AkramNadwi

গাধার আকাঙ্ক্ষা ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/2421

بسم الله الرحمن الرحيم.


—————

এক গাধা আরেক গাধার কাছে তার দুর্দশার কথা জানাল—গৃহস্বামীর বাড়িতে সে যে কঠিন অত্যাচার সহ্য করছে, যে নির্মম প্রহার ও অসম্মান ভোগ করছে, তা অসহনীয়।

তখন অন্য গাধাটি জিজ্ঞাসা করল, “তুমি কেন পালিয়ে যাচ্ছ না?”

সে উত্তর দিল, “পালানোর কথা আমার মনেও এসেছিল। কিন্তু আমার মালিকের একটি সুন্দর মেয়ে আছে। যখনই তিনি তার ওপর রাগ করেন, তখন বলেন, ‘আমি তোমাকে এই গাধার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেব!’

আমার সেই গৃহে থাকার একমাত্র কারণ হলো—আমি আশায় আছি, যদি একদিন সত্যিই তিনি তাকে আমার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেন! আর কী দারুণই না হবে সে স্বপ্ন!”


গাধার কাহিনি আমাকে আশ‘আবের কৌতুকের কথা মনে করিয়ে দিল

আবূ আছিম বলেন, “ইবনে জুরাইজ আমাকে আশ‘আবের কাছে দাঁড় করালেন। তখন আমি তাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তোমার লোভ কতটুকু?”
তিনি বললেন, “যে কোনো নারী বিয়ে করলে আমি আমার ঘর ঝাড়ু দিতাম, এই আশায় যে তাকে আমার জন্য উপহার হিসেবে পাঠিয়ে দেওয়া হবে।”
আবূ আছিম আরও বলেন, “একবার আশ‘আব এক ব্যক্তিকে দেখতে পেল, যে একটি বড় থালা বানাচ্ছিল। তখন আশ‘আব বলল, ‘এটাকে আরও বড় করো, হয়তো আমাদের জন্য কিছু পাঠানো হবে!’

তিনি আরও বলেন, “একদিন আমি রাস্তায় হাঁটছিলাম, হঠাৎ দেখি আশ‘আব আমার পেছনে আসছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘তুমি আমার পেছনে কেন?’

আশ‘আব বলল, ‘আমি তোমার টুপি কাত হয়ে থাকতে দেখলাম, ভাবলাম যদি পড়ে যায়, তাহলে আমি তা নিয়ে নেব।’

আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, তাহলে আমি এটা তোমাকে দিয়ে দিলাম।’

আবূ আবদুর রহমান মুকরিই বলেন, “আশ‘আব বলল, ‘আমি যখন কোনো জানাজায় অংশ নিই এবং দেখি দুই ব্যক্তি নিজেদের মধ্যে ফিসফিস করে কথা বলছে, তখনই আমার মনে হয় যে মৃত ব্যক্তি হয়তো আমার জন্য কিছু রেখে গেছে!’

মাদায়িনি বলেন, “সালিম ইবনে আবদুল্লাহ আশ‘আবকে তাচ্ছিল্য করতেন, আবার তার সঙ্গে মজা করতেন, হাসতেন এবং তার প্রতি সদয় ছিলেন। একদিন তিনি আশ‘আবকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আশ‘আব! আমাকে তোমার লোভ সম্পর্কে কিছু বলো।’

আশ‘আব বলল, ‘হ্যাঁ, একদিন আমি একদল ছেলেকে বললাম, “সালিম উমরের সাদকার দরজা খুলে দিয়েছেন, তোমরা সেখানে যাও, তিনি তোমাদের খেজুর খাওয়াবেন।”

তারা যখন আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে গেল, তখন আমার মনেও এই কথা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস জন্মাল যে আমি সত্যি বলেছি! তাই আমিও তাদের পেছনে ছুটে গেলাম।’


মিথ্যা আকাঙ্ক্ষা ও ভিত্তিহীন লোভের পরিণতি :

এগুলো নিছক হাস্যকর কাহিনি, যা আমাদের আনন্দ দেয় এবং হাসায়। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো—আমরা নিজেরাও প্রতারিত গাধার চেয়ে খুব একটা আলাদা নই এবং লোভী আশ‘আব থেকেও খুব বেশি পৃথক নই!

আমরা মুসলমানরা বিজয় ও আধিপত্যের স্বপ্ন দেখি, ভবিষ্যৎ যে ইসলামের জন্য তা নিয়ে আলাপ করি, অথচ আমাদের অবস্থা এমন যে আমরা আমাদের প্রতিপালকের ইবাদত ও আনুগত্য থেকে সবচেয়ে বেশি দূরে। মনে হয় যেন আমরা ভাবছি—আমাদের কথা বললেই বাস্তবতা পরিবর্তিত হয়ে যাবে!

আমাদের শিক্ষার্থীরা জ্ঞানের গভীরে প্রবেশ না করেই তার বাহ্যিকতা নিয়ে পড়ে থাকে। তারা নিজেদের আলেমের পোশাকে সাজায়, মাথায় ঢিলেঢালা পাগড়ি বাঁধে, অলংকৃত চাদর পরে। অথচ তারা অধ্যয়ন, গবেষণা ও গভীর চিন্তা থেকে দূরে থাকে। তারা প্রকৃত ইলমের অনুসন্ধান থেকে বিমুখ, অথচ মনে করে, একদিন তারা আবূ হানীফা, মালিক ও সাওরির (রহিমাহুমুল্লাহ) মর্যাদায় পৌঁছে যাবে!

আমাদের আলেমরা গুনাহ ও পাপকে তুচ্ছ মনে করে, অন্যদের ব্যাপারে বৈরাগ্যের ভাব দেখায়, কিন্তু নিজেরা দুনিয়ায় পুরোপুরি নিমগ্ন থাকে। তারা হালাল-হারামের তোয়াক্কা না করেই সম্পদ আহরণ করে। তাদের এই কাজ তাদের কাছে সুসজ্জিত মনে হয় এবং তারা মনে করে যে তারা ভালোই করছে!

আল্লাহ বলেন:
“বলুন, আমি কি তোমাদের সেই লোকদের সংবাদ দেব, যারা তাদের কর্মে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারা হলো সেই লোক, যারা পার্থিব জীবনে ভুল পথ অবলম্বন করেছে, অথচ তারা মনে করে, তারা সঠিক কাজ করছে!”
(সূরা কাহফ ১০৩-১০৪)

আর আল্লাহ আরও বলেন:
“কাউকে যদি তার অসৎ কাজ সুশোভিত করে দেখানো হয় অতঃপর সে ওটাকে ভাল মনে করে, (সে কি ঐ ব্যক্তির সমান যে ভালকে ভাল এবং মন্দকে মন্দ দেখে?) কেননা আল্লাহ যাকে ইচ্ছা গোমরাহ করেন আর যাকে ইচ্ছা হিদায়াত দান করেন; অতএব তাদের জন্য আফসোস করে নিজে ধ্বংস হয়ো না। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন। ”
(সূরা ফাতির ৮)

আমাদের সাধারণ মানুষও ঈমান ও আমল থেকে বেখবর, তারা মনে করে—একটি নির্দিষ্ট মাযহাব, গোষ্ঠী বা দলের সঙ্গে সম্পর্ক থাকলেই নাজাত নিশ্চিত!

এভাবে তারা ইহুদী ও খ্রিস্টানদের পথ অনুসরণ করছে, যারা বলেছিল:
“জান্নাতে কেবল তারাই প্রবেশ করবে, যারা ইহুদি বা খ্রিস্টান।”
(সূরা বাকারা ১১১)

আল্লাহ তাদের জবাব দিয়েছেন:
“এইসব তাদের মনগড়া আকাঙ্ক্ষা। বলুন, যদি তোমরা সত্যবাদী হও, তবে তোমাদের দলিল উপস্থাপন করো!”
(সূরা বাকারা ১১১)

আর আল্লাহ আরও বলেন:
“শয়তান তাদের প্রতিশ্রুতি দেয় এবং মিথ্যা আশা দেখায়, অথচ শয়তান যা প্রতিশ্রুতি দেয়, তা কেবল প্রতারণা!”
(সূরা নিসা ১২০)

ভ্রান্ত আকাঙ্ক্ষার ভয়াবহ পরিণতি :

দেখুন সেই কাঙ্ক্ষিত দিনের পরিণতি—যেদিন সবাই আফসোস করবে:

“যখন সমস্ত কিছু চূড়ান্ত হবে, তখন শয়তান বলবে: ‘আল্লাহ তোমাদের সত্য প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, আর আমি তোমাদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, কিন্তু আমি তা ভঙ্গ করলাম। আমার তোমাদের ওপর কোনো ক্ষমতা ছিল না, আমি কেবল তোমাদের আহ্বান করেছিলাম, আর তোমরা আমার আহ্বানে সাড়া দিয়েছিলে!

অতএব, আমাকে দোষ দিও না, বরং নিজেদেরই দোষ দাও। আমি তোমাদের সাহায্য করতে পারব না, আর তোমরাও আমাকে সাহায্য করতে পারবে না। আমি সেই কুফর থেকে মুক্ত, যা তোমরা পূর্বে আমার সঙ্গে করেছিলে। নিশ্চয়ই জালিমদের জন্য রয়েছে যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি!’”
(সূরা ইবরাহীম ২২)

——————-

# উপদেশ # শিক্ষা

লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *