AkramNadwi

একটি মহৎ আচরণ ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/1729

بسم الله الرحمن الرحيم


——————–

তারা বলল: আপনার শেষ ওমরাহ সফরের দিনলিপি থেকে আমরা উপকৃত হয়েছি। এটি ছিল উপদেশ ও শিক্ষায় ভরপুর। আমরা চেয়েছিলাম আপনি যদি এর বিশদ ও খুঁটিনাটি বিষয়ে বিস্তারে বলতেন, প্রতিটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করে লিখতেন।
আমি বললাম: ব্যস্ততা আমার ঘাড়ে ভার হয়ে বসেছে। তাই লিখতে বসে প্রসারতা দেওয়া ও বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করা আমার পক্ষে কঠিন হয়েছে। সেই সফর থেকে ফিরে আসার পর নতুন নতুন দায়িত্ব এসে গেছে, যা আমাকে আবার তা নিয়ে বসতে দেয়নি।
তারা বলল: তবে কি আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে কিছু ঘটনা ও পরিস্থিতিকে অবহেলা করেছেন, গুরুত্ব দেননি, বা চোখ বুজে গেছেন?
আমি বললাম: হ্যাঁ, প্রথমে এগুলো লিপিবদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলাম, কিন্তু পরে নিজেকে জোর করে সেগুলো গোপন রাখার জন্য প্রস্তুত করেছিলাম।
তারা বলল: কী কারণে আপনি এমন করলেন?
আমি বললাম: কারণ ছিল কিছু— সময়ের স্বল্পতা, অলসতা, আর কিছু ঘটনা এমন ব্যক্তিদের ঘিরে যারা চান না যে তাদের নাম ছড়িয়ে পড়ুক বা প্রসিদ্ধ হোক।
তারা বলল: আমরা এই কারণগুলোতে সন্তুষ্ট নই। আমাদের শিক্ষার জন্য যে ঘটনাগুলো উপকারী, সেগুলো গোপন রাখার আপনার কোন অজুহাত থাকতে পারে না। ফিরে যান সেই ঘটনাগুলোর দিকে এবং সেখান থেকে কিছু মূল্যবান বিষয় আমাদের জন্য বেছে নিন।
আমি বললাম: তাহলে আমি একটি ঘটনা আপনাদের সামনে তুলে ধরছি, যা আমাকে বারবার লিখে রাখার জন্য তাড়িত করেছে, এমনকি যখনই কোথাও যাত্রা করেছি, সেটি আমার স্মৃতিতে নাড়া দিয়েছে।
তারা বলল: কী সেটা?
আমি বললাম: মদিনা মুনাওয়ারায় আমাদের এক বন্ধুর সঙ্গে মসজিদে নববীর باب السلام-এর বাইরে মাগরিবের পর দেখা করার প্রতিশ্রুতি ছিল। সময়মতো সেখানে পৌঁছে আমরা মসজিদের এক কোণে বসলাম— জায়গাটি কার্পেট পাতা ও লোকজনে পূর্ণ। হঠাৎ এক পুলিশ সদস্য এসে মানুষদের উঠতে বলল, জায়গাটি খালি করার নির্দেশ দিচ্ছিল। আমরা জুতা-চটি হাতে নিলাম। তখনই দেখি, এক দর্শনার্থী— হয়তো আফ্রিকান বংশোদ্ভূত— মোবাইলে ব্যস্ত। সে পুলিশের কথায় কান না দেওয়ায় পুলিশ রেগে গিয়ে তার হাত থেকে মোবাইল কেড়ে নিল।
লোকটি জোরে চিৎকার করে বলল: “আমি উঠব না, যতক্ষণ না আমার মোবাইল ফিরিয়ে দেওয়া হয়!” পুলিশ পাল্টা চিৎকার করে বলল: “তুমি উঠবে, তবেই মোবাইল ফেরত পাবে।” দুজনের মধ্যে হাতাহাতি শুরু হয়ে যায়। কিছু মানুষ এসে তাদের থামানোর চেষ্টা করে। পুলিশ ব্যক্তি তাকে শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে দৃঢ় থাকে।
এই সময় আমার বন্ধু হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন, পুলিশকে অনুরোধ করতে লাগলেন যেন ক্ষমা করে দেন। তিনি পুলিশকে জড়িয়ে ধরলেন, তাঁর মাথায় চুমু খেলেন, কোমল ভাষায় বোঝাতে লাগলেন যেন তিনি রাগ কমান ও ঐ লোকটির প্রতি সদয় হন।
আমি বললাম: আমার বন্ধুর এই আচরণ আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে। পুলিশকে চুমু খাওয়া, তার কঠোরতা কমানোর চেষ্টা করা— এগুলো আমার অন্তরকে নাড়িয়ে দিয়েছে। মানুষদের মধ্যে শান্তি স্থাপন করতে এরচেয়ে উত্তম আচরণ আমি দেখিনি। এই ঘটনাটি আমার বন্ধুর প্রতি আমার ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
তারা বলল: এই ঘটনার মহত্ত্ব ও সম্মানজনক দিকগুলো কী কী?
আমি বললাম: তিনটি বিষয়—
প্রথমত, আমার বন্ধু নিজেকে উৎসর্গ করে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেছেন, কোনো ক্ষতির তোয়াক্কা না করে। আর শান্তি স্থাপন করা— এটি সৎকাজে আদেশ ও অসৎকাজে নিষেধের সাথী। এটি নবী ও রাসূলদের মর্যাদার কাজ।
দ্বিতীয়ত, তিনি একজন মুসলিম ভাইয়ের প্রতি সহানুভূতি ও করুণা দেখিয়েছেন, তার সহায়তায় দ্রুত এগিয়ে এসেছেন।
তৃতীয়ত, তাঁর বিনয়, যেখানে তিনি এক সাধারণ সৈনিকের মাথায় চুমু খেলেন, তার প্রতি কোমলতা দেখালেন।
আমি বললাম: অনেকেই তাদের পূর্বপুরুষ, বংশগৌরব ও দাদার নাম বলে গর্ব করে। কিন্তু প্রকৃত গৌরব হচ্ছে তাকওয়া, দুনিয়াবিমুখতা, পবিত্রতা ও এমন ইবাদতের মাধ্যমে, যা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করে।
তারা বলল: আপনার সেই বন্ধুর নাম বলুন।
আমি বললাম: আমার বন্ধুর নাম তোমরা না জানলেও তার কোনো ক্ষতি নেই। তাঁর প্রতিদান তাঁর প্রতিপালক জানেন, যিনি তাকে তাঁর সৎকর্মের বিনিময় দিবেন। আর তোমরাও তার নাম না জেনে ক্ষতিগ্রস্ত হবে না। তোমাদের জন্য এই কাহিনী থেকে নেওয়া শিক্ষা-ই যথেষ্ট। আল্লাহ কুরআনে অনেক গুণবান মানুষের কথা উল্লেখ করেছেন, যাদের নাম উল্লেখ করেননি— যেমন: ফেরাউনের পরিবার থেকে একজন মুমিন ব্যক্তি, সূরা কাহাফে দুই ব্যক্তি, যাদের একজনকে দুটি বাগান প্রদান করা হয়েছিল; আবার সূরা তাহরীমে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের স্ত্রীদের মধ্যে দুই নারীর ইঙ্গিত করা হয়েছে, নাম নয়।

তারা বলল: তবুও আমরা চাই তার নাম জানতে।
আমি বললাম: আমার ভাবনা আর তোমাদের ভাবনা এক নয়, এবং এই দুই ভাবনার মধ্যে অনেক ব্যবধান।
তারা বলল: আপনার ভাবনা কী?
আমি বললাম: ইশ! যদি আমি সেই ব্যক্তি হতে পারতাম! অথবা অন্তত তার সঙ্গী হতে পারতাম! ইশ! যদি আমি নিজেই সেই পবিত্র ও উত্তম কাজটি করার উদ্যোগ নিতাম! আমি এমন ন্যায়নিষ্ঠতা ও মহত্ব থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারি না, দূর থেকে দেখে তৃপ্ত থাকতে পারি না। যারা পবিত্র হৃদয়ের মানুষদের সাহচর্য করে, তারা উদারতা, উত্তম চরিত্র ও মহৎ গুণাবলি শিখে ফেলে— যেগুলোর মর্যাদা উচ্চতর।

———————-

✍ মূল : ড. আকরাম নদভী, অক্সফোর্ড, ইউকে।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা : মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *