AkramNadwi

কীভাবে কুরআনের পাঠের প্রস্তুতি নেওয়া উচিত ?

https://t.me/DrAkramNadwi/1780

بسم الله الرحمن الرحيم.

————–

ভূমিকা:
আমাদের দুই ঘনিষ্ঠ বন্ধু, সম্মানিত ভাই মাওলানা মুহাম্মদ উমর লাদাখি নদভী এবং প্রিয় ভাই মাওলানা মুহাম্মদ ইউসুফ ভোপালি নদভী বিভিন্ন জ্ঞান ও দাওয়াতি কর্মকাণ্ডে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করছেন এবং এ দুই মহৎ ব্যক্তির মাধ্যমে বহু মানুষ উপকৃত হচ্ছে।
এটা জেনে অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছি যে, নাদওয়ার এই দুই গর্বিত সন্তান দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ ও বিশেষ শ্রেণির মধ্যে আল্লাহর কিতাবের বার্তা প্রচারে রত রয়েছেন।
এক আলোচনা সভায় তাঁদের সঙ্গে এ বিষয়টি আলোচনায় আসে যে,
কুরআনের পাঠের প্রস্তুতি কীভাবে করা উচিত?
চূঁড়ান্তভাবে আল্লাহর তাওফিকের বদৌলতে আমিও এ মহৎ কাজের সঙ্গে যুক্ত আছি, তাই আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে এ বিষয়ে কিছু কথা বলার সাহস করছি।
এ ধরনের আলোচনা মুমিনদের জন্য উপকারী হয়—
“আর উপদেশ দাও, নিশ্চয় উপদেশ মুমিনদের উপকারে আসে।” (সূরা আয-যারিয়াত: ৫৫)
এবং একে অপরকে সহযোগিতা করাও আহলুল ইলমের দায়িত্বের অন্তর্ভুক্ত—
“তোমরা নেকি ও তাকওয়ায় একে অপরের সহায়তা করো।” (সূরা মায়েদা: ২)

মূলভ্রান্তি:
সাধারণত কুরআনের পাঠ দিতে গিয়ে আমাদের চিন্তা হয়—
কীভাবে আমরা অন্যদের আল্লাহর কিতাবে প্রভাবিত করব?
কীভাবে তাদের মনে বিস্ময় ও মুগ্ধতার অনুভূতি সৃষ্টি করব?
এমন চিন্তা একটি বড় ভুল। কারণ যেহেতু শুরুটাই ভুল চিন্তা থেকে হয়, তাই আমাদের পুরো প্রক্রিয়া একপ্রকার বিচ্যুতির শিকার হয়।
ফলে যখন আমরা পাঠের প্রস্তুতি নিতে বসি, তখন এমন বইগুলির দিকে মনোযোগ দিই যেগুলো শ্রোতাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলবে বলে মনে হয়।
নিজস্ব রুচি, প্রবণতা বা মাসলাকের (মতের ধারার) অনুসরণে কোনো তাফসির অধ্যয়ন করে পাঠ দিই।
এছাড়া কুরআনের বৈজ্ঞানিক চমক ও অপরিপক্ব ভাষাগত বা অলঙ্কারিক বৈশিষ্ট্যগুলোর ব্যাখ্যায় অনেক সময় অপচয় করি।
এ ধরনের পাঠে শ্রোতারা হয়তো কুরআনের প্রতি কিছুটা বিমোহিত হবে, অথবা কোনো বিশেষ মাসলাক বা মতের প্রতি তাদের বিশ্বাস দৃঢ় হবে।
কিন্তু এর মাধ্যমে তাদের ঈমান ও আমলে (বিশ্বাস ও কর্মে) কোনো প্রকৃত উন্নতি সাধিত হয় না।

সঠিক পদ্ধতি:
তাহলে সঠিক পদ্ধতি কী?
এর উত্তর হলো—
যখন আমরা কুরআনের পাঠের প্রস্তুতি গ্রহণ করি, তখন মনে রাখতে হবে:
আল্লাহ তায়ালা এ কিতাব আমাদের কেবল বিমোহিত করার জন্য বা বিস্ময়ে অভিভূত করার জন্য নাজিল করেননি।
বরং তিনি এ কিতাব নাজিল করেছেন, যাতে এর নির্দেশনার আলোকে আমরা জীবনযাপন করতে শিখি।
এটি আমাদের প্রস্তুত করে পরকালে যেসব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে, তার জন্য।
এ কিতাবের শিক্ষার অনুধাবন ও আমলের ওপরই আমাদের সফলতা ও ব্যর্থতা নির্ভর করছে।

সুতরাং যখন আমরা এ কিতাব হাতে নিই,
প্রথমে নিজেরা বুঝতে চেষ্টা করব,
তারপর অন্যদের বোঝানোর চিন্তা করব।

বুঝার এবং বোঝানোর এ প্রক্রিয়া তিনটি ধাপে বিভক্ত:

প্রথম ধাপ:
মনে রাখতে হবে,
কুরআন আমাদের ওপর সরাসরি নাজিল হয়নি।
এটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা যে,
এ কিতাব আজ থেকে প্রায় চৌদ্দশ বছর আগে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর ওপর নাজিল হয়েছিল।
এবং তাঁর ও তাঁর সমসাময়িক শ্রোতাদের অবস্থা বিবেচনায় ২৩ বছরের একটি দীর্ঘ সময়ে খণ্ড খণ্ডভাবে এর আয়াতসমূহ অবতীর্ণ হয়েছিল।

অতএব যারা বলে, “এ কিতাব আমাদের ওপর নাজিল হয়েছে”—
তারা হয় ভুল ধারণায় ভোগে, অথবা শুধু কবিতার ভাষা ব্যবহার করছে।

এ সত্য অনুধাবন করার পর স্বতঃসিদ্ধ হয়ে যায় যে,
এ কিতাব সবচেয়ে সঠিকভাবে তিনিই বুঝেছিলেন,
যাঁর ওপর আল্লাহ তায়ালা সরাসরি এ আমানত নাজিল করেছিলেন।
তাঁর তুলনায় অন্য কারও ব্যাখ্যা দলিলরূপে গ্রহণযোগ্য নয়।

তাই আমাদের প্রচেষ্টা হওয়া উচিত:
আমরা জানার চেষ্টা করি, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং তাঁর সাহাবাগণ রাযি. কুরআনকে কীভাবে বুঝেছিলেন?
কুরআনের উজ্জ্বল আয়াতসমূহ তাঁদের জীবনে কী ধরনের জ্ঞান ও কর্মের পরিবর্তন এনেছিল?

এর জন্য প্রথমে
মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্ভরযোগ্য সীরাত (জীবনী) অর্জন করা জরুরি।
তারপর যে আয়াতের পাঠ দিতে চাই, তার অর্থ-অর্থব্যাখ্যা সেই দৃষ্টিভঙ্গিতে অনুধাবন করতে হবে,
যেভাবে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এবং সাহাবাগণ রাযি. তা বুঝতেন।

এরপর লক্ষ্য করতে হবে:
সেই সময়ের মানুষদের ওপর এই আয়াতসমূহ কীভাবে প্রভাব ফেলেছিল?
কীভাবে তারা সোজা পথে এগিয়ে গেল?
কীভাবে তাদের ঈমান ও তাকওয়ায় বৃদ্ধি ঘটল?

এটি একটি শ্রমসাধ্য ধাপ।
এতে অবহেলা করলে কুরআনের ব্যাখ্যায় বিকৃতি বা বিভ্রান্তির দরজা খুলে যায়।

এ ধাপের জন্য সহায়ক তাফসিরসমূহ হলো—

সহীহ বুখারির “কিতাবুত তাফসির”,
ইমাম তাবারির তাফসির (তাফসির তাবারী),
এবং জামাখশারির “আল-কাশশাফ”।
তবে খেয়াল রাখতে হবে:
তাফসিরে তাবারী ও আল-কাশশাফে প্রচুর দুর্বল, এমনকি মনগড়া বর্ণনা রয়েছে।
আর আল-কাশশাফে মুতাযিলা ফেরকার বিদআতপূর্ণ মতবাদে প্রবল সমর্থন আছে।
সুতরাং এগুলো অধ্যয়নে সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

সমসাময়িক চিন্তাবিদদের মধ্যে
মাওলানা হামীদুদ্দীন ফারাহীর গ্রন্থসমূহ থেকেও উপকার নেওয়া যেতে পারে।

দ্বিতীয় ধাপ:
দ্বিতীয় ধাপ হলো—আমরা নিজেরা এই আয়াতগুলো থেকে কী দিকনির্দেশনা পাচ্ছি? এগুলো আমরা নিজেদের জীবনে কীভাবে প্রয়োগ করবো? এর জন্য আমাদের আরও গভীর চিন্তাভাবনার প্রয়োজন হবে।
এ ধাপ কেবল তখনই শুরু হবে যখন আমরা প্রথম ধাপ সম্পন্ন করবো। এরপর আমাদের আয়াতগুলোর প্রসঙ্গ ও পটভূমি (সিয়াক-সাবাক) বোঝার চেষ্টা করতে হবে এবং দেখতে হবে যে, এই আয়াতগুলো আমাদের সমস্যাসমূহ ও চ্যালেঞ্জগুলোর সমাধানে কীভাবে সহায়ক হয়। এই আয়াতগুলো পাঠের ফলে আমাদের চিন্তাভাবনা ও কর্মপন্থায় কী প্রভাব পড়ে, সেটিও বিবেচনা করতে হবে।
এই ধাপের জন্য সহায়ক ব্যাখ্যাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

ইমাম রাজীর তাফসীর কাবীর,
আলূসীর রূহুল মাআনী,
রশীদ রেজার তাফসীরুল মানার ইত্যাদি।
তবে এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এসব বইতেও মানুষের প্রচেষ্টাজনিত ত্রুটি রয়েছে। তাই চোখ বন্ধ করে এগুলোর ওপর নির্ভর করা ঠিক নয়।

তৃতীয় ধাপ:
তৃতীয় ধাপ হলো—আমরা বুঝে নিই যে আমাদের শ্রোতাদের মানসিক স্তর কী? তাদের অবস্থা ও সমস্যাগুলো কী? সংশ্লিষ্ট আয়াতগুলো কীভাবে তাদের মানসিক স্তর ও পরিস্থিতির সাথে মানানসই সহজ ভাষায় বোঝানো যাবে?
চেষ্টা থাকতে হবে যেন দরসুল কুরআন তাদের জন্য পথনির্দেশক হয়, আল্লাহর সাথে তাদের সম্পর্ক আরও গভীর হয়, তাদের মধ্যে ইবাদতের প্রতি আগ্রহ বৃদ্ধি পায়, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যের অনুভূতি মজবুত হয় এবং আখিরাতের সঠিক ভাবনা দৃঢ়ভাবে অন্তরে প্রতিষ্ঠিত হয়।
এই উদ্দেশ্যে সহায়ক ব্যাখ্যাগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে:

মাওলানা আমীন আহসান ইসলাাহীর তাদাব্বুরে কুরআন,
মাওলানা মওদুদীর তাফহীমুল কুরআন,
শহীদ সাইয়েদ কুতুবের ফি যিলালিল কুরআন ইত্যাদি।
শ্রোতাদের কাছে এই বইগুলোর বক্তব্য সরাসরি পড়ে শোনানোর প্রয়োজন নেই এবং এসবের সংক্ষিপ্তসারও উপস্থাপন করা সমীচীন নয়। বরং এসব তাফসীর থেকে এ শিক্ষা নেওয়া উচিত যে, আধুনিক ভাষায় কুরআনের বার্তা কীভাবে উপস্থাপন করা যায়।

সারসংক্ষেপ:
আমাদের কুরআনের দরসকে উপরোক্ত তিনটি ধাপের প্রতিচ্ছবি করে গড়ে তুলতে হবে।

শেষ কথা:
কুরআনের দরসকে একটি পবিত্র দায়িত্ব মনে করুন। একে কোনো নির্দিষ্ট চিন্তাধারা বা মতবাদের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপনের মাধ্যম বানাবেন না।
মানুষকে সরাসরি তাদের প্রতিপালকের সাথে যুক্ত করুন। তাদের প্রশ্নের জ্ঞানভিত্তিক জবাব দিন। যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর জানা না থাকে, তাহলে ভুল ব্যাখ্যা দেবেন না, বরং স্পষ্টভাবে স্বীকার করুন যে, উত্তর জানা নেই।
জানা না থাকাটা কোনো দোষ নয়, তবে ভুল তথ্য দেওয়া দোষ এবং গুনাহ।

আল্লাহ তায়ালা আমাদের তাঁর কিতাব বোঝার, সে অনুযায়ী আমল করার এবং তাঁর বার্তা বিশ্বময় ছড়িয়ে দেওয়ার তাওফিক দিন।

————–

✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *