https://t.me/DrAkramNadwi/2329
بسم الله الرحمن الرحيم.
————————-
|| প্রশ্ন :
আমেরিকার বাসিন্দা, খ্যাতনামা কুরআন গবেষক উস্তায নোমান আলী খান আমাকে একবার প্রশ্ন করেছিলেন: ইউসুফ আ. কেন তাঁর ভাইদের প্রথম সাক্ষাতেই নিজের পরিচয় প্রকাশ করেননি? কেন তিনি তা বিলম্ব করলেন?
|| উত্তর:
এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও তাৎপর্যপূর্ণ প্রশ্ন, যা অনেকে সঠিকভাবে না বোঝার কারণে ইউসুফ আ. এর প্রতি অবজ্ঞা দেখিয়েছেন এবং নবুয়তের মর্যাদাকে হালকাভাবে নিয়েছেন। হাফিজ শিরাজী বলেছেন:
ألا أی یوسف مصری که کردت سلطنت مغرور
پدر را بازپرس آخر کجا شد مهر فرزندی
(ওহে মিসরের ইউসুফ! রাজত্ব কি তোমাকে অহংকারে ভরিয়ে দিল?
তুমি কি তোমার পিতার খোঁজ নেবে না? পিতার প্রতি তোমার সন্তানের ভালোবাসা কোথায় হারিয়ে গেল?)
এই ফারসি কবিতাটি বহু আলেমের মাঝে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়েছে, তারা এটি আবৃত্তি করেছেন এবং বারবার পুনরাবৃত্তি করেছেন। এর ফলে তারা ইউসুফ আ. এর মহান ব্যক্তিত্ব ও তাঁর উদারতা, মর্যাদা, ধৈর্য ও উপকারের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেননি। আমি আমার রবের সাহায্যে এই বিষয়টি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করব।
পাপী ব্যক্তি তওবা করার আগ পর্যন্ত ক্ষমা পায় না।
আল্লাহর একটি সুন্নত হলো—মানুষ যখন কোনো পাপ করে, তখন সে যদি অনুতপ্ত হয়ে হৃদয়ে বিনয় ও বিনম্রতা নিয়ে আল্লাহর দিকে ফিরে না আসে, তবে তার জন্য ক্ষমা ও দয়া আসে না।
“ألم يأن للذين آمنوا أن تخشع قلوبهم لذكر الله وما نزل من الحق”
(যারা ঈমান এনেছে তাদের হৃদয় কি আল্লাহর স্মরণে এবং যে সত্য নাযিল হয়েছে তার কারণে বিগলিত হওয়ার সময় হয়নি ? – সূরা হাদীদ: ১৬)
যদি সে আল্লাহকে ভয় করে এবং তাঁর দিকে ফিরে আসে, তবে আল্লাহ তার সকল পাপ ক্ষমা করেন। আর যদি সে অহংকার করে, তবে আল্লাহ তাকে তাঁর পথনির্দেশ থেকে বঞ্চিত করেন।
“سأصرف عن آياتي الذين يتكبرون في الأرض بغير الحق”
(যারা অন্যায়ভাবে যমীনে অহঙ্কার করে আমার আয়াতসমূহ থেকে তাদেরকে আমি অবশ্যই ফিরিয়ে রাখব। – সূরা আরাফ: ১৪৬)
অহংকার ও আত্মতৃপ্তি এমন এক পর্দা, যা মানুষের জন্য তওবা ও হিদায়াতের পথ বন্ধ করে দেয় এবং তাকে এই দু’টি থেকে বঞ্চিত করে।
ইউসুফ আ. এর ভাইদের গর্ব ও অহংকার :
ইয়াকুব আ. এর পুত্রগণ ছিলেন বংশে সম্মানিত, চেহারায় সুন্দর, দেহে শক্তিশালী। তারা নিজেদের প্রতি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে, নিজেদের অসাধারণ বলে মনে করতেন। তারা মনে করতেন, তাদের প্রতি তাদের পিতা ও অন্যদের পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও যত্ন প্রদর্শন করা উচিত। যখন তারা দেখলেন, তাদের পিতা ইউসুফ ও তাঁর ছোট ভাইকে (বিনইয়ামিন) বিশেষভাবে ভালোবাসেন, তখন তারা ঈর্ষান্বিত হলেন। তাদের ঈর্ষা ইউসুফ আ. এর প্রতি ছিল সবচেয়ে তীব্র।
“إذ قالوا ليوسف وأخوه أحب إلى أبينا منا ونحن عصبة إن أبانا لفي ضلال مبين”
( যখন তারা বলেছিল, ‘নিশ্চয় ইউসুফ ও তার ভাই আমাদের পিতার নিকট আমাদের চেয়ে অধিক প্রিয়, অথচ আমরা একই দল। নিশ্চয় আমাদের পিতা সুস্পষ্ট বিভ্রান্তিতেই আছে’। – সূরা ইউসুফ: ৮)
তারা নিজেদের মর্যাদাকে নিজেদের শক্তিশালী হওয়া, একসাথে থাকা এবং দলগতভাবে শক্তিশালী হওয়ার ওপর ভিত্তি করে নির্ধারণ করেছিল। যখন তারা তাদের পিতাকে বলল ইউসুফ আ. কে তাদের সঙ্গে পাঠাতে, তখন তাদের পিতা বললেন:
“إني ليحزنني أن تذهبوا به وأخاف أن يأكله الذئب وأنتم عنه غافلون”
( সে বলল, ‘নিশ্চয় এটা আমাকে কষ্ট দেবে যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি, নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলবে, যখন তোমরা তার ব্যাপারে গাফিল থাকবে’।(সূরা ইউসুফ : ১৩)
এতে তারা পুনরায় নিজেদের অহংকার প্রকাশ করে বলল:
“لئن أكله الذئب ونحن عصبة إنا إذا لخاسرون”
(তারা বলল, ‘আমরা একই দলভুক্ত থাকা সত্ত্বেও যদি নেকড়ে তাকে খেয়ে ফেলে তাহলে তো আমরা অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত’। – সূরা يوسف: ১৪)।
|| ইউসুফ আ. এর পরিকল্পনা ও বিলম্বের কারণ:
এই অহংকার ও আত্মগরিমাই ছিল তাদের প্রধান সমস্যা। এটি ছিল এমন একটি রোগ, যা তাদের পুরো ইতিহাস জুড়ে সমস্যা সৃষ্টি করেছে এবং তাদের বিভ্রান্তি ও বিপর্যয়ের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যখন তারা দুর্ভিক্ষের সময় ইউসুফ আ. এর কাছে এলেন, তখন ইউসুফ আ. তাদের চিনতে পারলেন। কিন্তু তিনি বুঝতে পারলেন, তারা এখনো বদলাননি। একজন নবী হিসেবে ইউসুফ আ. চাইলেন, তারা তওবা করুক, ক্ষমা প্রার্থনা করুক এবং আত্মগরিমা ত্যাগ করুক। তবে তা তখনই সম্ভব, যখন তারা অনুতপ্ত হবে ও তাদের হৃদয় নম্র হবে। তাই ইউসুফ আ. তাদের ভাই বিনইয়ামিন-কে তাঁর কাছে নিয়ে আসতে বললেন। তারা বলল:
“سنراود عنه أباه وإنا لفاعلون”
(তারা বলল, ‘তার বিষয়ে আমরা তার পিতাকে রাজি করাব, আর এটি আমরা করবই’। – সূরা ইউসুফ : ৬১)।
ইউসুফ আ. চাইলেন, তাদের সংশোধন হতে আরও কিছু সময় লাগুক।
|| তাদের পরিবর্তন ও ইউসুফ আ. এর পরিচয় প্রকাশ:
দ্বিতীয়বার তারা যখন মিশরে এলো, তখন ইউসুফ আ. তাদের ছোট ভাই বিনইয়ামিন-কে কৌশলে নিজের কাছে রেখে দিলেন। তখন তারা বলল:
“إن يسرق فقد سرق أخ له من قبل”
(তারা বলল, ‘যদি সে চুরি করে থাকে, তবে ইতঃপূর্বে তার এক ভাই চুরি করেছিল’।
-সূরা ইউসুফ : ৭৭)
এতে ইউসুফ আ. বুঝতে পারলেন, তারা এখনো নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেনি। তখন তিনি বললেন:
“أنتم شر مكانا”
(সে মনে মনে বললঃ তোমাদের অবস্থাতো হীনতর। – সূরা ইউসুফ : ৭৭)
এরপর তারা আরও দুর্বল হয়ে গেল। বড় ভাই মিশরেই থেকে গেল, বাকিরা লাঞ্ছিত হয়ে ফিরে গেল। তাদের পিতা বললেন:
“بل سولت لكم أنفسكم أمرا”
(ই‘য়াকুব বলল, ‘না, বরং তোমরা নিজেরাই একটা কাহিনী সাজিয়ে নিয়ে এসেছ। – সূরা يوسف: ৮৩)।
তৃতীয়বার যখন তারা এল, তখন তারা একেবারে দুর্বল ও বিনীত হয়ে গেল। তারা বলল:
“يا أيها العزيز مسنا وأهلنا الضر وجئنا ببضاعة مزجاة فأوف لنا الكيل وتصدق علينا”
( তখন বলল, ‘হে আযীয, অভাব-অনটন আমাদেরকে ও আমাদের পরিবারকে স্পর্শ করেছে, আর আমরা তুচ্ছ পুঁজি নিয়ে এসেছি। অতএব, আমাদেরকে মাপে পূর্ণমাত্রায় দিন এবং আমাদের প্রতি অনুগ্রহ করুন। – সূরা ইউসুফ : ৮৮)।
তারা এতটাই অসহায় হয়ে পড়েছিল যে “تصدق علينا” (আমাদের ওপর দয়া করুন) পর্যন্ত বলে ফেলল।
শায়খ আবুল হাসান আলী-নাদভী রহ. বারবার বলতেন:
“দেখো! এরা নবীদের সন্তান, কিন্তু দুর্দশা তাদের এতটাই নম্র করে দিয়েছে যে তারা ‘তাসাদ্দাক আলাইনা’ (আমাদের ওপর সদকা করুন) বলেছে।”
তখন ইউসুফ আ. আর নিজেকে ধরে রাখতে পারলেন না এবং বললেন:
“هل علمتم ما فعلتم بيوسف وأخيه إذ أنتم جاهلون”
(সে বলল, ‘তোমাদের জানা আছে কি, ইউসুফ ও তার ভাইয়ের সাথে তোমরা কিরূপ আচরণ করেছিলে, যখন তোমরা অজ্ঞ ছিলে’? -সূরা ইউসুফ : ৮৯)।
তখন তারা বুঝতে পারল, তিনিই ইউসুফ আ., এবং তারা অনুতপ্ত হয়ে বলল:
“تالله لقد آثرك الله علينا وإن كنا لخاطئين”
(তারা বলল, ‘আল্লাহর কসম, আল্লাহ আমাদের উপর তোমাকে প্রাধান্য দিয়েছেন, আর আমরাই ছিলাম অপরাধী’। – সূরা ইউসুফ : ৯১)
এখন তারা সত্যিই তওবা করেছে। তখন ইউসুফ আ. বললেন:
“لا تثريب عليكم اليوم يغفر الله لكم”
( সে বলল, ‘আজ তোমাদের উপর কোন ভৎর্সনা নেই, আল্লাহ তোমাদের ক্ষমা করুন। – সূরা ইউসুফ : ৯২)।
এভাবেই ইউসুফ আ. -এর ধৈর্য, তাকওয়া ও অনুগ্রহের মাধ্যমে তার ভাইদের আত্মগরিমা ভেঙে গিয়েছিল এবং তাদের প্রকৃত সংশোধন হয়েছিল।
“إنه من يتق ويصبر فإن الله لا يضيع أجر المحسنين”
( নিশ্চয় যে ব্যক্তি তাকওয়া অবলম্বন করে এবং সবর করে, তবে অবশ্যই আল্লাহ সৎকর্মশীলদের প্রতিদান বিনষ্ট করেন না’। সূরা ইউসুফ : ৯০)
——————
# প্রশ্নোত্তর # তাফসির
মূল: ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।