরং হয়তো এমন আইনের অস্থায়ী স্থগিতাদেশও প্রয়োগ করা উচিত, যতক্ষণ না তার প্রকৃত উদ্দেশ্য পরিষ্কার হয়, সে প্রেম-দয়ার পথ উন্মুক্ত করে, এবং যারা আইন প্রয়োগ করবে তারা যথাযথভাবে প্রস্তুত হয়।
এই বিষয়টি না বোঝার ফলে আজ হালালাহ নামক এক জঘন্য, ঘৃণিত ও নিন্দনীয় প্রথার জন্ম হয়েছে—যা কোনো ঈমানদার তো দূরের কথা, কোনো আত্মসম্মানসম্পন্ন মানুষও মেনে নিতে পারে না। এ কারণেই বহু মুসলিম দেশে একত্রে তিন তালাক রাষ্ট্রীয় আইনের বিরোধী ঘোষণা করা হয়েছে এবং এটিকে অকার্যকর বলে বিবেচনা করা হয়েছে।
যতক্ষণ না মুসলিম সমাজ থেকে অজ্ঞতা দূর হয়, নারীর প্রতি অবমাননা থামে, এবং মানুষ হালালার মতো অভিশপ্ত কাজে লিপ্ত হওয়া থেকে বিরত হয়—ততক্ষণ পর্যন্ত একসঙ্গে তিন তালাককে অকার্যকর মনে করা উচিত। বরং এমন স্বামীদের ওপর জরিমানা আরোপ করা উচিত। এটাই কুরআন ও সুন্নাহর প্রকৃত চেতনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং এর মাধ্যমেই ন্যায়বিচার, ইনসাফ ও ইহসান-এর মত চিরন্তন আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হয়।
———-
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।