|১৮|০২|২০২৬|
❖ প্রশ্ন:
আসসালামু আলাইকুম, আশা করি আপনি ভালো আছেন। যাকাত সম্পর্কে কয়েকটি প্রশ্ন আছে।
একজন ব্যক্তি কয়েক দিনের মধ্যে তার পেনশনের লাম্প সাম (এককালীন) অর্থ পাবেন। তিনি কি সেই পেনশনের ওপর যাকাত দেবেন?
সাধারণভাবে, যারা এখনও কর্মরত, তাদের পেনশনে জমা হওয়া অর্থের ওপর কি প্রতি বছর যাকাত দিতে হয়?
আরেকজন নিজ উদ্যোগে কর্মরত ব্যক্তি আছেন। যিনি একটি ব্যক্তিগত পেনশন পরিকল্পনায় (SIPP) বিনিয়োগ করেছেন। তাকে কি এর ওপর যাকাত দিতে হবে? দিলে কীভাবে?
❖ উত্তর:
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহ।
যাকাতের বিধান কুরআন, সুন্নাহ এবং প্রাচীন ফকীহদের সুপ্রতিষ্ঠিত নীতিমালার ওপর প্রতিষ্ঠিত। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য কয়েকটি মৌলিক শর্ত রয়েছে: সম্পদের পূর্ণ মালিকানা (আল-মিলকুত-তাম্ম), বৈধ দখল, নিসাব পরিমাণে পৌঁছানো, এবং সেই সম্পদের ওপর এক হিজরি বছর অতিক্রান্ত হওয়া। এই শর্তগুলোর কোনো একটি অনুপস্থিত থাকলে যাকাত ফরজ হয় না। আধুনিক আর্থিক ব্যবস্থাপনা, বিশেষত পেনশন স্কিমের মতো ব্যবস্থাগুলোর ক্ষেত্রে, এই নীতিগুলো বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
যে পেনশনের লাম্প সাম অর্থ শিগগির প্রাপ্ত হবে, তা হাতে পাওয়ার আগে তার ওপর যাকাত নেই। যতক্ষণ পর্যন্ত অর্থ ব্যক্তির দখলে না আসে এবং তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে না যায়, ততক্ষণ ‘পূর্ণ মালিকানা’ প্রতিষ্ঠিত হয় না। কেবল পাওয়ার অধিকার থাকা বা পাওয়ার প্রত্যাশা করা, এ দুটির কোনোটি যাকাতকে আবশ্যক করে না।
তবে একবার যখন অর্থ বাস্তবিকভাবে গ্রহণ করা হয় এবং ব্যক্তি তা স্বাধীনভাবে ব্যবহার করতে পারেন, তখন সেটি অন্যান্য নগদ সম্পদের বিধানের অন্তর্ভুক্ত হবে। এরপর যদি সেই অর্থ নিসাবে পৌঁছে বা নিসাব পূরণে সহায়ক হয় এবং তার ওপর এক চান্দ্র বছর অতিক্রান্ত হয়, তবে অন্যান্য যাকাতযোগ্য সঞ্চয়ের সঙ্গে মিলিয়ে তার ২.৫% যাকাত আদায় করতে হবে।
কর্মজীবনের সময় পেনশন স্কিমে জমা হওয়া অর্থ, চাই তা কর্মস্থলের মাধ্যমে হোক কিংবা নিয়োগকর্তার অবদানে, সাধারণত যাকাতযোগ্য নয়, যতক্ষণ ব্যক্তি তা অবাধে উত্তোলন করতে পারেন না। অধিকাংশ পেনশন কাঠামোয় অর্থ উত্তোলন করা যায় না বিধিনিষেধ, জরিমানা বা ক্ষতি ছাড়া। ফলে ফিকহি দৃষ্টিতে এখানে পূর্ণ ও অবাধ মালিকানা বিদ্যমান নয়। আর যে সম্পদের ওপর মানুষের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই, তার ওপর যাকাতও বর্তায় না।
অতএব, পেনশন তহবিল স্কিমের ভেতরে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় প্রতি বছর তার ওপর যাকাত ফরজ নয়। যাকাতের প্রশ্ন তখনই আসবে, যখন অর্থ বাস্তবে উত্তোলন করে ব্যক্তির হাতে আসবে। তখন স্বাভাবিক নিয়মে হিসাব হবে: নিসাবে পৌঁছালে এবং এক চান্দ্র বছর অতিবাহিত হলে, ২.৫% যাকাত দিতে হবে।
উদ্যোক্তা ব্যক্তির ক্ষেত্রে, যিনি Self-Invested Personal Pension (SIPP)-এ বিনিয়োগ করেছেন, একই বিধান প্রযোজ্য। যদিও তিনি বিনিয়োগ নির্বাচন করেছেন এবং একটি হিসাব ভারসাম্য দেখতে পান, তবুও অর্থটি আইনি কাঠামোর ভেতরে সুরক্ষিত থাকে এবং নির্ধারিত বয়স বা শর্ত পূরণ ছাড়া তা অবাধে গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে পূর্ণ ও তাৎক্ষণিক মালিকানা এখানে প্রতিষ্ঠিত হয় না। তাই পেনশন তহবিল ওই কাঠামোর মধ্যে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় তার ওপর যাকাত ফরজ নয়।
কিন্তু যখন অর্থ উত্তোলন করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনা হবে, তখন তা অন্যান্য নগদ সম্পদের মতোই বিবেচিত হবে। নিসাবে পৌঁছে এক চান্দ্র বছর অতিক্রান্ত হলে, স্বাভাবিক হারে যাকাত দিতে হবে।
স্মরণ রাখা উচিত, যাকাত কেবল সম্পদের অস্তিত্বের কারণে ফরজ হয় না; বরং তা ফরজ হয় তখনই, যখন পূর্ণ মালিকানা ও বাস্তব দখল প্রতিষ্ঠিত হয়। সুতরাং পেনশনের সম্পদ হাতে পাওয়ার আগে যাকাতের বাধ্যবাধকতা নেই। আর হাতে পাওয়ার পর, যদি নিসাব অতিক্রম করে এক বছর অতিক্রান্ত হয়, তখন তা অন্যান্য যাকাতযোগ্য সম্পদের সঙ্গে মিলিয়ে যথানিয়মে হিসাব করে আদায় করতে হবে।
যাকাত এক ইবাদত, তার বিধান নির্ধারিত, তার সীমা স্পষ্ট, এবং তার হিসাব ন্যায় ও ভারসাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত।
———-
ক্যাটাগরি : ফিকাহ, ফাতাওয়া, ইসলামি চিন্তাধারা।
✍ মূল : ড. মুহাম্মদ আকরাম নাদভী, অক্সফোর্ড।
✍ অনুবাদ যাচাই ও সম্পাদনা: মাওলানা মারজান আহমদ, সিলেট, বাংলাদেশ।
🔗 অনূদিত মূল প্রবন্ধের লিংক: 👇
https://t.me/DrAkramNadwi/8440