AkramNadwi

তারা জিজ্ঞেস করল : এই পথের উপাদান ও ভিত্তিগুলো কী?

তারা জিজ্ঞেস করল : এই পথের উপাদান ও ভিত্তিগুলো কী?

আমি বললাম : এগুলো তিনটি; আর চতুর্থটি হলো, এই পথের প্রতীকসমূহ, যা এগুলোরই অন্তর্ভুক্ত। যেমন হজের প্রতিটি অঙ্গভঙ্গি তার অন্তর্নিহিত অর্থকে রীতির মধ্যেই জীবন্ত করে তোলে, তেমনি ইবরাহীমি পথও তার সুউচ্চ অর্থ ও মর্মকে নিজস্ব আচার ও প্রতীকের মধ্যেই প্রকাশ করে।

তারা বলল : সেগুলো কী ?

আমি বললাম : ইবরাহীমি পথের প্রথম উপাদানকে বলা হয় হানিফিয়্যাত।
এর সূচনা হয় সৃষ্টিজগতের প্রতি গভীর দৃষ্টি ও চিন্তাশীল মনন দিয়ে। এই মননের ফলেই মানুষ উপলব্ধি করে, সমগ্র সৃষ্টি নির্ভর করে আল্লাহর ওপর, যিনি পরম আশ্রয়দাতা , চিরঞ্জীব ও সব কিছুর ধারক। আল্লাহ ছাড়া আর কারও কোনো স্বতন্ত্র অস্তিত্ব নেই, কোনো স্থায়িত্ব নেই, সবকিছুই তাঁর মাধ্যমেই টিকে আছে। আল্লাহ ব্যতীত সবকিছু অবক্ষয়ের পথে যায়, অস্তমিত হয়।
হানিফিয়্যাতের এই পথ শেষ পর্যন্ত গিয়ে পৌঁছায়, অস্তমিত ও ক্ষয়িষ্ণু সব কিছুর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে সেই সত্তার দিকে সম্পূর্ণ ফিরে যাওয়ায়, যিনি কখনো অস্তমিত হন না।

ইবরাহীমের দুটি বাক্যে এই সত্যটি অনুপমভাবে প্রকাশ পেয়েছে,
“আমি অস্তমিত জিনিসকে ভালোবাসি না।” (সূরা আল-আন‘আম, ৬:৭৬)
“আমি একনিষ্ঠভাবে আমার মুখ ফিরিয়েছি তাঁর দিকে, যিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন; আর আমি কখনোই অংশীবাদীদের অন্তর্ভুক্ত নই।” (সূরা আল-আন‘আম, ৬:৭৯)

হজ হলো এই হানিফিয়্যাতেরই এক মহাযাত্রা, পার্থিব সম্পদ, পোশাক ও উপকরণসমেত দুনিয়ার প্রতি এক ধরণের নিরাসক্তি, এবং আল্লাহর দিকে হিজরত; যিনি সমগ্র জগতের রব।

ইবরাহীমি পথের দ্বিতীয় উপাদান হলো পরিপূর্ণ আত্মসমর্পণ—ইসলাম।
ইবরাহীমের তীক্ষ্ণ বুদ্ধি যখন তাঁকে হানিফিয়্যাতের পথে পৌঁছে দিল, তখন তিনি নিজের সমগ্র সত্তাকে রাব্বুল আলামিনের কাছে সঁপে দিলেন। এই আত্মসমর্পণের সর্ববৃহৎ প্রমাণ ছিল, তাঁর পুত্র ইসমাঈলকে কুরবানির জন্য প্রস্তুত হওয়া।

আল্লাহ বলেন,
“অতঃপর আমি তাকে এক সহনশীল পুত্রের সুসংবাদ দিলাম। যখন সে তার সঙ্গে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছাল, তখন ইবরাহীম তাকে বলল, ‘হে আমার পুত্র, আমি স্বপ্নে দেখছি যে আমি তোমাকে জবাই করছি; তুমি ভেবে দেখো, তোমার মত কী?’ সে বলল, ‘হে আমার পিতা, আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে তাই করুন। ইনশাআল্লাহ, আপনি আমাকে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন।’ অতঃপর যখন তারা উভয়ে আত্মসমর্পণ করল এবং ইবরাহীম তাঁকে কপাল মাটিতে রেখে শুইয়ে দিল। তখন আমি ডেকে বললাম, ‘হে ইবরাহীম, তুমি তোমার স্বপ্ন সত্যে পরিণত করেছ। নিশ্চয়ই এভাবেই আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দেই।’” (সূরা আস-সাফফাত, ৩৭:১০১–১০৫)

এই আত্মসমর্পণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ দুটি, সহনশীলতা (হিল্‌ম) এবং অটল ধৈর্য (সবর)।
হজ আল্লাহর কাছে বিশুদ্ধ আত্মসমর্পণের প্রতীক, ক্রোধ ও কামনা থেকে সংযম, এবং কষ্ট ও দুর্ভোগের মুখে অবিচল ধৈর্যের এক বাস্তব অনুশীলন।

ইবরাহীমি পথের তৃতীয় উপাদান হলো শিরিক থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি। এই পথ শিরিকের সামান্যতম ছাপ ও অপবিত্রতাকেও প্রত্যাখ্যান করে। ইবরাহীম ছিলেন একত্ববাদের অগ্রদূত ও শিরোমণি।

আল্লাহ বলেন,
“তাদের কাছে ইবরাহীমের কাহিনি বর্ণনা করো। তিনি যখন তার পিতা ও তার জাতিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কিসের ইবাদত করো?’ তারা বলল, ‘আমরা কিছু মূর্তির ইবাদত করি এবং তাদের সেবায় নিয়োজিত থাকি।’ তিনি বললেন, ‘তোমরা ডাকলে কি তারা শোনে? কিংবা তারা কি তোমাদের উপকার বা অপকার করতে পারে?’ তারা বলল, ‘না; তবে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের এভাবেই করতে দেখেছি।’ তখন ইবরাহীম বললেন, ‘তোমরা কি ভেবে দেখেছ, যাদের তোমরা ইবাদত করছ, তোমরা ও তোমাদের পূর্বপুরুষরা তারা সবাই আমার শত্রু, কেবল বিশ্বজগতের রব ছাড়া। তিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন এবং তিনিই আমাকে পথ দেখান; তিনিই আমাকে আহার ও পানীয় দেন; আমি অসুস্থ হলে তিনিই আমাকে আরোগ্য দেন; তিনিই আমাকে মৃত্যু দেবেন, আবার জীবিত করবেন; আর আমি আশা করি, কিয়ামতের দিন তিনিই আমার অপরাধ ক্ষমা করবেন।’
অতঃপর ইবরাহীম দোয়া করলেন:
“হে আমার রব, আমাকে প্রজ্ঞা দান করুন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সঙ্গে শামিল করুন।” (সূরা আশ-শু‘আরা, ২৬:৬৯–৮৩)

ইবরাহীমি পথের চতুর্থ উপাদান হলো এর প্রতীকসমূহ।
এর সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতীক হলো সম্মানিত কাবা এবং তার আশপাশের নিদর্শনসমূহ, সাফা, মারওয়া, আরাফাত ও অন্যান্য পবিত্র স্থান। এই প্রতীকগুলোই ইবরাহীমি পথের দেহী ও দৃশ্যমান রূপ।

হজ হলো এই প্রতীকগুলোর সাক্ষাৎ গ্রহণের যাত্রা, যেখানে মানুষ সব মানবিক সম্পর্ক ও বন্ধন ছিন্ন করে আসে। এই প্রতীকগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ হলো, বিশ্বের যে প্রান্তেই মুসলমান থাকুক না কেন, তার নামাজে ও তার মসজিদে সে তার মুখ ফেরায় মসজিদুল হারামের দিকেই।

তারা জিজ্ঞেস করল : ইসলামে হজের অবস্থান কী?

আমি বললাম: হজ হলো এই দ্বীনের পূর্ণতা, আর আল্লাহর অনুগ্রহের পরিসমাপ্তি।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *