https://t.me/DrAkramNadwi/5579
بسم الله الرحمن الرحيم.
❝
লেখক: ড. মুহাম্মাদ আকরাম নদভী
অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা :
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট।
❓ প্রশ্ন: আমাদের বন্ধু, ভোপাল থেকে মাওলানা মুহাম্মাদ ইউসুফ সিদ্দিকী নদভী সাহেব, যিনি (আল্লাহ তার ছায়া দীর্ঘ করুন) নিম্নোক্ত প্রশ্ন পাঠিয়েছেন:
– “জগৎবিখ্যাত মুহাদ্দিস এবং বিশিষ্ট আলেম, ড. আকরাম নদভী সাহেবের খেদমতে বিনীত সালাম নিবেদন করছি। আমাদের ভোপাল শহরে, যাকে হ্রদনগরীও বলা হয়, কিছু লোক আছেন যারা কবরের শাস্তিকে অস্বীকার করেন এবং পরিকল্পিতভাবে মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করে তাদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন। কুরআন ও হাদিসের আলোকে একটি সুস্পষ্ট, গবেষণালব্ধ উত্তর প্রয়োজন। উত্তর প্রদানে আপনার দয়া কামনা করছি।
✅ উত্তর:
প্রাথমিকভাবে জীবনের দুটি ধাপ আছে: একটি দুনিয়ার জীবন এবং অপরটি আখিরাতের জীবন। কুরআন মজিদ এই দুই জীবনকে এমন স্পষ্টতার সাথে বর্ণনা করেছে যে তাতে কিছুই অপূর্ণ রাখেনি, এবং হাদিসসমূহেও এদের বিস্তারিত ও উপাদানসমূহ বর্ণিত হয়েছে।
দুনিয়ার জীবন হলো কর্মের জীবন; এটিই মানুষের পরীক্ষার ময়দান। এখানে যারা সৎ হবে, তারা আখিরাতে সফল হবে, আর যারা অসৎ হবে, তারা আখিরাতে ব্যর্থ হবে। যেহেতু এই জীবন আখিরাতের সফলতার ওপর নির্ভরশীল, সেহেতু এই জীবনের উত্থান-পতন ভালোভাবে বোঝানো হয়েছে, আর সৎ ও অসৎ লোকদের পথ বিভিন্ন কৌশলে উন্মোচন করে দেখানো হয়েছে, যাতে কেয়ামতের দিন কেউ আল্লাহর সামনে এ অজুহাত না দিতে পারে যে তারা কিছুই জানতো না।
আখিরাতের জীবন হলো প্রতিদানের জীবন; সেখানে হিসাব-নিকাশ হবে, আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে জবাবদিহি করতে হবে, অন্তরের সব গোপনীয়তা প্রকাশিত হয়ে যাবে, মিথ্যা বলার শক্তি কেড়ে নেওয়া হবে, অন্যদের সাহায্যের সব পথ বন্ধ হয়ে যাবে, এবং প্রতিটি মানুষ একা তার পরিণামের সম্মুখীন হবে। “যেদিন সমস্ত মানুষ রব্বুল আলামীনের সামনে দাঁড়াবে”(সূরা মুতাফফিফীন, আয়াত ৬)
“(ক্বিয়ামাতের দিন আল্লাহ বলবেন) তোমরা আমার নিকট তেমনই নিঃসঙ্গ অবস্থায় হাজির হয়েছ যেমনভাবে আমি তোমাদেরকে প্রথমবার সৃষ্টি করেছিলাম,” (সূরা আনআম, আয়াত ৯৪)
“যেদিন মানুষ তার ভাই, মা, বাবা, সঙ্গী ও সন্তান থেকে পালাবে, সেদিন তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত থাকবে। (সূরা আবাসা, আয়াত ৩৪-৩৭)
মৃত্যুর পর থেকে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত জীবন হলো মধ্যবর্তী জীবন; এটি দুনিয়া ও আখিরাতের জীবনের মতো নয়। দুনিয়ার জীবনের তুলনায় এটি দীর্ঘ, তবে সেখানে কোনো কর্ম নেই, এবং ভুল সংশোধনের কোনো সুযোগও নেই; এই দিক থেকে এটি দুনিয়ার জীবন থেকে আলাদা। তেমনিভাবে, এই মধ্যবর্তী জীবনে কোনো মীযান (তুলাদন্ড) স্থাপন করা হবে না, কোনো সৎকর্ম ও অসৎকর্ম মাপা হবে না, এবং সফলতা বা ব্যর্থতার চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও হবে না। এই দিক থেকে এটি আখিরাতের সাদৃশ্যপূর্ণও নয়।
“কারণ মধ্যবর্তী জীবন, যাকে কবরের জীবন বলা অধিক উপযুক্ত, এটি না কর্মের জীবন, না পুরস্কারের জীবন। তাই মানুষের জন্য এর বিস্তারিত জানা তেমন প্রয়োজন নেই। যেমন পরে এসেছে, নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে কবরের জীবনের বিস্তারিত পরবর্তীতে মদীনায় জানানো হয়েছিল।
কবরের জীবন কী? নেককারদের জন্য এর উদাহরণ এরকম যে যখন রাজা কাউকে সম্মান ও পুরস্কারে ভূষিত করতে চান, তখন তাকে রাজপ্রাসাদে আসার আমন্ত্রণ দেন। রাজার সাথে তার সাক্ষাৎ তখনই হয় না, কিছুসময় অপেক্ষায় কাটাতে হয়। এই অপেক্ষার সময় তার জন্য এমন ভালো অবস্থার ব্যবস্থা করা হয়, যাতে সে বুঝতে পারে যে, রাজা তার প্রতি সন্তুষ্ট।
আর খারাপ লোকদের জন্য কবরের জীবনের উদাহরণ হল সেই অপরাধীর মতো, যাকে পুলিশ আটক করেছে এবং আদালতে উপস্থিত করার আগে তার সাথে কঠোর আচরণ করা হচ্ছে। সে দেখতে পায় তার শেষ পরিণতি কী হতে যাচ্ছে।
যখন মানুষের মৃত্যু হয়, তখনই সে বুঝতে শুরু করে তার সঙ্গে কী ঘটবে। যদি সে মুমিন ও সৎকর্মশীল হয়, তবে তার মধ্যে প্রশান্তির অনুভূতি আসে। তার সামনে রহমতের ফেরেশতারা আসে এবং তাকে শুভ সংবাদ ও শুভেচ্ছা জানিয়ে তার আত্মা বের করেন। আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের প্রভু আল্লাহ,’ তারপর অবিচল থাকে, তাদের ওপর ফেরেশতারা অবতীর্ণ হয় এবং বলে, ‘তোমরা ভয় করো না এবং দুঃখ করো না এবং জান্নাতের সুসংবাদ গ্রহণ কর, যার প্রতিশ্রুতি তোমাদেরকে দেওয়া হয়েছে।(সূরা ফুসসিলাত, আয়াত ৩০)
এর ব্যাখ্যা ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ, নাসাঈ এবং ইবনে মাজাহ প্রমুখের হাদিসে এসেছে, যা হযরত বারা বিন আযিব (রাযি.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, “যখন কোনো মুমিন বান্দা আখিরাতের দিকে ধাবিত হতে থাকে এবং দুনিয়া থেকে তার সম্পর্ক ছিন্ন হতে থাকে, তখন তার কাছে ফেরেশতারা নেমে আসে। তাদের মুখগুলো সূর্যের মতো উজ্জ্বল থাকে, তাদের সাথে জান্নাতের কাফন এবং সুগন্ধি থাকে। তারা তার দৃষ্টিসীমা পর্যন্ত বসে থাকে, তারপর মৃত্যুর ফেরেশতা এসে তার মাথার কাছে বসে বলেন, ‘ওহে মঙ্গলময় আত্মা, বের
হয়ে এসো আল্লাহর ক্ষমা ও সন্তুষ্টির দিকে।'”
আর যদি মানুষ কাফের হয়, তবে তার সামনে শাস্তির ফেরেশতারা আসে এবং একজন অপরাধীর মতো তার আত্মাকে ধরে নিয়ে যায়। কুরআনে এসেছে, “যখন তাদের কারো মৃত্যু আসে, তখন সে বলে, ‘হে আমার প্রভু, আমাকে ফিরিয়ে দিন। হয়তো আমি ছেড়ে আসা পৃথিবীতে সৎকাজ করতে পারব।’ কখনোই নয়! এটা তো তার মুখের কথা। তাদের সামনে রয়েছে একটি অন্তর্বর্তীকাল (বরযখ), যেটি স্থায়ী থাকবে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত” (সূরা মুমিনূন, আয়াত ৯৯-১০০) এবং “যখন ফেরেশতারা কাফেরদের আত্মা গ্রহণ করে, তারা তাদের মুখমণ্ডল ও পিঠে আঘাত করতে থাকে এবং বলে, ‘জ্বলন্ত আগুনের শাস্তি আস্বাদন করো। এটি তাদের কর্মের পরিণাম; আল্লাহ তাঁর বান্দাদের প্রতি কোনো অন্যায়কারী নন'” (সূরা আনফাল, আয়াত ৫০-৫১)
কবরস্থ করার পর মুমিনের সাথে ভালো আচরণ করা হয়; এটি মূলত তার আত্মার সঙ্গে সম্পর্কিত, তবে কিছুটা সংযোগ শরীরের সঙ্গেও থাকে। এই বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা সহিহ বুখারি, সহিহ মুসলিম এবং অন্যান্য হাদিসের বইয়ে উল্লেখ রয়েছে।
আপনার প্রশ্ন যেহেতু কবরের শাস্তি সম্পর্কিত, তাই আমরা এটি কিছুটা বিস্তারিত ব্যাখ্যা করব। ইতোমধ্যে বলা হয়েছে যে কবরের জীবন কোনো কর্মের জীবন নয় এবং কোনো প্রতিদানের জীবনও নয়, এজন্য কুরআনে এর বিস্তারিত নেই। তবে কিছু ইঙ্গিত আছে, এর মধ্যে একটি আয়াত হলো: “অতঃপর আল্লাহ তাকে তাদের ষড়যন্ত্রের অনিষ্টতা হতে রক্ষা করলেন এবং কঠিন শাস্তি পরিবেষ্টন করল ফির‘আউন সম্প্রদায়কে। (কবরে) সকাল-সন্ধ্যায় তাদেরকে উপস্থিত করা হয় আগুনের সম্মুখে এবং যেদিন কিয়ামাত সংঘটিত হবে সেদিন বলা হবেঃ ফির‘আউন সম্প্রদায়কে নিক্ষেপ কর কঠিনতম শাস্তিতে (সূরা গাফির, আয়াত ৪৫-৪৬)।
এ ধরনের ইঙ্গিত অন্যান্য আয়াতেও রয়েছে। আল্লাহর কিতাবে এ বিষয়ে খুব বেশি স্পষ্ট উল্লেখ নেই, তবে হাদিসে কবরের শাস্তির বিস্তারিত স্পষ্টভাবে এসেছে। এসব হাদিস সর্বোচ্চ মানের সঠিকতার অধিকারী, বিভিন্ন সাহাবা থেকে বর্ণিত হয়েছে। এসব বর্ণনা অস্বীকার করা মানবীয় যুক্তি অস্বীকার করার মতো। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে যদি কোনো বিষয় কেবল এক সাহাবির মাধ্যমেই প্রমাণিত হয়, তবে তা মানা আবশ্যক। আর এখানে তো অসংখ্য বর্ণনা আছে। পৃথিবীতে কোনো সংবাদ প্রমাণের জন্য যে শর্ত হতে পারে, তা মাথায় রেখে হাদিসগুলো অধ্যয়ন করলে কবরের শাস্তির হাদিসগুলো স্বতঃসিদ্ধ প্রমাণিত হবে।
সহিহ মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “রাসুলুল্লাহ সা. আমার কাছে এসেছিলেন। তখন আমার কাছে এক ইহুদী নারী বসে ছিল। সে বলল, ‘আপনারা কি জানেন যে আপনাদেরকে কবরগুলোতে পরীক্ষা করা হবে?’ হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, এতে রাসুলুল্লাহ সা. ভীত হয়ে পড়লেন এবং বললেন, ‘এই ফিতনা শুধু ইহুদিদের জন্য হবে।’ আয়েশা (রাযি.) বলেন, কয়েক রাত পরে রাসুলুল্লাহ সা. বললেন, ‘তোমরা কি জানো, আমাকে ওহি করা হয়েছে যে তোমরাও কবরগুলোতে পরীক্ষার সম্মুখীন হবে?’ আয়েশা (রাযি.) বলেন, এরপর থেকে আমি রাসুলুল্লাহ সা.-কে সর্বদা কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতে দেখেছি।”
এই হাদিস থেকে জানা যায় যে, শুরুতে নবী সা. কবরের শাস্তির বিষয়টি জানতেন না। তবে যখন এ বিষয়ে ওহি প্রাপ্ত হলেন, তখন এ বিষয়ে নিশ্চিত হলেন এবং এর বিস্তারিত ব্যাখ্যা করলেন। তিনি নিজেও কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় চেয়েছেন এবং মুসলমানদেরও কবরের শাস্তি থেকে আশ্রয় প্রার্থনার পরামর্শ দিয়েছেন।
সহিহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমে বর্ণিত যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম দুই কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন এবং বললেন, “এই দুজন শাস্তির মধ্যে রয়েছে এবং তাদেরকে কোনো বড় গুনাহের জন্য শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না। এদের একজন প্রস্রাবে সতর্কতা অবলম্বন করত না এবং অন্যজন চোগলখোরি করত।”
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত যে, “নিশ্চয়ই এই উম্মত তার কবরগুলোতে পরীক্ষিত হবে। যদি এ কথা না হত যে তোমরা দাফন করা বন্ধ করে দেবে, তবে আমি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতাম যেন তিনি তোমাদেরকে কবরের শাস্তি এমনভাবে শুনিয়ে দেন যেমন আমি শুনছি।”
সহিহ মুসলিমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নির্দেশ: “যখন তোমাদের কেউ শেষ তাশাহুদ থেকে অব্যাহতি নেয়, তখন চারটি বিষয় থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করুক: জাহান্নামের শাস্তি, কবরের শাস্তি, জীবন ও মৃত্যুর পরীক্ষা এবং দজ্জালের ফিতনা থেকে।”
মুনকির-নাকিরের প্রশ্নোত্তর এবং বরযখের জগতে মুমিন ও কাফেরের অবস্থান সম্পর্কে এত বেশি হাদিস আছে যে এখানে তা সব একত্রিত করা সম্ভব নয়।
শাইখুল ইসলাম ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) বলেন: “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কবরের শাস্তি ও তার আনন্দ এবং ফেরেশতাদের প্রশ্নোত্তর সম্পর্কে অনেক সহীহ হাদিস রয়েছে। সুতরাং, এ বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করা এবং ঈমান আনা ফরজ। তবে এর প্রকৃতি নিয়ে আলোচনায় প্রবেশ করা উচিত নয়, কারণ মানবীয় যুক্তি এর প্রকৃতিকে বোঝতে অপারগ, কেননা এই দুনিয়ায় এর
কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শরিয়ত কখনো এমন কিছু নিয়ে আসে না যা মানবীয় বুদ্ধি অস্বীকার করে, তবে এমন কিছু আনতে পারে যা বুদ্ধির জন্য বিস্ময়কর হতে পারে।”
হাফিজ ইবনে রজব তাঁর বই “আহওয়ালুল কুবুর”-এ লিখেছেন: “রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কবরের শাস্তি সম্পর্কে বহু সহীহ হাদিস এসেছে। সহীহ বুখারি ও মুসলিমে উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা (রাযি.) থেকে বর্ণিত আছে, তিনি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে কবরের শাস্তি সম্পর্কে প্রশ্ন করেছিলেন। তখন তিনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, কবরের শাস্তি সত্য।’”
আল্লাহ তায়ালা আমাদের সবাইকে মুমিন ও সৎ বানান, আমাদের শেষ পরিণাম ভালো করুন এবং কবর ও জাহান্নামের শাস্তি থেকে আমাদের হেফাজত করুন। আমিন।