AkramNadwi

আমার অধ্যয়নের বিবরণ ❞

https://t.me/DrAkramNadwi/2505

بسم الله الرحمن الرحيم


——————–

আমি কীভাবে অধ্যয়ন করি এবং অধ্যয়ন থেকে কী শিখি? এই প্রশ্নটি দেখলে যতটা সহজ মনে হয়, আসলে ততটা সহজ নয়। লেখার জন্য বসতেই বিস্তারিত ব্যাখ্যা মনে আসতে লাগল। তখন ভাবলাম, ভালো হবে যদি লেখা সংক্ষিপ্ত হয় এবং তরুণ পাঠকদের জন্য দিকনির্দেশক হয়। এজন্য মনে হলো, এমন কয়েকটি পয়েন্টের ওপর আলোকপাত করাই উত্তম, যা বেশি কার্যকর এবং তুলনামূলকভাবে সংক্ষেপে তুলে ধরা সম্ভব।

জীবন একটি শূন্য ফলক (সাদা বোর্ড)। চেতনা ও অনুভূতির সূচনা থেকেই আমরা এর ওপর নকশা আঁকতে শুরু করি। এই নকশাগুলোই আমাদের ব্যক্তিত্ব গঠনে ভূমিকা রাখে। এই নকশা অঙ্কনের ক্ষেত্রে আমাদের অধ্যয়নের বড় ভূমিকা রয়েছে। বই আমাদের মধ্যে সঠিক ও ভুলের পার্থক্য নির্ধারণের ক্ষমতা সৃষ্টি করে, আমাদের চিন্তা ও ধারণার জন্ম দেয়, আমাদের অনুভূতি ও আবেগকে তীক্ষ্ণ করে এবং আমাদের বিশ্লেষণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা গড়ে তোলে। এখানে আমার অধ্যয়নের এই প্রভাবকেই তুলে ধরা উদ্দেশ্য।

আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের জৌনপুর জেলার জামদাহা গ্রামে। আমার বাবা হাফেজে কুরআন ছিলেন এবং ফারসি ভাষার পাশাপাশি আরবি ভাষার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষা লাভ করেছিলেন। আমাদের বাড়িতে ফারসি ও উর্দুর কিছু বই ছিল, যা আমি অধ্যয়ন করেছিলাম। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল “হিকমতে আতায়িয়া”-এর উর্দু অনুবাদ, “বেহেশতি জেওর”, “তালিমুদ্দিন” এবং হাফিজ জালন্ধরীর “শাহনামা-ই ইসলাম”। আমি এসব বই বারবার পড়তাম এবং বাড়ির সদস্যদের পড়ে শুনাতাম।

আমাদের গ্রামের জামেয়া মসজিদে একটি গ্রন্থাগার ছিল, যেখানে প্রচুর উর্দু বই ও বিখ্যাত উর্দু পত্রিকার সংগ্রহ ছিল। আমি এসব বইও পড়েছি। এর মধ্যে ওয়াকিদির “ফুতুহুশ শাম”, “ফুতুহুল ইরাক”, “ফুতুহুল মিসর” ইত্যাদির উর্দু অনুবাদ ছিল, যা বহুবার পড়েছি। তখন আমি জানতাম না যে ঐতিহাসিক হিসেবে ওয়াকিদিকে নির্ভরযোগ্য মনে করা হয় না বা তার তথ্য নির্ভরযোগ্যতার দিক থেকে দুর্বল। তবে তার বই পড়তে এত আনন্দ লাগত যে, কখনো কখনো ফজরের পর পড়তে শুরু করলে যোহরের সময় হয়ে যেত, কিন্তু পড়ায় মন ভরত না। দীর্ঘ সময় ধরে পড়ার পর যখন উঠতাম, তখন মাথা ঘুরতে থাকত। অর্থাৎ, ছোটবেলা থেকেই পড়ার প্রতি প্রচণ্ড আগ্রহ জন্মেছিল। পরবর্তী সময়ে এই প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেল—আলো পর্যাপ্ত হোক বা অপ্রতুল, নির্জনতা হোক বা চারপাশে কোলাহল, গরম হোক বা শীত—আমি কেবল পড়তেই থাকতাম। বসে পড়তে পড়তে ক্লান্ত হয়ে গেলে শুয়ে পড়তাম।

এই সময়কালে আমি গ্রামের কাছাকাছি অবস্থিত মাদ্রাসা জিয়া উল উলুম, মানি কিলান-এ ফারসি ভাষার শিক্ষা সম্পন্ন করি। আমাদের পাঠ্যসূচির উচ্চতর বইগুলোর মধ্যে “গুলিস্তান”, “বুস্তান”, “আখলাকে মুহসিনি”, “আনওয়ার-ই সুহাইলি” এবং জামির “ইউসুফ-জুলেখা” অন্তর্ভুক্ত ছিল। এখানেই আমার ফারসি ভাষার আনুষ্ঠানিক শিক্ষা শেষ হয়। পরে আমি “দেওয়ানে হাফিজ” এবং “মৌলানা রুমির মসনবি” ব্যক্তিগত অধ্যয়নের মাধ্যমে পড়েছি। “ইউসুফ-জুলেখা” একটি কল্পকাহিনি এবং অশ্লীল ও অনৈতিক গল্পের সংকলন। “গুলিস্তান”-এও কিছু অশ্লীলতার নমুনা রয়েছে। আমি অবাক হই যে, এসব বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কীভাবে এমন অনুচিত বিষয়গুলোকে অনুমোদন করেছেন!

এরপর আমি মাওলানা আজাদ শিক্ষাকেন্দ্র, ইসরাহত নামে এক মাদ্রাসায় চার স্তর পর্যন্ত আরবি ভাষা পড়ি। এই সময়ে নাহু (ব্যাকরণ) ও صرف (ক্রিয়াপদের রূপ পরিবর্তন) এবং আরবি ভাষার শিক্ষা কিছুটা দক্ষতার সঙ্গে লাভ করি। ১৯৭৮ সালে, যখন আমার বয়স ১৫-১৬ বছর, তখন আমি নদওয়াতুল উলামা, লখনউ-তে ভর্তি হই। এখান থেকে আমার জন্য নতুন জগৎ উন্মোচিত হয়, চিন্তার দরজা খুলে যায় এবং অধ্যয়নের প্রবণতা তৃপ্তি লাভ করে। এই বিদ্যাপীঠের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিবেশ আমার মস্তিষ্ককে উদ্দীপিত করেছিল।

নদওয়ার ছাত্র সংগঠন “জামিয়াতুল ইসলাম” বিভিন্ন স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য মানসম্পন্ন বইয়ের তালিকা প্রস্তুত করেছিল, যা আমাকে বেশ সাহায্য করেছিল। আমি মাওলানা সৈয়দ আবুল হাসান আলী নদভী এবং অন্যান্য শিক্ষকদের পরামর্শ অনুযায়ী মূল্যবান বই পড়েছি। অনেক সময় আমি কাউকে জিজ্ঞাসা না করেই নিজের ইচ্ছায় বই পড়তাম। আল্লাহ আমাকে যে স্বভাব ও বুদ্ধি দান করেছেন, তার ওপর আস্থা বাড়ল। আমি “নিজেই হাঁড়ি, নিজেই কুমার, নিজেই মাটি”—এই প্রবাদের অনুসরণ শুরু করলাম।

নদওয়ায় ছাত্র থাকা অবস্থায় আমি এত বেশি আরবি ও উর্দু বই পড়তাম যে খেলাধুলা ভালো লাগত না, বিনোদনে আগ্রহ থাকত না। এমন দিনও পার হয়েছে, যখন বুঝতেই পারতাম না কখন সূর্য উঠল এবং কখন অস্ত গেল। লখনউ শহরে কোনো কাজে বের হলেও হাতে একটি বই থাকত এবং হাঁটতে হাঁটতে তা পড়তাম। মনে আছে, নতুন বই দেখলেই আমার অবস্থা এমন হত যেন এক ক্ষুধার্ত সুস্বাদু খাবারের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং দ্রুত গিলে না ফেলা পর্যন্ত তৃপ্ত হয় না।

জ্ঞানচর্চার শুরুর দিনগুলোয় এক ধরনের উদ্দীপনা ছিল, কিছু অর্জনের স্পৃহা ছিল, নতুন স্বপ্ন দেখা এবং নতুন ধারণা গঠন করতাম। আমি অন্ধ অনুসরণ ও ঐতিহ্যবাদের প্রতি বিদায় জানালাম। প্রতিটি বিষয়কে প্রমাণের আলোকে যাচাই করার সাহস অর্জন করলাম। অনেক চিন্তা ও বিশ্বাস সংশোধন করলাম। আমি জ্ঞান ও সত্যকে কোনো নির্দিষ্ট ধর্ম বা মতবাদের সংকীর্ণ সীমার মধ্যে আবদ্ধ করার পাপ থেকে তওবা করলাম। কষ্ট ও পরিশ্রম সহ্য করার অভ্যাস গড়ে তুললাম এবং বইয়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা জন্ম নিল।
উর্দু ভাষার গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলোর মধ্যে আল্লামা শিবলী নোমানী, অধ্যাপক মুহাম্মদ হুসেন আজাদ, ডেপুটি নজির আহমদ, স্যার সাইদ আহমদ খান, খাজা আলতাফ হুসেন হালী, মেহদী আফাদি, মাওলানা সাইদ সুলায়মান নদভী, মাওলানা আবুল কালাম আজাদ, মাওলানা আবদুল মাজিদ দরিয়াবাদী, নিয়াজ ফতেপুরী, মজনু গোরক্ষপুরী, রশীদ আহমদ সিদ্দীকী, পেট্রাস বুখারী, শওকত থানভী প্রমুখের রচনাবলী অধ্যয়ন করেছি। এছাড়া মীর তকী মীর, মির্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, জোশ মালিহাবাদী প্রমুখের কাব্যগ্রন্থ পড়েছি এবং কিছু বই বহুবার পাঠ করেছি। উর্দু সাময়িকীগুলোর মধ্যে শুধুমাত্র দারুল মুসান্নিফিনের মাসিক পত্রিকা “মাআরিফ” পছন্দ হয়েছে। যদিও সংবাদপত্র পড়তাম, কিন্তু কখনও সংবাদপত্রের প্রতি আসক্ত হতে পারিনি।

আরবি ভাষা ও সাহিত্যের বইগুলোর মধ্যে কামিল কিলানী, নজীব কিলানী, আহমদ আমীন, তাহা হুসেইন, লুতফি মনফালুতি, মুস্তফা সিবাঈ, আলী তানতাওয়ী এবং আরবি সাহিত্য-ইতিহাস সংক্রান্ত বইগুলো অধ্যয়ন করেছি। মিশরের পত্র-পত্রিকা এবং কুয়েত থেকে প্রকাশিত “আল-মুজতামা” ও “আল-আরবি” সাময়িকীগুলো বিশেষভাবে অধ্যয়ন করতাম। তাহা হুসেইনের চিন্তাগত বিভ্রান্তি থাকা সত্ত্বেও তার লেখনী আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং তার শৈলীর স্বাদ এখনো অনুভব করি।

জ্ঞান ও চিন্তার ক্ষেত্রে ইমাম ইবন হাজমের “আল-মুহাল্লা”, ইবন তাইমিয়ার বিভিন্ন রচনা, “মুকাদ্দিমা ফি উসুল আত-তাফসীর”, “আর-রাদ আলাল মানতিকিয়্যিন”, আল্লামা ইবন কাইয়্যিমের “ইআলামুল মুওয়াক্কিন”, শাহ ওয়ালিউল্লাহ দেহলভীর “হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগা” ও অন্যান্য রচনা, মাওলানা আবুল আ’লা মওদুদী, মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী, শহীদ হাসান আল বান্না, শহীদ সাইয়েদ কুতুব, শাইখ আবদুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দা এবং আল্লামা ইউসুফ কারযাভির বইগুলো বেশি পড়েছি। মাওলানা মওদুদী এবং ইউসুফ কারযাভির মানসম্পন্ন লেখনী ও দ্রুত লেখার ক্ষমতা দেখে বিস্মিত হতাম। মনে হতো, তারা যেন সেই ভারতীয় মায়েদের মতো, যারা এক সন্তানকে কোলে রাখে, আরেক সন্তানকে গর্ভে ধারণ করে।

১৯৯১ সালে আমি ইংল্যান্ডে চলে আসি। জীবনে প্রথমবারের মতো শিক্ষিত অমুসলিম সমাজ ও প্রাচ্যবিদদের কাছাকাছি যাওয়ার সুযোগ পেলাম। দ্বীনে হানীফ সম্পর্কে আপত্তি তোলা এবং ইসলামী জ্ঞানসম্পদকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রবণতা দেখার সরাসরি অভিজ্ঞতা হলো। অক্সফোর্ডের শিক্ষাবান্ধব পরিবেশে নিঃশ্বাস নিলাম, সেমিনারে অংশগ্রহণ করলাম, নিজস্ব জ্ঞান-ঐতিহ্যকে নতুন দৃষ্টিকোণ থেকে বোঝার সুযোগ পেলাম এবং নতুন এক সভ্যতার সঙ্গে তুলনামূলক অধ্যয়নের মধ্য দিয়ে গেলাম। এই সময় আমি আধুনিক দর্শন ও যুক্তিবিজ্ঞান, ইসলামের ইতিহাস, ভারতীয় জ্ঞান ও সাংস্কৃতিক ইতিহাস, এবং রিজাল ও ইলমুল ইল্লাল (হাদিসের বর্ণনাকারীদের জীবনচরিত ও সমালোচনা) সংক্রান্ত বইগুলোর প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিলাম। এখানে এসে ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের মর্যাদা ও মহত্ত্ব আরও স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করলাম। গ্রিক যুক্তি ও দর্শনের বিরুদ্ধে ইবন তাইমিয়ার প্রবল সমালোচনার গুরুত্ব উপলব্ধি করলাম। ইবনুল জাওজির “সাইদুল খাতির” এবং ইমাম যাহাবির “সিয়ারু আ’লামিন নুবালা” গ্রন্থদ্বয় আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছে এবং এ দুটি বই এখনো আমার প্রিয় গ্রন্থের তালিকায় রয়েছে।

অক্সফোর্ডে আসার পর আল্লামা হামিদুদ্দিন ফরাহীর রচনা— “মুকাদ্দিমা ফি তাফসীর নিয়ামুল কুরআন”, “দালাইলুন নিযাম”, “আসালীবুল কুরআন”, “মুফরাদাতুল কুরআন”, “জামহরাতুল বালাগাহ”, “আর-রাইউস সাহিহ ফিমান হুয়ায যাবীহ”, “ইমআন ফি আকসামিল কুরআন” এবং বিভিন্ন তাফসীর বিষয়ক গবেষণা মনোযোগসহকারে একাধিকবার অধ্যয়ন করলাম। তাঁর “নিযামুল কুরআন” তত্ত্বকে বুঝলাম, তাঁর লেখাগুলো আমাকে কুরআন অধ্যয়নের প্রতি অনুপ্রাণিত করল, এবং কুরআনকে জীবনের কেন্দ্রবিন্দু ও মূল সূত্র হিসেবে গ্রহণ করার ভাবনাকে আরও স্পষ্ট করে তুলল। মুসহাফ শরীফের পাশে লিখিত ফরাহী সাহেবের টীকা ও মন্তব্যগুলো থেকে অনেক উপকার পেয়েছি। এসব মন্তব্য কখনো এত সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর মনে হয়েছে, যেন ছোট মটরশুঁটির ওপর “কুল হুয়াল্লাহু আহাদ” লেখা রয়েছে।

জ্ঞান অর্জনের ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বিশ্বাস আরও দৃঢ় হয়েছে যে, জ্ঞান কোনো ভৌগোলিক, ভাষাগত, বর্ণগত, ধর্মীয় বা মাজহাবি সীমানায় আবদ্ধ নয়। একে পার্থিব-অপার্থিব কিংবা প্রাচীন-আধুনিকের মাপকাঠিতে ভাগ করা নিছক অজ্ঞতা ও মূর্খতা। জ্ঞানের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো সত্যের সন্ধান। আর সত্য আল্লাহর

সৃষ্ট, এর কোনো কৃত্রিম স্তরবিন্যাস নেই। এখান থেকেই প্রকৃত গবেষক ও মুজতাহিদের প্রতি আমার শ্রদ্ধা বেড়েছে— সে পূর্বের হোক বা পশ্চিমের, তার মাজহাব ও মতবাদ যা-ই হোক না কেন। ইমাম ইবন হাজম, ইবন তাইমিয়া এবং মাওলানা ফরাহীর প্রতি আমার ভালোবাসা বৃদ্ধি পেয়েছে। কারণ, তাদের লেখায় যে গভীর ও সুসংবদ্ধ চিন্তাধারা, শক্তিশালী যুক্তি ও অকাট্য প্রমাণ রয়েছে, তার নজির অন্য কোথাও পাওয়া কঠিন।

আরবি, উর্দু, ফার্সি ও ইংরেজি ভাষার যেসব বই অধ্যয়ন করেছি, সেগুলোর তালিকা দীর্ঘ। এসব গ্রন্থ বিভিন্ন শাস্ত্র ও বিদ্যার সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে তিন ধরনের বই বিশেষভাবে আমার গবেষণা ও বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ সাধনে সহায়ক হয়েছে এবং সত্যের উপলব্ধিতে সাহায্য করেছে। আপাতত তাদের বিশদ বিবরণ এখানেই শেষ করছি।

১. সাহিত্য ও সমালোচনার গ্রন্থ অধ্যয়নের মাধ্যমে শব্দ ও শৈলীর বৈচিত্র্যের গুণাবলির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়েছে, সাহিত্যরসের মূল্যায়ন এবং নতুন ভাবনার প্রকাশের কলা আয়ত্ত করেছি, বুলবুলের ভাষা, ফুলের বর্ণনা এবং প্রকৃতির নানা সৌন্দর্যপূর্ণ অভিব্যক্তির সঙ্গে পরিচিত হয়েছি, ভাষা ও প্রকাশের সূক্ষ্মতা মনে গেঁথে গেছে, সৌন্দর্যের পরিশীলন শিখেছি এবং উৎকর্ষ ও শোভা অনুধাবনের ক্ষেত্রে উদারতার গুরুত্ব বুঝতে শিখেছি। যখনই কোনো বই পড়তাম, শব্দ ও শৈলী নিয়ে গভীর চিন্তা করতাম, বিভিন্ন লেখকের রচনাশৈলীর গুণাবলি ও দুর্বলতায় মনোযোগ দিতাম। অধ্যয়নের সময় আমার মন এই চিন্তায় ব্যস্ত থাকত—লেখক কতটা দক্ষতার সঙ্গে অর্থ প্রকাশ করতে সক্ষম? ভাষাটি যথাযথ কি না? শব্দচয়ন কেমন? এই প্রশিক্ষণের সুফল হলো, আমিও নিজের লেখায় পরিষ্কার ও সুসংগঠিত ভাষা এবং ভারসাম্যপূর্ণ শৈলী অবলম্বনের চেষ্টা করেছি এবং যতটা সম্ভব সাংবাদিকতাসুলভ ও ধর্মীয় বক্তৃতার মতো ভাষা-শৈলী এড়িয়ে চলেছি।

২. প্রাচীন ও আধুনিক দর্শন ও যুক্তিবিদ্যার গ্রন্থ অধ্যয়ন করে মানবীয় বুদ্ধির সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করেছি, যুক্তির শক্তি ও দুর্বলতা অনুধাবন করেছি, ধারাবাহিকভাবে বিষয় উপস্থাপনের দক্ষতা অর্জন করেছি। কিন্তু এটা দেখে গভীর দুঃখবোধ হয়েছে যে, আমাদের লেখকগণ গম্ভীর ও প্রগাঢ় বৈজ্ঞানিক বিষয়গুলোর ক্ষেত্রেও প্রয়োজনীয় উপাদান সরবরাহ না করেই লিখে থাকেন। তাদের শৈলী মূলত বিতর্কমূলক বা বক্তৃতাসুলভ হয়, বক্তব্যগুলো অসংগঠিত থাকে, এমনকি বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কহীন অপ্রয়োজনীয় আলোচনা ও বিশদ বর্ণনা অতিরিক্ত মাত্রায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ফলে যখন নিজে লিখি, তখন আমার উৎসগ্রন্থগুলোর ধারণা ও চিন্তাগুলোকে যৌক্তিক ও দার্শনিক নীতির আলোকে যাচাই করার চেষ্টা করি, এমন কোনো কথা গ্রহণ করতে চাই না, যার পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক বা যৌক্তিক প্রমাণ নেই। আমি সর্বদা চেষ্টা করি যেন প্রতিটি রচনায় মূল বক্তব্য ও যুক্তির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট সম্পর্ক থাকে এবং মতামত প্রকাশের চেয়ে মতামত গঠনের প্রক্রিয়ায় বেশি সময় দিই।

৩. ইতিহাসের গ্রন্থ অধ্যয়ন করে উপলব্ধি করেছি, সাধারণত মানুষ কিভাবে ঘটনাপ্রবাহ ও অভিজ্ঞতাগুলো বর্ণনার সময় অতিরঞ্জন, মিথ্যাচার, এমনকি মিথ্যা উদ্ভাবনের আশ্রয় নেয়। হাদিসের গ্রন্থগুলোও এই শ্রেণিতে পড়ে, যদিও মুহাদ্দিসগণ তাদের গবেষণায় সর্বোচ্চ মানদণ্ড অনুসরণ করেছেন। তবে পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে এই পদ্ধতির যথাযথ প্রয়োগ করা হয়নি, ফলে জীবনীগ্রন্থ, ইতিহাস ও ধর্মীয় উপদেশমূলক গ্রন্থসমূহ বিভিন্ন সত্য-মিথ্যার সংমিশ্রণে ভরে গেছে। তাই, এ ধরনের উপাদান যাচাই করতে আমি সর্বদা একজন ইতিহাসবিদের দৃষ্টিকোণ থেকে তা বিশ্লেষণের চেষ্টা করি, নির্ভরযোগ্য সূত্রের প্রতি মনোযোগী হই এবং অপ্রমাণিত ও সন্দেহজনক সূত্র এড়িয়ে চলার অভ্যাস গড়ে তুলেছি।

আমি নিজেকে সেই লেখকদের সঙ্গে একাত্ম অনুভব করি না, যারা বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তাধারাকে শৃঙ্খলিত করার জন্য নিরন্তর প্রচেষ্টা চালান, যারা কেবল তাদের ব্যক্তিগত রুচি ও মতাদর্শের ভিত্তিতে বইগুলোকে গ্রহণ বা প্রত্যাখ্যান করেন, যারা প্রথা ও কুসংস্কারের গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকেন, যাদের লেখায় গাম্ভীর্য অতিরিক্ত মাত্রায় গিয়ে জটিল ও দুর্বোধ্য হয়ে যায় অথবা বিষণ্নতা ছড়ায়, এবং যারা কেবল পুরনো ও অপরিবর্তিত ধারণাগুলোর পুনরাবৃত্তি করে চলেন। দুর্ভাগ্যবশত, বর্তমানে এমন লোকের সংখ্যাই বেশি, যারা “তেলের ঘানির বলদের” মতো একঘেয়ে পরিশ্রম করে, এবং তারা নিজেদের ভুল-ভরা চিন্তাভাবনাকে নিজে গ্রহণ করেই ক্ষান্ত থাকেন না, বরং অন্যদেরও তা গ্রহণ করতে বাধ্য করতে চান।

এছাড়াও, আমি সেই লেখকদের প্রতি অত্যন্ত বিরক্ত হই, যারা প্রত্যেক মত ও চিন্তাধারাকে চূড়ান্ত সত্য বলে মনে করেন এবং কোনো পরিবর্তন বা সংশোধনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন না। এরা মানবীয় চিন্তার বিকাশের শত্রু। তারা বুঝতে পারে না যে, “আল-কিতাব” রচনার আগেও আরবি ব্যাকরণের বিকাশ ধাপে ধাপে হয়েছে, যে, ইমাম বুখারি ও মুসলিমের আবির্ভাবের আগেই হাদিসশাস্ত্র বহু বৈপ্লবিক পর্যায় অতিক্রম করেছে। ইমাম বুখারি ও মুসলিমের সংকলিত দুটি গ্রন্থ কেবলমাত্র

দুটি ছোটখাটো সংকলন নয়, বরং সেসব যুগ পর্যন্ত ইতিহাস, জীবনী, যুদ্ধবৃত্তান্ত ও হাদিসশাস্ত্রে যে অভূতপূর্ব অগ্রগতি সাধিত হয়েছে এবং এসব বিষয়ে যে অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থ রচিত হয়েছে, এই দুটি গ্রন্থ তারই প্রতিনিধিত্ব করে। তাই, এই দুটি গ্রন্থ বোঝার জন্য এসব বিষয় সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক ও সুপ্রতিষ্ঠিত সাহিত্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা একান্ত প্রয়োজন। কিন্তু, দুঃখজনকভাবে, “সহিহাইন”-এর ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোতে এসব উৎসের যথাযথ ব্যবহার মোটেই করা হয়নি। কেবলমাত্র ইবন হাজর আসকালানী তাঁর “ফতহুল বারি” গ্রন্থে হাদিস, জীবনী ও অন্যান্য গ্রন্থের কিছুটা হলেও ব্যবহার করেছেন, এবং এই কারণেই তাঁর ব্যাখ্যা অন্যান্য ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোর তুলনায় অনন্য বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন হয়েছে।

দুঃখজনকভাবে, সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে অধ্যয়নের প্রতি অবহেলা ও অনীহা প্রকটভাবে বিদ্যমান। বর্তমান সময়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতেও রাজনীতির এমন আধিপত্য রয়েছে যে, সাহিত্য ও জ্ঞানের প্রতি আগ্রহকে শিশুতোষ ব্যস্ততা বলে মনে করা হয়। আর যারা রাজনীতি করেন না, তারা সাংবাদিকতার ফাঁদে পড়ে গেছেন, যা কার্যত রাজনীতিরই দাসত্বের শৃঙ্খল। সমগ্র দেশ আজ এই বিশৃঙ্খলার শিকার। অথচ, আজকের পৃথিবী কতই না বেশি প্রয়োজন অনুভব করছে এমন নিরপেক্ষ মানুষদের, যাঁদের প্রধান আগ্রহ কেবলমাত্র জ্ঞানচর্চা।

তবে এর অর্থ এই নয় যে, একজন চিন্তাশীল লেখক তার সমাজ ও সময়ের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছিন্ন থাকবে। একজন সৃষ্টিশীল লেখক শূন্যতায় বাস করেন না, কোনো জাদুঘরের নিঃশব্দ পরিবেশে নিশ্বাস নেন না; বরং তিনি তাঁর সমাজ ও যুগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংযুক্ত থাকেন। তাঁর চারপাশের ঘটনাপ্রবাহ তাঁর চিন্তা ও মননে প্রতিফলিত হয়। কিন্তু বর্তমান সময়ের রাজনীতি ও সাংবাদিকতার সঙ্গে জ্ঞান বা বাস্তবতা—কোনোটিরই সত্যিকারের সংযোগ নেই। এগুলোর ভিত্তি মূলত অজ্ঞতা, বিভ্রান্তি, প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির ওপর প্রতিষ্ঠিত।

———————

# আলোচনা # দিকনির্দেশনা / দিকনির্দেশনা মূলক আলোচনা

লিখেছেন :
মুহাম্মাদ আকরাম নাদভী – অক্সফোর্ড।
অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা:
মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।

শেয়ার করুন:

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *