AkramNadwi

জান্নাতে কি মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হবে? ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/5857

بسم الله الرحمن الرحيم


———————–

|| প্রশ্ন:

রিডিং, ইংল্যান্ডের বাসিন্দা, আমার বিশ্বস্ত ছাত্র জনাব শাযাম চৌধুরী সাহেব তাঁদের মসজিদের ইমামের মাধ্যমে নিম্নলিখিত প্রশ্ন করেছেন:

আসসালামু আলাইকুম শায়েখ,
কিছু লোক বলে যে জান্নাতে নারীরা ঘরের ভেতরে থাকবে, আর কেবল পুরুষেরা বাইরে যাবে। তাঁদের দলিল নিম্নরূপ:

1. আনাস ইবন মালিক রা. থেকে বর্ণিত, যে রাসূলুল্লাহ (ﷺ) বলেছেন:
“নিশ্চয়ই জান্নাতে একটি বাজার থাকবে, যেখানে প্রতি শুক্রবার পুরুষরা যাবে। সুগন্ধি বাতাস তাঁদের চেহারা ও পোশাকে ছড়িয়ে দেওয়া হবে, যার ফলে তাঁদের সৌন্দর্য ও রূপবর্ধন ঘটবে। তাঁরা তাঁদের স্ত্রীদের কাছে ফিরে আসবে, যখন তাঁদের সৌন্দর্য বৃদ্ধি পেয়ে যাবে। তখন তাঁদের স্ত্রীগণ বলবে: ‘আল্লাহর কসম! আপনার সৌন্দর্য ও রূপ বৃদ্ধি পেয়েছে!’ আর তাঁরা বলবে: ‘আল্লাহর কসম! তোমাদের সৌন্দর্য ও রূপও বৃদ্ধি পেয়েছে!'” (সহিহ মুসলিম ২৮৩৩)।

এই হাদিস থেকে বোঝা যায় যে পুরুষরা বাজারে যায়। তাহলে কি এর অর্থ এই যে, নারীরা তাঁদের পুত্র বা কন্যাদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না?

2. কুরআনের সূরা আর-রহমানের ৭২ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
“حور مقصورات في الخيام”,
অনুবাদ: “হুরগণ হবে তাঁবুর মধ্যে সংরক্ষিত।”
এর অর্থ কী? এটি কি বোঝায় যে নারীরা বাইরে যেতে পারবে না, অথবা পরিবারের সদস্য ও বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না?

3. সহিহ বুখারি ৩২৪৩-এ বর্ণিত হয়েছে:
আবদুল্লাহ ইবনে কায়েস আল-আশআরি রা. থেকে বর্ণিত, যে নবী করিম (ﷺ) বলেছেন:
“জান্নাতে একটি তাঁবু থাকবে, যা ফাঁপা মুক্তোর মতো হবে, যার দৈর্ঘ্য হবে তিরিশ মাইল। প্রতিটি কোণে পুরুষদের স্ত্রীরা থাকবে, যাদেরকে অন্য লোকেরা দেখতে পাবে না।”

এটির অর্থ কি এই যে, জান্নাতে নারীরা তাঁদের মা-বাবা, সন্তান কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না এবং কেবলমাত্র তাঁদের স্বামীকেই দেখতে পারবে?

আমি এই প্রশ্নটি করছি, কারণ আমি আমার মাকে অত্যন্ত ভালোবাসি এবং চাই যে, যদি আমরা দুজনেই জান্নাতে যাই, তাহলে আমি যেন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারি এবং তাঁর সঙ্গে সময় কাটাতে পারি।

|| উত্তর:

দুটি বিষয় ভালোভাবে মনে রাখা দরকার:

1. জান্নাতে কোনো ঘাটতি বা কোনো ধরনের বঞ্চনা থাকবে না। বরং প্রত্যেক মানুষ তার অন্তরের সমস্ত আকাঙ্ক্ষা পূরণ করবে। কুরআনে বলা হয়েছে:
“وفيها ما تشتهيه الأنفس وتلذ الأعين”
(সূরা যুখরুফ ৭১),
অর্থ: “সেখানে যা কিছু প্রাণ চায় এবং যা কিছু চোখ উপভোগ করে, তা থাকবে।”

2. দুনিয়ার মতোই আখিরাতেও মাহরাম ও নন-মাহরামের বিধান আলাদা হবে। জান্নাতি নারীরা, যদি তাঁদের স্বামীরা জান্নাতে প্রবেশ করে, তাহলে তাঁরা তাঁদের স্ত্রী হবে। একইভাবে, কুরআনে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, জান্নাতি ব্যক্তিদের সন্তানদের যদি মর্যাদাগত পার্থক্য থাকে, তবে অনুগ্রহস্বরূপ তাঁদের একত্রিত করে দেওয়া হবে:
“والذين آمنوا واتبعتهم ذريتهم بإيمان ألحقنا بهم ذريتهم”
(সূরা আত-তূর ২১),
অর্থ: “যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানরাও ঈমানের সঙ্গে তাদের অনুসরণ করেছে, আমরা তাদের সন্তানদের তাদের সঙ্গে যুক্ত করে দেব।”


আপনার উপস্থাপিত দলিলগুলোর ব্যাখ্যা:

1. প্রথম হাদিস (সহিহ মুসলিম ২৮৩৩):
এই হাদিসটি জান্নাতে পুরুষদের বাজারে যাওয়ার প্রসঙ্গে উল্লেখ করা হয়েছে, তবে এর অর্থ এই নয় যে নারীরা সেখানে যেতে পারবে না। জান্নাতে প্রত্যেক ব্যক্তির সুখ ও আকাঙ্ক্ষার পূর্ণ যত্ন নেওয়া হবে। সেখানে নারীদের জন্যও সর্বোৎকৃষ্ট নিয়ামত থাকবে। তারা নিজেদের ইচ্ছামতো যেখানে খুশি যেতে পারবে এবং যা ইচ্ছা তা করতে পারবে। এই হাদিস থেকে সর্বোচ্চ যা বোঝা যায়, তা হলো পুরুষদের জন্য আলাদা বাজার থাকবে। তবে এটি নারীদের জন্য পৃথক বাজারের অস্তিত্ব অস্বীকার করে না। কুরআন ও হাদিসের সাধারণ শিক্ষা থেকে ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, নারীদের জন্যও বিনোদন ও ভ্রমণের স্থান থাকবে। একইভাবে, পরিবারের সদস্যরা (নারী-পুরুষ উভয়ই) একসঙ্গে আনন্দ উপভোগ করতে পারবে।

2. সূরা আর-রহমানের ৭২ নম্বর আয়াত:
এই আয়াতটি হুরদের সম্পর্কে, যারা বিশেষভাবে জান্নাতে থাকবে। তাদের বৈশিষ্ট্য হবে যে, তারা জান্নাতি পুরুষদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে। কিন্তু দুনিয়ার নারীরা জান্নাতে তাঁদের স্বামীদের সঙ্গে উচ্চ মর্যাদায় থাকবে এবং তারা যা চাইবে, তাই পাবে।

3. সহিহ বুখারি ৩২৪৩-এর হাদিস:
এই হাদিসটি জান্নাতের বিশেষ প্রাসাদ ও তাঁবুগুলোর বর্ণনা দিচ্ছে, যেখানে অন্য পুরুষদের দৃষ্টির আড়ালে স্ত্রীগণ থাকবে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, জান্নাতি নারীরা তাঁদের বাবা-মা, সন্তান বা বন্ধুদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পারবে না। বরং প্রত্যেক ব্যক্তি ইচ্ছামতো যেখানে খুশি যেতে পারবে এবং যার সঙ্গে খুশি সাক্ষাৎ করতে পারবে।

|| জান্নাতে নিজের বাবা-মায়ের ও সন্তানদের সঙ্গে সাক্ষাৎ :

উপরোক্ত সূরা আত-তূর-এর আয়াত ইতিমধ্যেই উল্লেখ করা হয়েছে—
“আর যারা ঈমান এনেছে এবং তাদের সন্তানেরাও ঈমানের সাথে তাদের পথ অনুসরণ করেছে, আমি তাদের সেই সন্তানদের তাদের সঙ্গে মিলিয়ে দেব।”

এই আয়াতের ভিত্তিতে জানা যায় যে, জান্নাতে মুমিনদের তাদের পরিবার-পরিজনের সঙ্গে মিলিত করা হবে। সুতরাং, যদি আপনি এবং আপনার মা উভয়েই জান্নাতে প্রবেশ করেন, তাহলে ইন শা আল্লাহ, একত্রে থাকবেন এবং পরস্পরের সঙ্গে দেখা করতে পারবেন।

সারসংক্ষেপ হলো— জান্নাতে প্রত্যেক ব্যক্তির আনন্দ ও ইচ্ছা পূরণ করা হবে, আর আল্লাহ তাঁর নেক বান্দাদের সর্বোত্তম নিয়ামত দ্বারা সম্মানিত করবেন। জান্নাতবাসীরা ইন শা আল্লাহ, নিজেদের মায়েদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন এবং তাঁদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারবেন।

আল্লাহ আমাদের ও আপনাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে প্রবেশ করান এবং আমাদের পরিবারকেও সেখানে আমাদের সঙ্গে রাখুন। আমিন!

——————–
# হাদিস # তাফসির # প্রশ্নোত্তর

লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *